kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

গুটিকয়েক ব্যক্তির কাছে জিম্মি ব্যাংক খাত : সিপিডি

রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া ব্যাংক কমিশন গঠন অসম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গুটিকয়েক ব্যক্তির কাছে জিম্মি ব্যাংক খাত : সিপিডি

দেশের ব্যাংক খাত গুটিকয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে আছে বলে দাবি করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা এখন রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করছে না বলেও মনে করে সিপিডি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে প্রস্তাবিত ‘ব্যাংক কমিশন’ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি এসব কথা বলেছে।

সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। খেলাপি ঋণ বাড়ছে। মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে ব্যাংকগুলো। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখা কমিয়ে দিচ্ছে। সুদহার নিয়েও সমস্যা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই তাদের তৈরি করা নীতিমালার বরখেলাপ করছে প্রতিনিয়ত।

সরকারের ব্যাংক কমিশন গঠনের উদ্যোগকে অভিনন্দন ও স্বাগত জানিয়ে সেটিকে শর্তসাপেক্ষে সমর্থন দিয়েছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ব্যাংক কমিশনকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তবে রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া ব্যাংক কমিশন গঠন অসম্ভব বলে মনে করে সিপিডি।

সিপিডি বলেছে, ব্যাংক কমিশন যদি গঠন করা হয়, সেই কমিশন শুধু ব্যাংকের কার্যক্রম দেখবে নাকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও দেখবে, তা আগেই ঠিক করে দিতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা তো আরো খারাপ। ব্যাংক কমিশনকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। একই সঙ্গে কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সংস্থার সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও মোস্তাফিজুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি সরকার একটি ব্যাংক কমিশন গঠন করতে যাচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। ব্যাংক খাত নিয়ে আমরা অসহায়। একটা আতঙ্ক, ভয়ংকর, ভঙ্গুর পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছি। ঋণখেলাপিদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও মন্দ ঋণ বাড়ছে। এসব কর্মকাণ্ড আমাদের বিচলিত করে তুলেছে।’ তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বস্ততার সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে দেশে একটি ব্যাংক কমিশন গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে এই ব্যাংক কমিশন করতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ইচ্ছা ছাড়া ব্যাংক কমিশন গঠন সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে কার্যকর পরিবর্তন আনাও সম্ভব নয়।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘২০১২ সালের ৫ নভেম্বর হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারির পর থেকে আমরা ব্যাংক কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছি। এরপর আট বছর পেরিয়ে গেছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ব্যাংক কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও করে যেতে পারেননি। সরকারের নির্বাচনী ইশতিহারে মন্দ ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক কমিশন গঠন করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্যাংক কমিশন গঠন হয়নি।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংক কমিশন কি শুধু ব্যাংকের কার্যক্রমই দেখবে নাকি ব্যাংকের পুঁজিবাজারের বিষয়টি দেখবে, তা ঠিক করতে হবে। কমিশন কি শুধু সরকারি ব্যাংক দেখবে নাকি বেসরকারি ব্যাংকও দেখবে—তা কর্মপরিধিতে বলে দিতে হবে। বিদেশি ব্যাংক দেখবে কি না তাও ঠিক করে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কী কিংবা তারা কি স্বাধীনভাবে কাজ করছে, নাকি ক্ষমতা প্রয়োগ করে না, সেটিও দেখবে কি না কমিশন তার কর্মপরিধিতে সেটা ঠিক করে দিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনে যাওয়া মামলাগুলো কমিশন দেখবে কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে। সরকার কত টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে, কমিশন সেটা দেখবে কি না সেটিও ঠিক করতে হবে। ব্যাংকের টাকা নিয়ে যারা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিষয়ে কমিশনের ভূমিকা কি হবে সেটিও ঠিক করতে হবে সরকারকে। কমিশনের প্রতিবেদনকে আইনি ভিত্তি দিতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে ব্যাংক কমিশনের চেয়ারম্যান করার যে গুঞ্জন রয়েছে সে বিষয়ে সিপিডির অবস্থান কী জানতে চাইলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ব্যাংক কমিশনের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। সিপিডি থেকে কাউকে ব্যাংক কমিশনের সদস্য হওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানালে সাড়া মিলবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনো প্রস্তাব আসেনি। প্রস্তাব আসলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিবেচনা করা হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় বিদেশ থেকে টাকা ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদেরকেও একই উদ্যোগ নিতে হবে।’

এর আগে স্বাগত বক্তৃতায় ব্যাংক কমিশন গঠন কেন জরুরি তার গুরুত্ব তুলে ধরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ওই টাকা যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে থাকত, তাহলে কয়েকটা পদ্মা সেতু, পদ্মা রেল সংযোগ সেতু, মেট্রো রেল বানানো সম্ভব হতো। তিনি বলেন, এত দিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বেশি ছিল। এখন নতুন করে বেসরকারি ব্যাংকও যুক্ত হয়েছে, যা অশনিসংকেত।

ব্যাংক কমিশনের কার্যপরিধি কী হতে পারে তার একটি ধারণা দিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক কমিশন স্থায়ী কোনো কমিশন হবে না। এর সময়কাল হতে পারে তিন থেকে চার মাস। এই সময়ের মধ্যে তারা কাজ শেষ করবে। একই সঙ্গে সুপারিশমালাও জমা দেবে। যাঁদের দক্ষতা, যোগ্যতা, বিচক্ষণতা, সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই এবং যাঁরা নির্মোহ তাঁদেরকে ব্যাংক কমিশনের সদস্য করার আহ্বান জানান তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা