kalerkantho

বুধবার  । ১৮ চৈত্র ১৪২৬। ১ এপ্রিল ২০২০। ৬ শাবান ১৪৪১

প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন

কত নিয়েছেন প্রশান্ত কুমার হালদার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কত নিয়েছেন প্রশান্ত কুমার হালদার

ফাইল ছবি

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল) বিষয়ে আপিল বিভাগে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএলএফএসএল থেকে এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা সরানো হয়েছে। এর সঙ্গে বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় দেখলাম, একই ব্যক্তি সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। আপনি বলছেন এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। আপনাদের এই হিসাবে শুভংকরের ফাঁক আছে কি না?’

এদিকে পি কে হালদার, আইএলএফএসএলের সাবেক চেয়ারম্যানসহ ২০ জনের ওপর বিদেশ যাওয়া ও সব ধরনের সম্পদ হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা, তাঁদের ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের ওপর আজ বুধবার আদেশ দেবেন আপিল বিভাগ।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ গতকাল মঙ্গলবার শুনানি শেষে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আইএলএফএসএলের দুজন পরিচালকের পক্ষে করা এক আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আদালত আদেশের দিন ধার্য করেন এবং বাংলাদেশ বাংকের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদালতে আবেদনকারীপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী, রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম। আপিল বিভাগের আদেশে উপস্থিত ছিলেন আইএলএফএসএলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম। আদালত আইএলএফএসএল বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য শোনেন।

হাইকোর্ট গত ১৯ জানুয়ারি এক আদেশে ইব্রাহিম খালেদকে আইএলএফএসএলের স্বাধীন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চেয়ারম্যান, এমডি, প্রশান্ত কুমার হালদারসহ ১৩ পরিচালকের ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দ, সব সম্পদ ক্রোক করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের মা, স্ত্রী, ভাইসহ ২০ জনের ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দ এবং সব সম্পদ ক্রোক করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই ২০ জনের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় এবং তাঁদের গত পাঁচ বছরের আয়কর রিটার্ন হাইকোর্টে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই আদেশ স্থগিত চেয়ে আইএলএফএসএলের দুজন পরিচালক আপিল বিভাগে আবেদন করেন।

গতকাল শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আবেদন খারিজ করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, কিছু লোক কিছু লেখাপড়া শেখে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। এরা হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল। তিনি বলেন, আগে তো ব্যাংক ছিল না। মানুষ গোলায় ধান রাখত। এটাই ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে। আর এখন অনেকেই ব্যাংক করেন জনগণের টাকা লুটের জন্য। তিনি বলেন, ‘পি কে হালদার কিভাবে দেশ ছেড়ে চলে গেল সেটা আপনাদের (আদালতের) দেখা উচিত।’ তিনি বলেন, হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন এর চেয়ে ভালো আদেশ হতে পারে না। তিনি বলেন, এখন যে পরিস্থিতি তাতে আদালত চোখ বন্ধ করে থাকতে পারেন না। দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে আদালত আদেশ দিতে পারেন। তিনি বলেন, হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করা হলে যারা কম্পানিটিকে ডুবিয়েছে, তারাই লাভবান হবে।

এর আগে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, পি কে হালদারসহ কয়েকজন ব্যক্তি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে প্রায় এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। এই টাকা কোথায় গেছে তার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটির যে অবস্থা তাতে বাঁচিয়ে রাখা যাবে কি না তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, এর আগে পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করা হয়েছে। এখন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকে অবসায়ন করা হলে এ সেক্টরে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

মো. শাহ আলম বলেন, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের অনিয়মের বিষয়ে যখনই জানতে পেরেছি, তখনই দুদককে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটও এ নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের যে অবস্থা তাতে এখনো প্রতিষ্ঠানটি বাঁচানো সম্ভব। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা সরানো হয়েছে।

এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় দেখলাম এক ব্যক্তিই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। কিন্তু আপনি বলছেন এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। আপনাদের হিসাবে শুভংকরের ফাঁকি আছে কি না?’

জবাবে মো. শাহ আলম বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় কী লিখল তা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। তবে আমরা পেয়েছি, এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে পি কে হালদারেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।’

শুনানিতে প্রধান বিচারপতি তাঁর কাছে জানতে চান যে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের মতো টাকা আছে কি না? জবাবে শাহ আলম বলেন, গত বছর ১৪০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০০ কোটি টাকা দেওয়া যাবে।

ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের বিতরণকৃত ঋণের টাকা ৭৮১টি চেকের মাধ্যমে দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৪১টি ব্যাংক ও কিছু ব্রোকারেজ হাউসে স্থানান্তর করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এই টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অনিয়মের জন্য কম্পানির পরিচালনা পর্ষদসহ সংশ্লিষ্টরা সম্মিলিতভাবে দায়ী। 

তবে আবেদনকারীর আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক পি কে হালদারসহ যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে আমার যারা আবেদনকারী, তারা এই প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু আমাদের ঘাড়ের ওপর অন্য লোক থাকায়, আমাদের ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দ করা ও বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি না। এ অবস্থায় হাইকোর্টের আদেশ প্রত্যাহার চাচ্ছি।’ শুনানি শেষে আদালত আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা