kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৯ চৈত্র ১৪২৬। ২ এপ্রিল ২০২০। ৭ শাবান ১৪৪১

ওমরাহ হজ স্থগিত করল সৌদি সরকার

আটকে গেলেন ১০ হাজার ওমরাহ যাত্রী

৫০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

মাসুদ রুমী   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আটকে গেলেন ১০ হাজার ওমরাহ যাত্রী

মোশারফ হোসেনের ইচ্ছা ছিল চাকরিজীবনের সঞ্চয়ের টাকায় ওমরাহ পালন করার। এ জন্য সব প্রস্তুতিই নিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত এই সরকারি কর্মকর্তা। ফ্লাইট (উড়োজাহাজ), টিকিট সবই চূড়ান্ত। বিমানবন্দরে গিয়েও তিনি যেতে পারলেন না সৌদি আরবে। করোনাভাইরাসের (কেভিড-১৯) কারণে সৌদি আরব ওমরাহ ও ভ্রমণ ভিসা স্থগিত করায় মোশারফ হোসেনের মতো ১০ হাজার যাত্রীর মাথায় বাজ পড়েছে। এতে আটকে গেছে ৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ভিসা ফি, হোটেলের টাকাও ঝুলে গেছে। এতে ভীষণ অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ওমরাহযাত্রীরা।

ভিসা হওয়ার পরও গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কাউকেই বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়নি। সকালে সৌদি আরবের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বিমানগুলোতেও কোনো ওমারাহযাত্রী ছিলেন না। বিমানবন্দর সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র মতে, গতকাল সকাল থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ইকে-৫৮৩, কাতার এয়ারওয়েজের কিউআর-৬৪১, এয়ার অ্যারাবিয়ার জি৯-৫১৮, সৌদি এয়ারলাইনসের এসভি-৮০৯ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-০৪৯ ফ্লাইটে তিন শতাধিক ওমরাহযাত্রীর জেদ্দা ও মদিনা যাওয়ার কথা ছিল। গতকাল যে ফ্লাইটগুলো সৌদি আরব গেছে, সেগুলো ওমরাহযাত্রীদের নেয়নি।

সৌদি সরকারের ওই সিদ্ধান্তে ভীষণ অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বলে জানালেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ওমরাহযাত্রী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু ইলিয়াস। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী শিরিন সুলতানা ওমরাহ যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ভিসা, সৌদি এয়ারলাইনসে আমাদের টিকিটও কনফার্ম ছিল। এমনকি সাত দিনের হোটেল বুকিংও ছিল। আজ (বৃহস্পতিবার) রাতে আমাদের ফ্লাইট ছিল। কিন্তু সৌদি সরকারের হঠাৎ সিদ্ধান্তে সব ভেস্তে গেল। এখন এয়ার অ্যারাবিয়া আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করছে না।’

আবু ইলিয়াস বলেন, ‘ভিসার জন্য আমাদের দুজনের ৪৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, প্লেন টিকিট জনপ্রতি ৭২ হাজার টাকা, হোটেল বুকিংয়ে ৭৫ হাজার টাকার মতো আরো খরচ হয়েছে। পুরো বিষয়টি এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কেউ কিছু জানাচ্ছে না।’

হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম গতকাল বলেন, ‘সৌদি আরবের নিষেধাজ্ঞায় আমরাও হতভম্ব। এমনকি আমাদের যেসব হজযাত্রী এরই মধ্যে ফ্লাইটে উঠে গেছেন, তাঁদের দুবাই, কুয়েতসহ বিভিন্ন ট্রানজিট পয়েন্ট থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। শাহজালালে যাঁরা অপেক্ষ করছিলেন, তাঁদের প্লেনে ওঠানো হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা হিসাব করেছি প্রায় ৫০ কোটি টাকা আটকে গেছে। টিকিটের টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য আমরা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলছি। এ ছাড়া সৌদি সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় রিফান্ডের জন্য আমরা সরকারের সহযোগিতা চাই।’

সৌদি সরকারের সাময়িক নিষেধাজ্ঞার কারণে সৌদি আরবের ভিজিট ভিসা বা ওমরাহ ভিসায় গমনকারীরা অপাতত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে যেতে পারবে না বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থাটি। ভিসাধারী যেসব যাত্রী বিমানে ভ্রমণের জন্য টিকিট কেটেছেন, তাঁরা চাইলে রিফান্ড নিতে পারবেন অথবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর সিট খালি থাকলে সেসব ফ্লাইটে পুনরায় আসন বরাদ্দ করা হবে। ওয়ার্ক পারমিট বা এমপ্লয়মেন্ট ভিসাধারীরা নির্ধারিত ফ্লাইটে সৌদি আরব যেতে পারবেন। এরই মধ্যে যেসব যাত্রী ওমরাহ ও ভ্রমণ ভিসায় বিমানে ভ্রমণ করে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তাঁরা নিয়মিত ফ্লাইটে দেশে ফিরে আসতে পারবেন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোকব্বির হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সৌদি দূতাবাস বলেছে, এটা সাময়িক। যেকোনো সময় তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে। এই সময়ে যাঁরা যেতে পারবেন না তাঁরা রিফান্ড নিতে পারবেন। অথবা তাঁরা চাইলে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর পুনরায় যেতে পারবেন। আমরা রিফান্ড দিয়ে দেব, আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’ তিনি বলেন, ‘আজকে চট্টগ্রাম থেকে ২৪০ জন এবং ঢাকা থেকে ১৪৮ জন যেতে পারলেন না। আমাদের সপ্তাহে ১১টি ফ্লাইট আছে। প্রতিটি ফ্লাইটে ৩০০-র কাছাকাছি যাত্রী যেতে পারবেন। এখন আমাদের যাওয়ার ফ্লাইট খালি যাবে। তবে যাঁরা এরই মধ্যে গেছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনতে আমরা ফ্লাইট অব্যাহত রাখব।’

গতকাল এ বিষয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি নোটিশ জারি করা হয়। এ বিষয়ে একটি টুইটও করেছে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে লেখা হয়েছে, সৌদি আরবে করোনাভাইরাস প্রবেশ এবং ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক এবং আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে যথাযথ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ওমরাহ ও ট্যুরিস্ট ভিসা সাময়িক বন্ধ করা হয়েছে।

জানা গেছে, আটকে যাওয়া ১০ হাজার ওমরাহযাত্রীর ভিসার বিপরীতে প্রায় পাঁচ হাজার টিকিট কাটা হয়ে গেছে। এদের মধ্যে লো-কস্ট এয়ারলাইনসের অফেরতযোগ্য টিকিটগুলোর মোট মূল্য ৯ কোটি টাকা। আর্থিক ক্ষতি প্রসঙ্গে হাব সভাপতি বলেন, ‘সব মিলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। সে টাকা আর ফেরত পাওয়া যাবে কি না, তা আমরা বলতে পারছি না। এ ক্ষতি এখন এজেন্সি ও ওমরাহযাত্রীদের বহন করতে হবে।’

তবে শ্রমিকরা যেতে পারছেন বলে জানিয়েছেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-ইমিগ্রেশন)। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন এয়ারলাইনস থেকে আমাদের ওমরাহ ভিসাপ্রাপ্ত যাত্রীদের ইমিগ্রেশন না করানোর মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সেসব দেশের শ্রমিকরা যেতে পারছেন। আপাতত শ্রমিকদের ভয় পাওয়া বা বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। শ্রমিকদের জন্য ইমিগ্রেশনে কোনো বাধা নেই।’

মন্তব্য