kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

বিশেষ লেখা

একুশের শ্রেণিস্বার্থের দিকটি কেমন ছিল?

আহমদ রফিক

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



একুশের শ্রেণিস্বার্থের দিকটি কেমন ছিল?

ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার দাবি নিয়ে দ্বন্দ্বে—সুস্পষ্ট ভাষায় উর্দু-বাংলার দ্বন্দ্বে। রাষ্ট্রভাষা কি শুধুই উর্দু, নাকি উর্দু ও বাংলা—এটাই ছিল মূল কথা। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার তখন আনুমানিক হিসাবে ৫৫-৫৬ শতাংশ বাঙালি। গণতান্ত্রিক বিচার-ব্যাখ্যা মতে রাষ্ট্রভাষা বাংলাই হওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকশ্রেণির নিয়ন্ত্রক শক্তিমান অংশ উর্দুভাষী। তাই তাদের সিদ্ধান্ত একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে। রাজধানীটাও পশ্চিমাঞ্চলেই হবে।

ঠিকই পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী করাচি—ভারত ভাগ ও পাকিস্তানের স্থপতি জিন্নাহর প্রিয় শহর করাচি—কার ঘাড়ে কটা মাথা যে আপত্তি করবে? পাঞ্জাবিরাও চুপ করে গেল। এরপর তো রাওয়ালপিন্ডি হয়ে রাজধানী ইসলামাবাদে—মারি পাহাড়ের পাদদেশে বিরানভূমিতে সৌদি অর্থ সহায়তায় জমজমাট নতুন শহরে রাজধানী। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের কথা কেউ ভাবেনি—এমনকি ঢাকাবাসী কোনো রাজনৈতিক শের-এর কণ্ঠে রাজধানীর দাবি উচ্চারিত হয়নি।

বহুকাল পর দ্বিতীয় রাজধানীর কথা ওঠায় ব্রিটিশ আমলের বিখ্যাত মণিপুরি ফার্ম (উদ্ভিদ উদ্যান) কেটে সাফ করে আশপাশের জায়গা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক ভবন তৈরি করে ঢাকার মধ্যেই দ্বিতীয় রাজধানীর পত্তন—পরিহাস আর কাকে বলে। এই নির্মম কৌতুক নিয়েও কোনো প্রতিবাদ হয়নি। লৌহমানব প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস কেউ দেখায়নি। অর্থাৎ বিষয়টিকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। অথচ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণই ছিল—কেন্দ্রীয় রাজধানী বলে কথা।

এই রাজধানী ঘিরে আবর্তিত হয় দেশের মূল রাজনীতি, এর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কূটনীতি, চাণক্যবৃত্তি, প্রধান ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশ পরিচালক শ্রেণির সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির কেন্দ্র। এক কথায় দেশের তথা রাষ্ট্রের সমগ্র কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল এর রাজধানী—যা এর প্রাণকেন্দ্র বলা চলে। যেমন অভ্যন্তরীণ, তেমনি বৈদেশিক। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রস্থল নিয়ে পূর্ববঙ্গের রাজনীতিকদের কেউ টুঁ শব্দ করেননি, দাবি তোলা দূরে থাক।

১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের ফল—পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে বাঙালি মুসলমানের ভোটের জোরে জিন্নাহর হাত শক্তিশালী হয়েছিল ভারত বিভাগ (‘পার্টিশন’) ও ধর্মীয় ভিত্তিতে স্বতন্ত্র ভূখণ্ড পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজনৈতিক ‘বাহাস’ ও জোরালো দাবি উপস্থাপন করতে। সেই জোরেই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা।

যে পাকিস্তান কোনো কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বিচারে এক ‘উদ্ভট রাষ্ট্র’। প্রধান কারণ এর ভূখণ্ডগত সংহতির অভাব—ভারতের পশ্চিমে এক খণ্ড, হাজার মাইল দূরে আরেক ভূখণ্ড নিয়ে একটি রাষ্ট্র—মধ্যিখানে বিরূপ চেতনার বিশাল অন্য একটি ভূখণ্ড তথা রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় এটা উদ্ভট। তদুপরি জাতিসত্তা, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পাকিস্তানের দুই খণ্ডে প্রচণ্ড অমিল, সর্বোপরি মানসিকতায়।

তবু দক্ষ আইনজীবী জিন্নাহর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জেদ ও প্রতিশোধস্পৃহা এবং আকাঙ্ক্ষা মেটাতে উদ্ভট রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা। স্বভাবতই রাষ্ট্রনীতির যুক্তি ও ন্যায্যতা এই রাজনৈতিক খামখেয়ালিপনার মাসুল গুনেছে মাত্র আড়াই দশকের মধ্যে—রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য সময়টা বিন্দুবৎ। জিন্নাহর সৌভাগ্য পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি তাঁকে দেখতে হয়নি।

আমার ধারণা, এত বৈপরীত্য সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় চেতনার অন্তর্নিহিত স্বাতন্ত্র্যবো ধের কারণে অখণ্ড পাকিস্তান হয়তো টিকে যেত যদি পাকিস্তানি রাজনীতি মানানসই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও সহিষ্ণুতার স্থায়ী পরিচয় দিতে পারত, এতটা বাঙালি বিরূপতার প্রকাশ না ঘটাত, যুক্তিহীন প্রভুত্ব, কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বাঙালির কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য সৃষ্টি না করত; সর্বশেষ ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ফল মেনে নিত। কিন্তু এটুকু গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা তাদের ছিল না। অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস ও সমরশক্তিতে আস্থা তাদের জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ছিল পাকিস্তান ভাঙার কারণ ও প্রেক্ষাপট।

দুই.

কিন্তু এসব কারণের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ তো শুরু হয়ে যায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পূর্বে ও পরে—মাত্র মাস কয়েকের ব্যবধানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু নিয়ে পাকিস্তানি রাজনৈতিক শক্তির ক্রমাগত দাবির মুখে। বাঙালি তরুণ ও যুবশক্তি রাজধানী নিয়ে কথা না বললেও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে মাতৃভাষার অধিকার ছাড়তে প্রস্তুত ছিল না। এ দাবির উৎস স্বতঃস্ফূর্ত; প্রেরণা সহজাত, যদিও এর তাৎপর্য সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক।

কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও বাঙালি রাজনীতিকদের তৎকালীন ক্ষমতাবান অংশ ভাষাপ্রেম, জাতিপ্রেম ও রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দেয়নি; যদিও তাদের শ্রেণিস্বার্থের দিকটি রাষ্ট্রভাষা বাংলার সঙ্গে যথেষ্ট জড়িত ছিল। কিন্তু তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের টানে, দলগতভাবে হীনম্মন্যতার প্রভাবে উর্দুভাষী নেতৃত্বের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ও বাঙালিস্বার্থের বিরোধিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি। এমনকি হাবীবুল্লাহ বাহারের মতো বাংলা সাহিত্যপ্রেমীও নন।

ব্যতিক্রম ছিল ছাত্র-যুবাদের গরিষ্ঠ অংশ। তাদের মধ্যে সর্বাধিক সক্রিয় ছিল প্রগতিবাদী ছাত্র-যুবারা। এমনকি ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রবক্তা তমদ্দুন মজলিস বাংলাভাষী জনগণের কাছে পৌঁছানোর তাগিদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এই দাবিতে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই সোচ্চার হয়; কিন্তু আপসবাদী দোটানায় ক্রমেই পিছিয়ে যেতে থাকে। তাই একুশের আন্দোলনের নেতৃত্বে তাঁদের ভূমিকা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে প্রগতিবাদী ছাত্র-যুবাদের প্রাধান্য।

তিন.

এর প্রমাণ মেলে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তথা একুশের আন্দোলনে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্লোগানগুলোর চরিত্র বিচারে এবং আন্দোলন কর্মকাণ্ডের বিচার-বিশ্লেষণে। একটি তথ্য সবার জানা যে তখনকার রাজবন্দিদের বেশির ভাগ ছিল বামপন্থী রাজনীতির নেতাকর্মী, এমনকি কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের নেতাকর্মী। একুশের দ্বিতীয় লাগাতার স্লোগানটি ছিল ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’। এর তাৎপর্য ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।

এখানে শুধু গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিই প্রকাশ পায়নি, সর্বজনীন রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টিও ছিল স্পষ্ট। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগানটি ছিল ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’—যা শ্রেণি-নির্বিশেষে সব ধরনের বাঙালির শিক্ষা এবং আর্থ-সামাজিক স্বার্থের দাবিটি ছিল প্রকট। মাতৃভাষার সর্বস্তরে ব্যবহার, বিশেষ শিক্ষার সর্বস্তরে ব্যবহারের বিষয়টি ছিল এক কথায় নিম্নবর্গীয় মানুষের স্বার্থের অনুকূল।

চার.

ভাষা আন্দোলনের উৎস, কারণ ও মূল দাবি ছিল পাকিস্তানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠা। তাই প্রথম স্লোগানটি বরাবর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। সে ক্ষেত্রে কি দরকার ছিল বাকি স্লোগানগুলোর। এবং তা তাত্ক্ষণিক নয়। উল্লিখিত তিনটির সঙ্গে আরো দু-একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান তথা দাবি বা আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে, প্রকাশ পেয়েছে মিছিলে মিছিলে—যেমন ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’, ‘আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না’ ইত্যাদি।

এগুলো মেধাবী, মননশীল ছাত্র-যুবা নেতৃত্বের রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচায়ক। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমটির সর্বজনীন চরিত্র বাদে বাকি বেশির ভাগেই প্রগতিবাদী চেতনার প্রকাশ। তাতে স্লোগান নির্ধারকরা এমনকি স্লোগানদাতারা তখন, সেই সময় পর্বে, তাদের তারুণ্যে-যৌবনে শ্রেণিস্বার্থকে অতিক্রম করেছে। জানি না, সবার ক্ষেত্রে কতটা সচেতনভাবে অর্থাৎ রাজনৈতিক সচেতনতায় এসব স্লোগান উচ্চারণ। কিন্তু তাতে তাদের রাজনৈতিক অগ্রচারী ভূমিকার প্রকাশ ঘটেছে, সন্দেহ নেই।

তাই একুশের ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র বিচারে এই সত্যটি প্রমাণিত হয় যে নিঃসন্দেহে ভাষা আন্দোলনের পরিচালক শক্তি ছাত্র-যুব সমাজ অসচেতনভাবেই হয়তো তাদের শ্রেণিগত ও জাতিগত রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণে ত্যাগ ও আত্মদানের পথে অগ্রসর হয়েছিল। সে মুহূর্তে, ক্রান্তিক্ষণে তারা ব্যক্তিগতভাবে নিঃস্বার্থ, সমষ্টিগতভাবে নিজস্ব শ্রেণিস্বার্থের ঊর্ধ্বে এবং সম্পূর্ণ জাতীয় স্বার্থের পক্ষে।

তারুণ্য ও যৌবন এমন একটি সময়পর্ব, যখন জীবনে ব্যক্তিস্বার্থ সাধারণত প্রাধান্য পায় না। আদর্শের আকর্ষণ বা বিশেষ রাজনৈতিক চেতনার টানে ব্যক্তিস্বার্থ তো বটেই, আত্মদানেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংশয় কাজ করে না, অনায়াসে দাবি আদায়ের সংগ্রামে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া যায়। ভাষা আন্দোলন, বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ছিল চরিত্র বিচারে তেমন একটি সংগ্রামী অধ্যায়, যদিও স্বল্পকালীন।

এ আন্দোলন চরিত্রে বহুমাত্রিক বলেই এতে সব শ্রেণির মানুষের যোগদান—সাধারণ মানুষ থেকে শ্রমজীবী মানুষ ছাত্র-যুবাদের মিছিলে সহযোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছে। গ্রামাঞ্চলে নবম-দশম শ্রেণির স্কুলছাত্রের নেতৃত্বে মিছিলে হেঁটেছে, স্লোগানে স্লোগানে জনপদ মুখর করে তুলেছে, সাময়িক হাটবাজার বন্ধ রাখার আর্থিক ক্ষতিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি।

একুশের এই শ্রেণিচরিত্রটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হলেও স্বল্পমাত্রায় আলোচিত। তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য যে এই তরুণ যোদ্ধারাই ভবিষ্যৎ জীবনে তাদের শ্রেণিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। ব্যক্তিজীবনকে সমৃদ্ধ করতে গিয়ে পূর্বচিন্তা বা মতাদর্শ জলাঞ্জলি দিয়েছে, কেউ উগ্র বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ। ব্যতিক্রম সামান্য। তাই বলে ইতিহাস তো মিথ্যা হয়ে যায় না। সে তার নির্দিষ্ট সময়পর্বের তথ্য, তত্ত্ব ও ঘটনা ঠিকই ধরে রাখে। একুশেও তার সত্য ধরে রেখেছে, পরবর্তীকালের রাজনৈতিক পরিবর্তন তাকে ত্যাগ করলেও। এটাই ইতিহাসের ট্র্যাজেডি।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা