kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

মধ্যরাতের আগুনে নিভল তিন প্রাণ

দিলু রোডের ছয়তলা আবাসিক ভবনের দোতলায় বায়িং হাউস। নিচতলায় রাখা ছিল ফোম। ফলে মুহূর্তেই আগুন ভয়ানক আকার ধারণ করে। ধোঁয়ায় ও লাফিয়ে পড়ে আহত ১২ জন হাসপাতালে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মধ্যরাতের আগুনে নিভল তিন প্রাণ

মগবাজারের দিলু রোডে আগুনে নিহত স্বজনদের আহাজারি (বামে)। মা-বাবার সঙ্গে শিশু রুশদির এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি। (সংগৃহীত) ছবি : কালের কণ্ঠ

রাত ৩টায় হঠাৎ ‘আগুন লাগছে, আগুন লাগছে’ বলে দারোয়ানের চিৎকারের সঙ্গে হৈচৈ পড়ে যায় রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের দিলু রোডের ৪৫/এ নম্বর ভবনের সামনে। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। চরম বিভীষিকার মধ্যে ঘুম ভাঙে ভবনে থাকা ১১টি পরিবারের সদস্যদের। শুরু হয় ছোটাছুটি। বাঁচার জন্য কেউ ছয়তলা ভবনের ছাদের দিকে, কেউ সিঁড়ি দিয়ে নিচে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কয়েকজন পাশের পাঁচতলা ভবনের ছাদে লাফিয়ে পড়ে হাত-পা ভাঙেন। কিন্তু বাঁচতে পারেননি এক শিশুসহ তিনজন।

গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লাগা এ আগুনের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১২ জন। গুরুতর অবস্থায় শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন শহীদুল কিরমান রনি (৪৫) এবং তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস (৩৭)। এই দম্পতির সন্তানই শিশু রুশদী (৫), আগুনের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে সে। নিহত অন্য দুজন হলেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফরিন জান্নাত জুথি (১৭) ও বায়িং হাউসে কাজ করা আবদুল কাদের লিটন (৪৫)। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট কাজ করে। ভোর ৫টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগে।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার লিমা খানম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। এর জন্য পাঁচ সদস্যের একটি তদন্তদল গঠন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্তসাপেক্ষে বলা যাবে।’

বাসাটির বাসিন্দা এবং প্রতিবেশীদের অভিযোগ, ছয়তলা ভবনটিতে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা যে জন্যই আগুন লাগুক না কেন, এর পেছনে দ্বিতীয় তলায় থাকা ‘ক্লাসিক ফ্যাশন’ নামে বায়িং হাউস অনেকাংশে দায়ী। এ ছাড়া পঞ্চম তলায় থাকা এক ব্যবসায়ীর নিচতলায় গ্যারেজে রাখা ফোম আগুন উস্কে দেওয়ায় এটি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যা পরবর্তী সময়ে গ্যারেজে থাকা কয়েকটি প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ভয়াবহ আকার নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিলু রোডের বাসাটির তৃতীয় তলা থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত আটটি ইউনিটে ১১টি পরিবার থাকত। বাড়িটির মালিক বর্তমানে ছয়জন। দ্বিতীয় তলার মালিক রনি নামে একজন নিজের বায়িং হাউস চালাতেন। আর পঞ্চম তলার কবির নামে অন্য মালিকের কারখানার ফোম রাখা হয়েছিল নিচতলায় গ্যারেজে। নিহত শিশু রুশদীর পরিবার থাকত তৃতীয় তলায়। আর ভিকারুননিসা স্কুলের শিক্ষার্থী জুথির পরিবার থাকত পঞ্চম তলায়।

রাত ৩টার দিকে হঠাৎ আগুন, আগুন চিৎকার শুনে হতবিহ্বল ভবনটির বাসিন্দারা টের পান নিচতলায় আগুন লেগেছে। আগুন থেকে বাঁচতে অনেকেই পাশের পাঁচতলা ভবনের ছাদে লাফ দিয়ে নামেন। এতে অন্তত আটজনের হাত-পা ভেঙেছে। ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয় ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া সুমাইয়া আক্তার (৩০), মাহাদি (৯) ও শিশু মাহমুদুল হাসানকে (৯ মাস)। চিকিৎসা নিয়ে পরে তাঁরা বাসায় ফিরে যান।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বার্ন ইউনিটের আইসিইউর সামনে স্বজনদের ভিড় লেগে আছে। আগুনে দগ্ধ শহীদুল কিরমানী রনির শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। আর তাঁর স্ত্রীর পুড়েছে ৯৫ শতাংশ। দুজনের এমন অবস্থায় কান্নার রোল পড়ে আইসিইউর সামনে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন তাদের থামানোর চেষ্টা করছিলেন। জানা যায়, শহীদুল কিরমানী রনি ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্ট কম্পানিতে চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে রয়েছেন। তাঁর বাবা এ কে এম শহীদ উল্লাহ দৈনিক কালের কণ্ঠ’র সিনিয়র প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রনি বড়। তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল বেক্সিমকো কম্পানির অ্যাকাউন্টসে চাকরি করছেন। দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলছেন চিকিৎসকরা। এই দম্পতির নিহত শিশু রুশদী এজি সার্জ স্কুলে প্লেতে পড়ত।

রনির বন্ধু শামসুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রনি-জান্নাতসহ আমরা ১৯৯৭ সালের এসএসসির ব্যাচ। শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে অনেক সময় তাদের সঙ্গে কাটিয়েছি। হঠাৎ এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।’ জান্নাতের মা ফিরোজা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার নাতিটা মারা গেল। মেয়েটা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তার স্বামীও যায় যায় অবস্থা। বিশ্বাস করতে পারছি না নাতি নাই। কী সুখের সংসারটা মুহূর্তের মধ্যে কী হয়ে গেল।’

দুপুর ২টার দিকে ৪৫/১ দিলু রোডের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাসার কলাপসিপল গেট আটকানো। ভেতরে জ্বলেপুড়ে পড়ে আছে পাঁচটি প্রাইভেট কার। ছয়তলা ভবনটি আগুনের আঁচে কালো হয়ে আছে। বাসার দারোয়ান লুত্ফর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাতে হঠাৎ করে বৈদ্যুতিক মিটার থেইকা শব্দ হয়। পরে আগুন লাইগা গেলে আমি গেইট খুইলা বাইরে গিয়া চিল্লাইতে থাকি। নিচে টেবিলের মইধ্যে কাদির ঘুমাইতাছিল। তারে ডাক দেওয়ার সময়ও পাই নাই। গাড়ি বাস্ট হইয়া ও পুইড়া গেছে।’

ছয়তলার বাসিন্দা পারভীন আক্তার বলেন, ‘আগুনের কথা শুনে চিলেকোঠার টিনে গিয়ে উঠি। পরে দেহি সেইখানেও গরম লাগে। পরে কয়েকজন মিল্লা পানির ট্যাংকি ভাইঙ্গা পানি গায়ে মাখলাম। এরপর আরো ধোঁয়া আসতে শুরু করাতে সবাই পাশের বিল্ডিংয়ে লাফ দিতে থাকে। আমিও এক মেয়ে আর স্বামীসহ লাফ দিই।’

লাফ দিয়ে আহত শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘আগুনে সব শেষ। বাঁচার জন্য লাফ দিয়া পা ভাঙছি। ব্যান্ডিস কইরা এহন ভাইয়ের বাসায় আছি। বারবার কইছিলাম বায়িং হাউস না রাখতে। রনি (দ্বিতীয় তলার মালিক) শুনে নাই। তার কী সে তো থাকে না। এখন আমাদের কষ্ট হইল। তিনটা মানুষ মরল। আরো দুইজন মরার পথে!’

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘আগুনের ঘটনায় তিনটি মরদেহ পাই। সবাই শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। মৃত্যুর পর দুজনের দেহ পুড়ে যায়। আরেকজন দগ্ধ না হলেও তার ইনহেলেশন বার্ন ছিল।’

এদিকে শিশু রুশদিসহ তিনজনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে গতরাতে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা করা হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা