kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

প্রতি কিমি সড়ক বিভাজক উন্নয়নে ৯৪ লাখ টাকা!

► একই রকম চলমান অন্য প্রকল্পে খরচ পড়ছে ২৪ লাখ টাকা
► প্রতি কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯২ লাখ টাকা
► পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, ডিএনসিসির ওই প্রকল্পের আওতায় অস্বাভাবিক খরচ ধরা হয়েছে

আরিফুর রহমান   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতি কিমি সড়ক বিভাজক উন্নয়নে ৯৪ লাখ টাকা!

প্রতি কিলোমিটার সড়কদ্বীপ বা সড়ক বিভাজক উন্নয়নে ৯৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা করে খরচ করতে চায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মোট ১৩ কিলোমিটার রোড মিডিয়ান উন্নয়ন করার জন্য এ খাতে ১২ কোটি টাকা খরচ ধরেছে ডিএনসিসি। এ ছাড়া ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় প্রতিটি যাত্রীছাউনি নির্মাণে খরচ করা হবে ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। আর প্রতিটি ওয়েটিং শেড নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। রাস্তার মাঝখানে সড়কদ্বীপ উন্নয়ন, যাত্রীছাউনি ও ওয়েটিং শেড নির্মাণ খরচের ওই প্রস্তাব অস্বাভাবিক বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ওই সব অবকাঠামো নির্মাণে ডিএনসিসি যে খরচের প্রস্তাব করেছে, এর সঙ্গে বর্তমান বাজারমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

রোড মিডিয়ান উন্নয়ন, যাত্রীছাউনি ও ওয়েটিং শেড নির্মাণে খরচ কেমন, তা জানতে সমজাতীয় প্রকল্প পরিদর্শন করে একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএনসিসির ওই প্রস্তাব বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়ক দাবিতে সড়কে টানা আন্দোলন শুরু করেছিল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, রাজধানীতে স্কুল, কলেজের সামনে নতুন ফুট ওভারব্রিজ ও যাত্রীছাউনি নির্মাণ এবং রোড মিডিয়ান উন্নয়ন করা। জানা যায়, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ডিএনসিসি ওই প্রকল্প তৈরি করে। ৩৭২ কোটি টাকা ব্যয়সংবলিত ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ সড়ক নিরাপত্তা’ শিরোনামের প্রকল্পটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া করতে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ডিএনসিসি। তবে প্রকল্পে বিভিন্ন খাতে খরচের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা চলমান সমজাতীয় প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না দেখতে একাধিক প্রকল্প সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করা হয়। এতে দেখা গেছে, ডিএনসিসির খরচের প্রস্তাব চলমান সমজাতীয় প্রকল্পগুলোর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এ অবস্থায় ডিএনসিসির খরচের প্রস্তাবে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম সচিব রেজাউল আযম ফারুকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে যেসব খরচ দেখানো হয়েছে, আমরা তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছি।’

ডিএনসিসির আওতায় আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সামনে থেকে এলজিইডি অফিস পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ডিভাইডার (বিভাজক) বা সড়কদ্বীপ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদার মহিউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতি কিলোমিটার আইল্যান্ড (সড়কদ্বীপ) নির্মাণে খরচ পড়ছে ২৪ লাখ টাকা। অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার আইল্যান্ড নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৯৪ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগান দেওয়ার জন্য ৩৭২ কোটি টাকা ব্যয়সংবলিত ডিএনসিসির ওই প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ডিএনসিসিতে নতুন করে ১৫০টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হবে। সে জন্য খরচ ধরা হয়েছে ২৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিটি যাত্রীছাউনি নির্মাণে খরচ হবে ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা।

একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রতিটি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হচ্ছে গড়ে ছয় থেকে আট লাখ টাকার মধ্যে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব খাদেম কালের কণ্ঠকে বলেন, আট লাখ টাকার মধ্যেই একটি ভালো মানের যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা যায়। সেই হিসাবে প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রতিটি যাত্রীছাউনি নির্মাণে খরচ দ্বিগুণ দেখানো হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ডিএনসিসি এলাকায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ৭৬টি ওয়েটিং শেড নির্মাণ করার জন্য খরচ ধরা হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতিটি ওয়েটিং শেড নির্মাণে খরচ হবে ১৮ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ৩০টি নতুন ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করার জন্য ৯৫ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণে খরচ হবে তিন কোটি টাকারও বেশি। ডিএনসিসির ৩৯ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়নে খরচ হবে ৩৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতি কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়নে খরচ হবে ৯২ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিএনসিসির ওই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি খাতেই অস্বাভাবিক খরচ ধরা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৩ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে ৪২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে খরচ হবে তিন কোটি ২৬ লাখ টাকা। ১০ কিলোমিটার নর্দমা উন্নয়নে খরচ ধরা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। বিদ্যমান ৫০টি ফুট ওভারব্রিজ সংস্কারে খরচ হবে সাত কোটি টাকা। এ ছাড়া ৩০টি ফুট ওভারব্রিজে এসকেলেটর স্থাপনে খরচ ধরা হয়েছে ৪০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, উন্নত বিশ্বে চলাচলের জন্য এসকেলেটর অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও এসকেলেটরের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু বনানী ও বিমানবন্দর এলাকায় এসকেলেটর স্থাপনের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বারবার ওই সব এসকেলেটর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর ৩০টি এসকেলেটর কিভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই প্রকল্প প্রস্তাবে।

ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শরীফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ সড়ক নিরাপত্তা শিরোনামের প্রকল্পটি অনুমোদন করতে আমরা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছি। প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন করা হয়নি। অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।’ এ প্রকল্পের আওতায় ডিভাইডার উন্নয়ন, যাত্রীছাউনি, ওয়েটিং শেড নির্মাণে অস্বাভাবিক খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা