kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা

খালেদার জামিন আবেদন আবার খারিজ হাইকোর্টে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



খালেদার জামিন আবেদন আবার খারিজ হাইকোর্টে

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন আবার খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল বোর্ডকে সম্মতি দেননি। তাই তাঁর চিকিৎসা শুরু করা যাচ্ছে না। আদালত বলেন, ‘এ কারণে তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করার মতো যৌক্তিক কারণ দেখছি না। তাই জামিনের আবেদন খারিজ করা হলো।’

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে ওই আদেশ দেন।

আদেশের আগে গতকাল সকাল ও দুপুরে দীর্ঘ শুনানি হয়। এর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ডের দেওয়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় আদালতে। সব শেষ শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল বোর্ডকে অনুমতি দেননি।

আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুদকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান।

হাইকোর্টের আদেশের পর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, জামিন আবেদন খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।

আদেশে যা বলা হয়েছে : আদালত আদেশে বলেন, ‘গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নির্দেশ দিয়েছিলাম, খালেদা জিয়া তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্মতি দিয়েছেন কি না, দিয়ে থাকলে চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে কি না এবং তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে বিএসএমএমইউয়ের মেডিক্যাল বোর্ড একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে বিস্তারিতভাবে রোগের বিবরণ দেওয়া আছে এবং চিকিৎসকদের চিকিৎসার একটি পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়া তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্মতি দেননি। যেহেতু খালেদা জিয়া এখন পর্যন্ত সম্মতি দেননি, তাই উন্নত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।’

আদেশে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা কেন্দ্র বিএসএমএমইউ। সারা দেশে হাসপাতাল রয়েছে সেখান থেকে রোগীকে এখানে পাঠানো হয়। এই হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিবেদনের কোথাও বলা হয়নি যে তারা খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দিতে অক্ষম। বা বলেনি যে তাঁর চিকিৎসা সম্ভব না। যেহেতু এখানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সম্ভব।’

আদালত বলেন, ‘অবশ্যই তাঁকে মনে রাখতে হবে যে তিনি একজন বন্দি। তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ইচ্ছামাফিক চিকিৎসা নিতে পারে, একজন বন্দি একজন সাধারণ মানুষের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। কারাবিধি ও নিয়মনীতি অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে। দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সম্মতি না পাওয়ায় তাঁর সে চিকিৎসা এখনো শুরু করা যায়নি।’

মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে : মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘খালেদা জিয়া ডায়বেটিস মিলিটাস, হাইপার টেনশন, কফ ভেরিয়ান্ট অ্যাজমা, রিউমাটয়েট আর্থ্রাইটিস রোগে ভুগছেন। এর মধ্যে ডায়বেটিস মিলিটাস, হাইপার টেনশন, কফ ভেরিয়ান্ট অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রিউমাটয়েট আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে নেই। এ ছাড়া ব্যাক পেইন দেখা দিয়েছে। অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁর হেপাটাইটিস বি ও সি সেরোলজি, কোয়ান্টাফেরন, টি বি গোল্ড প্লাস, এক্সরে ডরসো লাম্বার স্পাইন, আপার জিআই এন্ডোসকপি, এফএনএসি অব নুডল ভিনিড দি স্কিন ইন হার লেগ, টিউমার মার্কার্স অ্যান্ড পিইটি সিটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ জন্য তাঁর অ্যাক্টেমরা ইনজেকশন পুশ করা প্রয়োজন। কিন্তু এটা করতে রাজি নন তিনি।’

সম্পূরক আবেদন : আদেশের আগে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা দুটি সম্পূরক আবেদন দাখিল করেন। এতে খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি চাওয়া হয়। মেডিক্যাল বোর্ডের দেওয়া গত বছরের ১২ অক্টোবর ও ১১ ডিসেম্বর এবং গতকালকের প্রতিবেদন সংযুক্ত করে দাখিল করা অপর সম্পূরক আবেদনে বলা হয়, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য মানবিক কারণে জামিন প্রয়োজন।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল প্রতিবেদন বুধবার বিকেল ৫টার মধ্যে দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই বুধবার দুপুরে মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। গতকাল সকালে রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর সিলগালা অবস্থায় ওই প্রতিবেদন তুলে দেন আদালতে। এরপর আদালত তা খুলে পাঠ করেন। পরে এর ফটোকপি রাষ্ট্রপক্ষ ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীকে সরবরাহ করা। সকালে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আদেশ দিতে গেলে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন রবিবার পর্যন্ত সময় চান। কিন্তু আদালত তাতে রাজি না হওয়ায় জয়নুল আবেদীন দুপুর ২টা পর্যন্ত সময় চান। দুপুর ২টার পর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা দুটি সম্পূরক আবেদন দেন। এরপর উভয় পক্ষ শুনানি করে।

গতকালের শুনানি : গতকাল শুনানিতে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) কেন অনুমতি দেননি তা জানা দরকার। আমরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ জবাবে আদালত বলেন, ‘এটা আমরা দিতে পারি না। এটার কোনো সুযোগ নেই।’ আদালত বলেন, ‘আপনি কি বিশেষজ্ঞ? আপনি কী বুঝবেন?’

আদালত আরো বলেন, ‘আপনারা ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে একটি রিপোর্ট দিয়েছেন। আমরা এটা গ্রহণ করব নাকি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের রিপোর্ট গ্রহণ করব?’

জামিন আবেদনের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘মেডিক্যাল বোর্ড রিপোর্ট দিয়েছে। তিনি যদি চিকিৎসার অনুমতি না দেন তাহলে মেডিক্যাল বোর্ডের কী করার আছে? উনার সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটা নতুন কোনো সমস্যা নয়। তিনি দীর্ঘদিন এ রোগে ভুগছেন।’

খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘আপিল বিভাগ মেডিক্যাল বোডকে নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়ার সম্মতি নিয়ে চিকিৎসা করাতে। তাই এ অবস্থায় আপনারা অন্য কোনো আদেশ দিলে তা আপিল বিভাগের আদেশের লঙ্ঘন হবে।’

ওই সময় জয়নুল আবেদীন বলেন, ভারতের জয়ললিতাকে চিকিৎসা নিতে জামিন দেওয়া হয়েছে। আর পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ জামিন নিয়ে বিদেশে গেছেন। তখন আদালত বলেন, ‘পাকিস্তানের উদাহরণ এখানে দেবেন না। এটা চলবে না।’ আদালত বলেন, ‘নওয়াজ শরীফকে ছয় সপ্তাহের জামিন দিয়েছিল আদালত। সেখানে তাঁকে দেশেই চিকিৎসা নিতে বলা হয়েছিল।’

গতকাল খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, নিতাই রায় চৌধুরী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, কায়সার কামাল, অ্যাডভোকেট সগির হোসেন লিওন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মোমতাজ উদ্দিন ফকির, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী ও বিশ্বজিত দেবনাথ। বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে সাত বছর কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে জামিনের আবেদন করা হয়। গত বছর ৩১ জুলাই খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ওই আদেশের বিরুদ্ধে গত বছর ১৪ নভেম্বর আপিল করেন খালেদা জিয়া। এই আবেদন গত বছর ১২ ডিসেম্বর খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। খারিজের রায় প্রকাশিত হয় গত ১৯ জানুয়ারি। এ অবস্থায় নতুন করে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা