kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

ঢাকায় এডিস মশার বড় ঘাঁটি নির্মাণাধীন ভবন

প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে শৈথিল্য হলে এবার পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হতে পারে

তৌফিক মারুফ   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঢাকায় এডিস মশার বড় ঘাঁটি নির্মাণাধীন ভবন

এডিস মশার লার্ভা যেসব জায়গায় মেলে তার অন্যতম এমন পরিত্যক্ত টায়ার। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংগ্রহ করা নমুনায় মিলেছে ভয়াবহ চিত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

গত মৌসুমে ডেঙ্গুর ভয়ানক পরিস্থিতির মুখে সিটি করপোরেশন অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছিল কিছু কিছু এলাকার নির্মাণাধীন ভবনে। বলা হয়েছিল, এডিস মশার প্রজননের অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে এসব নির্মাণাধীন ভবন।

তবে ওই অভিযানেও তেমন একটা সফলতা আসেনি। বরং মৌসুম শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত অনুসারে আবাসিক ভবনগুলোর মধ্যে এডিস প্রজননের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ঢাকার নির্মাণাধীন ভবনগুলো। এসব নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বড় আকারের চৌবাচ্চা-ড্রামগুলো হচ্ছে বেশি বিপজ্জনক। এ ছাড়া বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত প্লাস্টিক বালতিকেও চিহ্নিত করা হয়েছে এডিসের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে। তাই আসন্ন ডেঙ্গু মৌসুমে (জুলাই থেকে অক্টোবর) অন্যান্য প্রজননক্ষেত্রের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবনের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের দিকে বেশি নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও এসব ক্ষেত্রে দুই সিটি করপোরেশনকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল দুই সিটি মেয়রকে সতর্ক করেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব শেষ তথ্যানুসারে গত বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর ২৭৬ জনের মৃত্যুর তথ্য সরকারের পর্যালোচনা কমিটির কাছে আসে। ওই সব তথ্য পর্যালোচনা শেষে ১৭৯ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. মাহবুবার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছরের পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখলে যে পর্যায়ের মশা নিয়ন্ত্রণ ও এডিস বা অ্যালবোপিকটাসের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস কার্যক্রম দেখার কথা ছিল তা এখনো দেখছি না। এবারও যদি মশা নিয়ন্ত্রণে আগেভাগে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তবে বিপদ কিন্তু গত বছরের চেয়েও আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছরের খারাপ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার এডিস মশার প্রজনন ধ্বংস করার কাজ সর্বাত্মকভাবে শুরু করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়ানক হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ঢাকার বাইরেও একইভাবে নজর দিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, এবার ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও আগের চেয়ে আরো জোরালো কার্যক্রমের প্রস্তুতি রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পক্ষ থেকে গত ১৮ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মশার ঘনত্ব ও উপস্থিতি দেখতে জরিপ চালানো হয়। তবে এবার কেবল আবাসিক পর্যায়ে এই জরিপ করা হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের ৯৮টি ওয়ার্ডের ১০০টি এলাকায় এক হাজার বাড়ি এই জরিপের আওতায় ছিল বলে কালের কণ্ঠকে জানান অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া কার্যক্রমের উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. আফসানা আলমগীর খান। জরিপে জানা গেছে, ঢাকা উত্তরে ডেঙ্গুর বাহক হিসেবে থাকা মশার মধ্যে ৯৮ শতাংশ হচ্ছে এডিস আর মাত্র ২ শতাংশ অ্যালবোপিকটাস। আর ঢাকা দক্ষিণে ৯৯ শতাংশ এডিস আর মাত্র ১ শতাংশ অ্যালবোপিকটাস।

একই দপ্তরের কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, ছোট আকারের ব্যক্তিগত বাড়ি, বিভিন্ন হাউজিং কম্পানির বড় বড় নির্মাণাধীন ভবন ও এসব বাড়িঘর ঘিরে থাকা খোলা জায়গায় জরিপ চালিয়েছি। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪০.৮ শতাংশ এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে নির্মাণাধীন বাড়িতে। মোট ২৬১টি নির্মাণাধীন বাড়ি পরীক্ষা করে ৩৮.৫ শতাংশ বাড়িরই বড় বড় চৌবাচ্চার পানিতে পাওয়া গেছে লার্ভা।’

ডা. আফসানা আলমগীর খান জানান, জরিপে ঢাকা উত্তরে ৭৪টি পয়েন্টের মধ্যে ৪০টিতে নারী এডিস মশা ও ৪১টিতে পুরুষ এডিস মশা পাওয়া যায়। অন্যদিকে দক্ষিণের ৬৩টি পয়েন্টের ৩৯টিতে নারী ও মাত্র ১০টিতে পুরুষ পাওয়া যায়। ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হিসেবে নারী এডিস মশার উপস্থিতি বেশি দক্ষিণ সিটি এলাকায়।

অন্যদিকে জরিপে আগের মতোই প্লাস্টিকের ড্রাম, পানির ট্যাংক, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের জলাবদ্ধ মেঝে, ধাতব ড্রাম, ফুলদানি, সেলুনের ব্যবহৃত বিশেষ পাত্র, মগ ও ঘরে ব্যবহৃত অন্যান্য পাত্রেও লার্ভার অবস্থান পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, মার্চে আরেক দফা জরিপ হবে। এরই মধ্যে এর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জরিপের পরিধি আরো কিছুটা বাড়ানোর পরামর্শ এসেছে কিছু কিছু পরামর্শসভা থেকে। জরিপ ছাড়াও ডেঙ্গু প্রতিরোধে অন্যান্য কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই সামনের পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।

রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী বলেন, মানুষের সচেতনতার বিষয়টি অনেক বড় ব্যাপার। মানুষ যদি নিজেরাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজের ঘরবাড়ি এডিসের প্রজননমুক্ত রাখতে পারে, তবেই অনেক উপকার পাওয়া যাবে। তিনি আরো বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে সারা দেশের স্কুল-কলেজসহ সর্বব্যাপী ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর অনেকগুলো হাসপাতাল থেকেই আমরা তথ্য পাইনি। তাই এবার সেগুলো মাথায় রেখে এরই মধ্যে সব হাসপাতালে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করা যায় এবার যে হাসপাতালে রোগী যাবে সেই হাসপাতালের তথ্যই আমাদের কাছে চলে আসবে।’

কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ২৪১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে একজন বাদে সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। তবে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন ডেঙ্গু আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত এক অবহিতকরণ সভায় উপস্থিত আলোচকরা এডিসের পাশাপাশি ঢাকার বাইরে অ্যালবোপিকটাস মশার ওপর জরিপ ও সে অনুসারে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানোর তাগিদ দেন। সঙ্গে ঢাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কীটনাশকের মানের ওপর জোর দেন। ওই সভায় উপস্থিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাই দাবি করেন, তাঁরা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক কার্যক্রম চলাচ্ছেন। নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ ছাড়া অভিযান ও সচেতনতামূলক আরো কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

 

মন্তব্য