kalerkantho

বুধবার । ২৫ চৈত্র ১৪২৬। ৮ এপ্রিল ২০২০। ১৩ শাবান ১৪৪১

মুশফিকের রেকর্ডে মিশে জয়ের সুবাস

সংক্ষিপ্ত স্কোর : জিম্বাবুয়ে : ২৬৫ এবং ৫ ওভারে ৯/২
►বাংলাদেশ : ১৫৪ ওভারে ৫৬০/৬ ডিক্লে.

নোমান মোহাম্মদ   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুশফিকের রেকর্ডে মিশে জয়ের সুবাস

থাবার ভঙ্গিতে, মুখের গর্জনে বাঘই মনে হচ্ছিল। পরে নিজে জানালেন, সেটি বাঘ নয়, ডায়নোসর!

প্রথমে শূন্যের লাফে স্পর্শ করতে চান আকাশ। এরপর বাতাসে ছুড়ে দেওয়া মুষ্টিবদ্ধ হাত হয়ে ওঠে অদৃশ্য ডানা। এই উৎসব কিংবা হেলমেট খোলা উল্লাস তো প্রথায় প্রত্যাশিত। কিন্তু ক্যারিয়ারের তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরির পর এটুকুনে চলে! মনে পড়ে গেল তাঁর ছোট্ট ছেলে মায়ানের কথা। ডায়নোসর-ডায়নোসর খেলায় বাবাকে যে ভয় দেখায় খুব। ক্রিকেট মাঠে এমন অর্জনের পর তাই ডায়নোসরের মতো দুই হাতে থাবার ভঙ্গিতে মুখের গর্জনে সন্তানকে স্মরণ মুশফিকুর রহিমের।

যে গর্জনে কেঁপে উঠেছে ক্রিকেট ইতিহাসের কত কত রথী-মহারথী!

গ্যারি সোবার্সের কথাই ধরুন না। টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংসটি এই ক্যারিবিয়ানের অধিকারে ছিল তিন যুগ। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে যে অপরাজিত ৩৬৫ রানের ইনিংস খেলেন, ৩৬ বছর পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তা টপকে ব্রায়ান লারার ৩৭৫ রান। ৯৩ টেস্টের ক্যারিয়ারে ২৬ সেঞ্চুরি সোবার্সের। সেঞ্চুরির ক্লাবের ফিতা কাটেন কিংসটনের সেই অবিস্মরণীয় ট্রিপলে। অথচ এরপর আর একটি মাত্র ইনিংসে তাঁর দুই শ পেরোনো ইনিংস।

সোবার্সের মতো ক্যারিয়ারে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি ম্যাথু হেডেন, গ্রাহাম গুচ, হানিফ মোহাম্মদ, ডেনিস কম্পটনদের মতো কিংবদন্তিদের। ক্লাইভ লয়েড, জ্যাক হবস, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথদের একটি করে। আবার কত কত গ্রেট ব্যাটসম্যান তো ক্যারিয়ারে ডাবল সেঞ্চুরিই করতে পারেননি। সেই কিংবদন্তিদের উচ্চতায় এখনো ওঠা হয়নি মুশফিকের। তবে তিন-তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলে একটা ক্যাটাগরিতে অন্তত তাঁদের পেছনে ফেলেছেন তিনি!

কাল তাঁর অমন কীর্তির আলোয় তাই ম্লান হয়ে যায় বাকি সব কিছু। অধিনায়ক মমিনুল হকের সেঞ্চুরি, মুশফিকের সঙ্গে ২২২ রানের জুটি, বাংলাদেশের ৬ উইকেটে ৫৬০ রানে ইনিংস ঘোষণা, শেষ বিকেলে প্রথম ওভারেই নাঈম হাসানের দুই উইকেট তুলে নেওয়া, টেস্ট জয়ের নিশ্চয়তার ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়া—সব!

বাংলাদেশ দিন শুরু করে ৩ উইকেটে ২৪০ রানে। মমিনুল ৭৯ এবং মুশফিক ৩২ রানে। টেস্টপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়কের প্রতিশ্রুত সেঞ্চুরির আলপনা আঁকা তখন অধিনায়কের ব্যাটেই। দুর্দান্ত এক বাউন্ডারিতে ঠিকই সেঞ্চুরিতে পৌঁছে যান মমিনুল। মুশফিকের সঙ্গে অসমাপ্ত জুটি বাংলাদেশের জন্য ক্রমশ হয়ে উঠতে থাকে আনন্দময় আখ্যান। ৯৯ রান নিয়ে লাঞ্চে যাওয়া মুশফিক পরপরই কাট করে মারা বাউন্ডারিতে ক্যারিয়ারের সপ্তম টেস্ট সেঞ্চুরিতে। সেটি যে তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপান্তরিত হবে, সে প্রতিশ্রুতি শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের মেঘ-ধুলোর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল প্রবলভাবে।

কিন্তু অধিনায়ক মমিনুলের প্রতিশ্রুতির ক্যানভাস তো ছিল আরো বড়! সর্বশেষ পাঁচ টেস্টের ১০ ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সেঞ্চুরিহীনতার কথা মনে করিয়ে দিতেই সে অর্জনের কথা দেন টেস্ট শুরুর আগের দিন। ডাবল সেঞ্চুরি, এমনকি ট্রিপল সেঞ্চুরিও হতে পারে বলে ছিল প্রতিশ্রুতি। সেটি নিজের ব্যাটে হওয়াও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু ২৩৪ বলে ১৩২ রান করে এনডভুর বলে মমিনুল কট অ্যান্ড বোল্ড হয়ে গেলে দায় এসে বর্তায় যেন মুশফিকের ব্যাটে।

সে দায় মেটানোয় কেমন স্বতঃস্ফূর্তই না ‘লিটল ম্যাজিশিয়ান’-এর ব্যাট!

মোহাম্মদ মিঠুন (১৭) এসে কিছুক্ষণ সঙ্গ দিয়ে বিদায়। লিটন দাস সে ভুল করেন না। মুশফিকের ব্যাটিং সংগীতে সংগত দিতে থাকেন দারুণভাবে। আরেক বাউন্ডারিতে দেড় শতে পৌঁছান। কিন্তু বাঁধনহারা উদ্যাপনে ভেসে যান না। মনের কোণে ডাবল সেঞ্চুরি দেখতে পাচ্ছিলেন বলেই হয়তো বা! যেন জানতেন, উইকেটে টিকে থাকলে ডাবল সেঞ্চুরি হবেই। ১৬০ বলে সেঞ্চুরিতে পৌঁছানো মুশফিকের দেড় শ স্পর্শ ২৫৪ বলে। অর্থাৎ, এ পঞ্চাশের জন্য খেলেন ৯৪ বল। পরের পঞ্চাশ তুলনামূলক দ্রুতগতির—৬১ বলে। আরো একটি কাট শটে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ মুশফিকের। ৩১৫ বলে; ২৮টি চোখ-জুড়ানো বাউন্ডারির মালায়।

২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেন মুশফিক। দেশের সর্বোচ্চ রানের সে ইনিংস পরে টপকে যান তামিম ইকবাল এবং সাকিব আল হাসান। রেকর্ডটি তাঁর পুনরুদ্ধার ২০১৮ সালে এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই অপরাজিত ২১৯ রানের ইনিংসে। কাল নিজের সে রেকর্ড আরো বাড়িয়ে নিতে পারেননি মুশফিক। তাঁকে ৩১৮ বলে ২০৩ রানে রেখে ইনিংস ঘোষণা বাংলাদেশের। ২৯৫ রানে এগিয়ে থাকার পর জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ রানে ২ উইকেট তুলে নিয়েছে স্বাগতিকরা।

ব্যক্তিগত অর্জনে মুশফিকের ডায়নোসরের গর্জনের মতো এই টেস্টে বাংলাদেশের বাঘের গর্জনও তাই সময়ের ব্যাপার!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা