kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

বাংলা তলানিতে সাইনবোর্ডে

► আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষিত ► যেখানে অভিযান সেখানে ইতিবাচক ফল

আজিজুল পারভেজ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলা তলানিতে সাইনবোর্ডে

মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন যে শহরের তরুণরা সেই শহরের রাস্তাঘাট, বিপণিবিতানগুলোর সাইনবোর্ড বা পরিচয়ফলক ও নামফলক থেকে বাংলা উধাও হতে চলেছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকার পরও পরিস্থিতির কোনো উত্তরণ লক্ষ করা যাচ্ছে না। রাজধানীর তিনটি প্রধান সড়ক এবং প্রধান তিনটি মার্কেটের ৫৯০টি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ফলক পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে ইংরেজি ভাষার স্পষ্ট আধিপত্য। সেগুলোতে বাংলার অবস্থান তলানিতে। পরিচয়ফলকগুলোর মধ্যে ৪৬.৭৭ শতাংশ ইংরেজিতে, ৩১.১৮ শতাংশ বাংলা-ইংরেজি মিশেলে এবং মাত্র ২২.০৩ শতাংশ বাংলায় লেখা।

রাজধানীর গুলশান ২ নম্বর গোলচত্বর, ধানমণ্ডির সাত মসজিদ রোড, তোপখানা রোড, নিউ মার্কেট, রাইফেলস স্কয়ার ও বসুন্ধরা সিটিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ফলক পর্যবেক্ষণ করা হয় গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি। একই জায়গায় কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও। এই সময়ের মধ্যে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের নামফলক, সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক করে নির্দেশনা জারি করেছেন হাইকোর্ট। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় আদালতের ওই নির্দেশনা কার্যকর করার জন্য স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিলেও তা কাজে আসেনি তেমন। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যেসব স্থানে বিদেশি ভাষায় লেখা সাইনবোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে সেসব স্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সে ক্ষেত্রেও সাইনবোর্ড বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষায় লেখার প্রবণতা বেড়েছে। তবে দুই ভাষার পরিচয়ফলকের ক্ষেত্রে ইংরেজিরই আধিপত্য থাকছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলার অবস্থান নামমাত্র।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯৯ শতাংশ সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা হতো। এমনকি বাংলায় নামকরণেরও প্রবণতা ছিল। তখন ইংরেজি নামও বাংলায় লেখা হতো। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, কেবল মাতৃভাষায় নামফলক দেখে বিদেশিরা, বিশেষ করে ভারতীয়রাও অভিভূত হতো। তিনি বলেন, ‘আমরা যত পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকেছি, ততই স্বকীয়তা হারিয়েছি। কারণ পুঁজিবাদের কাছে মাতৃভাষা বাংলার কোনো আলাদা মর্যাদা নেই।’

ধানমণ্ডির জিগাতলা মোড় থেকে শংকর পর্যন্ত প্রধান সড়কের পাশে থাকা ২০৬টি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের মধ্যে ৫৯.২২ শতাংশ ইংরেজি, ২১.৩৫ শতাংশ বাংলা-ইংরেজি এবং ১৯.৪১ শতাংশ বাংলায় লেখা। আগের পর্যবেক্ষণে বাংলা এবং বাংলা-ইংরেজি মিশেলে লেখা ছিল ২০ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলায় লেখা কমেছে।

গুলশান ২ নম্বর গোলচত্বরে দাঁড়িয়ে দেখা যায় ১১৬টি সাইনবোর্ড। সেখানে বেড়েছে বাংলা-ইংরেজি সাইনবোর্ড। বর্তমানে ইংরেজি ৩১.০৩ শতাংশ, বাংলা-ইংরেজি ৫৯.৪৮ শতাংশ ও বাংলা ৯.৪৮ শতাংশ। ২০১০ সালে ছিল ইংরেজি ৭৮ শতাংশ, বাংলা-ইংরেজি ১০ শতাংশ এবং বাংলা ১১ শতাংশ। এই পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) গত বছর ওই এলাকায় ‘বিদেশি সাইনবোর্ড’ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছিল।

একই কারণে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে তোপখানা রোডে। সেখানে বর্তমানে আছে ৭৩টি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড। আগের বার সেখানে বাংলা ছিল ৩৪ শতাংশ এবার সেখানে বাংলা আছে ৪১.৯ শতাংশ। ইংরেজি ছিল ৩৫ শতাংশ, এখন ২৪.৬৫ শতাংশ। বাংলা-ইংরেজি ছিল ৩১ শতাংশ, এখন ৩৪ শতাংশ।

বিপণিবিতানগুলোর মধ্যে রাইফেলস স্কয়ারে বাংলার ব্যবহার আরো তলানির দিকে। দোতলায় আছে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড। তাতে বেড়েছে ইংরেজির আধিপত্য। আগে ইংরেজি ছিল ৭৫ শতাংশ, এখন হয়েছে ৮০ শতাংশ। বাংলা ছিল ১২ শতাংশ, এখন হয়েছে ৫ শতাংশ। বাংলা-ইংরেজি ১২ শতাংশ থেকে হয়েছে ১৫ শতাংশ।

তবে বাংলার উপস্থিতি বেড়েছে বসুন্ধরা সিটিতে। লেভেল-১-এর ডি ব্লকে ৭৯টি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের মধ্যে ইংরেজি ৭২.১৫ শতাংশ। আগে ছিল ৮১ শতাংশ। বাংলা আছে ১৬.৪৫ শতাংশ। আগে ছিল ১০ শতাংশ। বাংলা-ইংরেজি আছে ১১.৩৯ শতাংশ। আগে ছিল ৯ শতাংশ।

নিউ মার্কেটে বাংলা-ইংরেজি সাইনবোর্ডের প্রাধান্য ছিল। সেখানে তা কিছুটা কমে শুধুই বাংলা কিংবা শুধুই ইংরেজি নামফলক বেড়েছে। নিউ মার্কেটের ৩৯ থেকে ৭৫ এবং ২২৫ থেকে ২৬১ নম্বর পর্যন্ত মুখোমুখি দুই সারিতে আছে ৭৬টি সাইনবোর্ড। এর মধ্যে এখন বাংলা ৪৪.৭৩ শতাংশ, বাংলা-ইংরেজি ৪০.৭৮ শতাংশ ও ইংরেজি ১৪.৪৭ শতাংশ। আগেরবার ছিল বাংলা ২৬ শতাংশ, বাংলা-ইংরেজি ৬৪ শতাংশ ও ইংরেজি ১০ শতাংশ।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হচ্ছে না। নামফলকে বাংলা উধাও হচ্ছে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সর্বোচ্চ আদালতেও বাংলার প্রচলন হয়নি। উদাসীনতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকার কারণেই এমনটি হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য গোটা ব্যবস্থারই পরিবর্তন দরকার। মানসিক ও সামাজিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার।

২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক আদেশে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেট, সরকারি দপ্তরের নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন সরকারকে। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এ ছাড়া বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ৩ ধারায়ও সব কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

আদালতের ওই আদেশের তিন মাস পর ২০১৪ সালের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে। কিন্তু তা না হওয়ায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট আদালত কড়া ভাষায় বলেন, বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। পরে ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক চিঠির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইংরেজির স্থলে বাংলায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে দেখা যায় না। এটা বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, হাইকোর্টের রুল ও আদেশের পরিপন্থী।

এরপর সরকার একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে বলা হয়, যেসব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি এখনো বাংলায় লেখা হয়নি, তা নিজ উদ্যোগে অপসারণ করে আগামী সাত দিনের মধ্যে বাংলায় লিখে প্রতিস্থাপন করতে হবে। না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা