kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

এনু-রূপনের বাড়িতে ‘টাকার খনি’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



 এনু-রূপনের বাড়িতে ‘টাকার খনি’

ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার গেণ্ডারিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও তাঁর ভাই রূপন ভূঁইয়ার পুরান ঢাকার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পাঁচটি সিন্দুকে রাখা বিপুল পরিমাণ টাকা, সোনা ও ক্যাসিনোর সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

এ যেন রূপকথার দৈত্যের গুহা থেকে রাশি রাশি অর্থ আর স্বর্ণালংকার উদ্ধারের ঘটনা। পাঁচ মাস আগে তাঁদের বাসা থেকে র‌্যাব উদ্ধার করেছিল পাঁচ কোটি টাকা ও আট কেজি স্বর্ণালংকার। এর সাড়ে তিন মাস পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন ওই দুই ভাই—গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভুইয়া। তবে তাঁদের টাকার গুদামের খোঁজ মেলা অব্যাহত আছে। গত সোমবার রাতে র‌্যাবের অভিযানে পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১১৯/১ নম্বর বাড়িতে পাওয়া গেছে নগদ প্রায় ২৭ কোটি টাকা। পাঁচটি ভল্টে রাখা ওই টাকা দুটি মেশিন দিয়ে গুনতে সময় লেগেছে তিন ঘণ্টা।

গত সেম্পেম্বরে বাসা থেকে পাঁচ কোটি টাকা ও আট কেজি স্বর্ণালংকারের উদ্ধারের ঘটনায় গেণ্ডারিয়া, ওয়ারী ও সূত্রাপুর থানায় দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও অস্ত্র আইনে চারটি মামলা হয়েছিল। সেই মামলাগুলো বর্তমানে তদন্ত করছে সিআইডি ও ডিবি। এই তদন্তাবস্থায় সোমবার রাতে লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১১৯/১ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষে এত টাকা উদ্ধারের খবরে অবাক হয়েছে এলাকাবাসী। জানতে চাইলে ওয়ারী থানার ওসি আজিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেখানে যে এত টাকা রয়েছে আমরা সেটা জানতে পারিনি।’

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মানি লন্ডারিং আইনের মামলায় তদন্তে নেমে তাঁদের ৭২টি প্লট, ১২১টি ফ্ল্যাটের তথ্য পেয়েছি। তাঁদের দুই ভাইকে গ্রেপ্তারও করি আমরা।’ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তাঁদের অনেক প্রপার্টি, সব প্রপার্টিতে তল্লাশি করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। কখনো আমরা পাব, কখনো র‌্যাব পাবে—এভাবেই কাজ হবে।’

যেভাবে অভিযান : এক র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, সেপ্টেম্বর মাসে এনু-রূপনের বাসা থেকে বিপুল টাকা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধারের পর থেকেই র‌্যাবের গোয়েন্দারা তৎপর ছিলেন। একটি সোর্সের মাধ্যমে জানা যায়. তাঁদের আরো নগদ টাকা রয়েছে। কিন্তু তাঁদের এতগুলো বাড়ি ও ফ্ল্যাট থাকায় কোনটিতে ঠিক টাকা আছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মাসখানেক ধরে র‌্যাব নজর রাখতে শুরু করে লালমোহন সাহা স্ট্রিট এলাকায় থাকা তাঁদের ছয়টি বাড়ির ওপর। এর মধ্যেই গত সোমবার র‌্যাব-৩-এর সদস্যরা জানতে পারেন, লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১১৯/১ নম্বর মমতাজ ভিলা নামের বাড়ির নিচতলায় ফ্ল্যাটে টাকার ভল্ট রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ওই দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে র‌্যাব গিয়ে দেখতে পায়, ফ্ল্যাটটির দরজা তালাবদ্ধ। পরে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন র‌্যাব সদস্যরা। তাঁরা দেখেন, একটি কক্ষে পাঁচটি ভল্ট সাজানো আছে। এর মধ্যে একটি ভল্টের ড্রয়ার ভাঙা। বাকি ভল্টগুলোর তালা ভেঙে অবাক হয়ে যান র‌্যাব কর্মকর্তারা। প্রতিটি ভল্টে ১০০০ টাকার নোটের বান্ডেল আর বান্ডেল। সব বান্ডেল বের করেন তাঁরা। কক্ষের মাঝখানে সেগুলো রাখার পর যেন টাকার পাহাড় হয়ে যায় সেটি। হাতে গুনে এই টাকার হিসাব করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এ কারণে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে র‌্যাব। সকাল ৯টার দিকে ব্যাংক খোলার পর একটি ব্যাংক থেকে দুটি টাকা গোনার মেশিন এনে টাকা গোনা শুরু হয়। সেই টাকা গোনা শেষ হয় ১টার দিকে।

পরে ঘটনাস্থলে এক ব্রিফিংয়ে র‌্যাব-৩ অধিনায়ক রাকিবুল হাসান বলেন, নিচতলার ওই বাসায় পাঁচটি সিন্দুকে ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা নগদ এবং পাঁচ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে। আরো পাওয়া যায় প্রায় এক কেজি সোনা, ৯ হাজার ২০০ ইউএস ডলার, ১৭৪ মালয়েশিয়ান রিংগিত, ৩৫০ ভারতীয় রুপি, এক হাজার ৫৯৫ চায়নিজ ইয়েন, ১১ হাজার ৫৬০ থাই বাথ ও ১০০ দিরহাম। তিনি বলেন, বাসাটি থেকে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। বাসাটি খুব ছোট। এখানে মাত্র একটি চৌকি আছে। এটি ছয়তলা ভবনের নিচতলার একটি বাসা। ধারণা করা হচ্ছে, এ বাসায় টাকা রেখে কেউ এর পাহারায় থাকতেন। তবে এখান থেকে কাউকে আটক করা যায়নি।

রাকিবুল হাসান বলেন, ‘এই অর্থ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র এখন আমরা থানায় হস্তান্তর করব। পরে সেখান থেকে নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়ে যাবে।’ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এনু আর রূপনই মমতাজ ভিলার মালিক। তবে এত টাকার উৎস কী,  কেন এখানে এনে রাখা হয়েছিল, সেসব বিষয় তদন্ত করে বের করতে হবে।’

জানা গেছে, ওই বাড়িতে পাওয়া ক্যাসিনোর সরঞ্জামে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সিল লাগানো ছিল। গতকাল মমতাজ ভিলায় অভিযানের মধ্যেই ওই এলাকায় এনু ও রূপনের আরো একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়ার খবর আসে। লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১০৬ নম্বর হোল্ডিংয়ে দশতলা ওই ভবনের নামও মমতাজ ভিলা। ওই বাড়িতেও অভিযান চালানো হবে বলে র‌্যাব সদর দপ্তরের সহকারী কমিশনার সুজয় সরকার সে সময় জানান। পরে সেই বাড়িতে কিছু পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কয়েকটি ক্লাবের সঙ্গে ওয়ান্ডারার্সে অভিযান চালিয়ে জুয়ার সরঞ্জাম, কয়েক লাখ টাকা ও মদ উদ্ধার করে র‌্যাব। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর গেণ্ডারিয়ায় প্রথমে এনু ও রূপনের বাড়িতে এবং পরে তাঁদের এক কর্মচারী ও এক বন্ধুর বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচটি সিন্দুক ভর্তি প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, আট কেজি সোনা এবং ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

যেমন ছিল ঘটনাস্থল : গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে, র‌্যাব সদস্যরা ঘিরে রেখেছেন ১১৯/১ নম্বর বাড়িটি। নিচতলার কক্ষটিতে মেশিন দিয়ে টাকা গুনছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। পেছনের দিকে বসে আছেন র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক। দুপুর ১২টার দিকে সেখানে যায় সিআইডির একটি টিম। শত শত উত্সুক মানুষ ভিড় করে ওই বাড়ি ঘিরে।

দশতলা ভবন খালি, ছিল রংমহল : এনু-রূপনের মায়ের নাম মমতাজ বেগম। তাঁদের মায়ের নামেই বেশির ভাগ বাড়ির নাম দেওয়া হয়েছে। গতকাল ওয়ারীর লালমোহন সাহা স্ট্রিটের চিপাগলিতে গিয়ে ‘মমতাজ ভিলা’ নামের দুটি বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি ছয়তলা, অন্যটি দশতলা। ছয়তলা বাড়ির নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে পাওয়া গেছে টাকার গুদাম। অন্যদিকে দশতলা বাড়িটি এখন খালি। কোনো ফ্ল্যাটেই কেউ বসবাস করছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বাড়িকে এনু-রূপন রংমহল বানিয়েছিলেন। তাঁদের ক্যাডাররা এর বিভিন্ন ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। সন্ধ্যার পরে একটি ফ্ল্যাটে ডিসকোর আসর বসত। এনু-রূপনের বাসা থেকে প্রথম টাকা উদ্ধারের পরও কিছু ক্যাডার সেখানে বসবাস করতেন। তবে দুই ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে আর কেউ বসবাস করেন না। তাঁদের এক ভাই পরিবার নিয়ে পাশের ছয়তলা ভবনের চারতলায় বসবাস করেন। কিছুদিন আগে তাঁদের বাবা মারা গেছেন।

সূত্র জানায়, এনু-রূপন গ্রেপ্তারের পর তাঁদের এক ভাবিসহ কয়েকজন আত্মীয় তাঁদের সম্পদের খোঁজখবর রাখছেন। তাঁদের মালিকানাধীন বাড়ি ও ফ্ল্যাট থেকে ভাড়া উঠাচ্ছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা