kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ চৈত্র ১৪২৬। ৩১ মার্চ ২০২০। ৫ শাবান ১৪৪১

পাঁচ বছর একই বৃত্তে ঝরে পড়ার হার

শরীফুল আলম সুমন   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাঁচ বছর একই বৃত্তে ঝরে পড়ার হার

শিক্ষা খাতে সরকারের উদ্যোগের শেষ নেই। এরই মধ্যে প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। জেন্ডার সমতা নিশ্চিত হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে। সরকার এখন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করায় জোর দিয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে কয়েক বছর ধরে ঝরে পড়ার হার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এখনো ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি ঝরে পড়ছে। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই বড় অংশের শিক্ষার্থী ঝরে গেলে একটি দেশের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোটা দুরূহ হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

জানা যায়, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এই তিন স্তরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে মাধ্যমিক। এই স্তরের জন্য একাধিক প্রকল্পসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে মাধ্যমিকেই। আর তিন স্তরেই ছেলেদের তুলনায় বেশি ঝরে পড়ছে মেয়েরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিস্তার ও উন্নয়নে সরকার বৃত্তি, উপবৃত্তি, বিনা মূল্যে বই বিতরণসহ নানা সুবিধা বাড়িয়েছে। ২০১৩ সালে একযোগে জাতীয়করণ করা হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত বছর দুই হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা, চাকরির স্থায়িত্ব ও পেশার প্রতি মর্যাদা বাড়ানো হচ্ছে। এর পরও এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটা পর্যায়ে এসে ঝরে পড়ার হার বেশি একটা কমে না। মূলত যারা ভালোভাবে শিক্ষা অর্জন করতে পারে না তারাই ঝরে যায়। তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এই হার কমে যাবে। এ জন্য আমরা প্রাথমিকে রিডিং, রাইটিং ও ম্যাথ অলিম্পিয়াডের ওপর জোর দিয়েছি। আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘ঝরে পড়ার আরেকটি কারণ দারিদ্র্য। অনেক পরিবার গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেট করলে আর স্কুলে যায় না। তবে আমরা সব স্কুলেই স্কুল ফিডিং চালু করতে যাচ্ছি। এতে ঝরে পড়ার হার অনেকাংশেই কমে যাবে।’

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, প্রাথমিকে ২০১৯ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ১৮.৬ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৮.৮৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে ১৯.২ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২০.৪ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ২০.৯ শতাংশ। অথচ ২০০৯ সালে এই ঝরে পড়ার হার ছিল ৪৫.১ শতাংশ। এর পর থেকে পাঁচ বছর নানা উদ্যোগের ফলে ব্যাপকভাবে ঝরে পড়া কমেছে। অথচ গত পাঁচ বছরে যেন ঝরে পড়ার হার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

মাধ্যমিকে ২০১৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩৭.৬২ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৩৭.৮১ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৩৮.৩০ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৪০.২৯ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৪১.৫৯ শতাংশ। অথচ ২০০৯ সালে মাধ্যমিকের ঝরে পড়ার হার ছিল ৫৫.৩১। এর পরের পাঁচ বছর দ্রুতগতিতে ঝরে পার হার কমলেও গত পাঁচ বছরে তা ঝিমিয়ে পড়েছে।

উচ্চ মাধ্যমিকে ২০১৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৯.৬৩ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৯.৮৯ শতাংশ, ২০১৬ সালে ২০.০৮ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২০.৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ২১.৩৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে এই স্তরেও ঝরে পড়ার হার ছিল ৪২.১১ শতাংশ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মতোই পরবর্তী পাঁচ বছর ব্যাপকভাবে ঝরে পড়ার হার কমলেও গত পাঁচ বছরে প্রায় একই রয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষায় একটি বড় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। কারিকুলামে বড় পরিবর্তন আসছে। আমরা শিক্ষাকে জীবনমুখী করতে চাই। এ জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাধ্যমিক স্তরেও কারিগরি শিক্ষা যুক্ত করা হচ্ছে। এতে পড়ালেখার পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ শিখতে পারবে শিক্ষার্থীরা। তাদের মাধ্যমিক শিক্ষা শেষেও চাকরির নিশ্চয়তা থাকবে। ফলে ঝরে পড়ে অনেকাংশেই কমে যাবে।’

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়েদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। তবে সার্বিকভাবে বলতে গেলে, শিক্ষাব্যয় ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে শিক্ষার্থীরা ঝরে যাচ্ছে। স্কুলে হয়তো সবাই বিনা মূল্যে পাঠ্য বই পাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিকে বেতন লাগছে না। কিন্তু এরপরে কী আর খরচ নেই? আসলে স্কুলের বাইরের খরচাই বেশি। মেয়েরা উপবৃত্তি পেলেও সেই টাকার পরিমাণ কত! বাস্তবে তার পরিবার কতটুকু সহায়তা পাচ্ছে? সরকারের উচিত এলাকাভিত্তিক ঝরে পড়ার কারণ খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।’

জানা যায়, আগের চেয়ে মানুষ এখন আর্থিকভাবে বেশ সচ্ছল। দরিদ্র পরিবারও তার সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে চায়। তবে যারা অতিদরিদ্র তাদের কথা ভিন্ন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন আর খুব বেশি লেখাপড়া হয় না। প্রাথমিক পর্যন্ত কোনো রকম শিক্ষার্থীরা উতরে যায়। সেখানে পড়ালেখার খুব একটা চাপ না থাকায় স্কুলে যা পড়ালেখা হয়, তা দিয়েই কোনো রকম চালিয়ে নেয় শিক্ষার্থীরা। তবে যারা ভালো করতে চায় বা যাদের অভিভাবকরা সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখেন তারা সাধারণত বেসরকারি স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনে চলে যায়।

অন্যদিকে মাধ্যমিকে বেশির ভাগ স্কুলই এমপিওভুক্ত; কিন্তু সেখানকার শিক্ষকরা ততটা দক্ষ নন। এ ছাড়া দুর্বোধ্য করে রাখা হয়েছে পাঠ্য বইয়ের বিষয়বস্তু। একাধিক বিষয় ও অধ্যায় যা কখনোই কাজে লাগে না, তা দিয়ে ভারী করা হয়েছে পাঠ্য বই। এরপর আবার দুর্বোধ্য সৃজনশীলের চাপে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। এই আনন্দহীন শিক্ষায় স্কুলে শুধু পড়া দেওয়া এবং নেওয়া হয়। মোটকথা স্কুলে তেমন কোনো পড়ালেখাই হয় না। এতে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্ন মধ্যবিত্তরাও প্রাইভেট-টিউশনি, কোচিং, সহায়ক বইয়ের মাধ্যমে স্কুলের বাইরে থেকে শিক্ষা কিনে নেয়। কিন্তু স্কুলে খুব একটা টাকা খরচ না হলেও বাইরে থেকে শিক্ষা কেনার মতো টাকা থাকে না নিম্নবিত্তদের। ফলে এ অবস্থায় তারা কিছুদিন মাধ্যমিক স্তরে স্কুলে যাওয়া-আসার মধ্যে থাকে। একসময় আনন্দহীন এই শিক্ষা থেকে তারা ঝরে পড়ে।

উচ্চ মাধ্যমিকে ঝরে যাওয়ার পেছনের কারণ অনেকটা মাধ্যমিকের মতোই। তবে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েও অনেক শিক্ষার্থী পরিবারকে সহায়তার জন্য নানা কাজে যুক্ত হয়। অনেকে কারিগরি শিক্ষায় চলে যায়। আবার অনেকে দেশের বাইরে চলে যায় শ্রমিক হিসেবে। ফলে ঝরে পড়ার হার কমছে না।

বর্তমানে চলছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। ২০২০ সালের এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ২০ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৯ জন শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালে এই শিক্ষার্থীরাই পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তবে তখন পরীক্ষার্থী ছিল ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ২৬৫ জন। সেই হিসাবে ১০ লাখ ৪৬ হাজার শিক্ষার্থীর কোনো হদিস নেই। অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে সাড়ে ১০ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা