kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

গাজীপুরে স্বামীকে না পেয়ে স্ত্রীকে হেফাজতে আনার পর মৃত্যু

পুলিশের বিরুদ্ধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গাজীপুরে স্বামীকে না পেয়ে স্ত্রীকে হেফাজতে আনার পর মৃত্যু

প্রতীকী ছবি

গাজীপুর মহানগর ডিবি পুলিশ হেফাজতে মঙ্গলবার রাতে এক নারীর মৃত্যুর হয়েছে। স্বামীকে না পেয়ে সন্ধ্যায় তাঁকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। স্বজনদের অভিযোগ, তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি ‘মাদকসহ আটকের পর অসুস্থ হয়ে’ ওই নারী মারা গেছেন। নিহত ইয়াসমিন বেগম (৪০) গাজীপুর নগরের ভাওয়াল গাজীপুর এলাকার আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

ইয়াসমিন বেগমের ছেলে আরাফাত রহমান জিসান (১৭) বলে, ‘আমার বাবা আব্দুল হাই মাদক সেবন করেন। এ কারণে বাবার সাথে মায়ের সম্পর্ক ভালো ছিল না। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ডিবি পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) নুরে আলমের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সদস্য আমাদের বাড়িতে আসেন। তাঁরা বাবাকে না পেয়ে কলাপসিবল গেট ভেঙে ঘরে প্রবেশ করেন। ডিবির সদস্যরা মাকে মারধর করে থানায় যেতে বলেন। তাঁরা মাকে জোর করে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে ওঠানোর সময় আমার ছয় বছরের ছোট বোন কান্নাকাটি শুরু করে। এ সময় ওই এএসআই বোনকে লাথি মেরে ফেলে দেন। এতে সে কপালে আঘাত পায়।’ জিসান জানায়, রাত ৯টায় মায়ের মোবাইলে ফোন দিলে ডিবির সদস্যরা তাকে মহানগর ডিবি অফিসে যেতে বলেন। এ সময় তিনি ফোনে মাকে মারধর করার এবং মায়ের কান্নার শব্দ পান।

জিসান আরো জানায়, কিছুক্ষণ পর পুলিশ সদস্যরা আবার ফোন করে ডিবি অফিসে না গিয়ে তাকে হাসপাতালে যেতে বলেন। হাসপাতালে গেলে পুলিশ সদস্যরা তাকে মায়ের কাছে যেতে বাধা দেন। একপর্যায়ে রাত ১টায় পুলিশ সদস্যরা জানান, তার মা মারা গেছেন। জিসান আরো বলে, ‘আমার মায়ের হৃদরোগ থাকলেও সুস্থ ছিলেন। পুলিশ সদস্যরা আমার মাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছেন।’

নিহত ইয়াসমিনের ছোট বোন ফারজানা বেগম (৩৮) বলেন, খবর পেয়ে বুধবার ভোর ৫টার দিকে তিনি মর্গে যান। তিনি বোনের গলা ও বুকে আঘাতের কালচে দাগ দেখেন। ওই সময় তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। এ সময় তিনি মর্গের সামনে থাকা সদর থানার এসআই জিন্নতের কাছে ইয়াসমিনের গলা ও বুকে রক্ত জমাটের কারণ জানতে চান। তিনি এর উত্তর দিতে পারেননি। এর পর থেকে তাঁদের স্বজনদের কাউকে পুলিশ সদস্যরা বোনের লাশ দেখতে দেননি। ‘অসুস্থ হয়ে মারা গেলে কেন লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি’—সাংবাদিকদের কাছে এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। ফারজানা আরো বলেন, হত্যা ঘটনা ধামাচাপা দিতে পুলিশ সদস্যরা তড়িঘড়ি করে তাঁর বোনের নামে মাদক মামলা করেছেন। মামলা রেকর্ড হয়েছে রাত ১০টা ৫ মিনিটে। আর রেকর্ড অনুযায়ী বোনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল রাত ১০টা ১০ মিনিটে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মনজুর রহমান ইয়াসমিনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিহতের বাড়িতে মাদক বেচাকেনা হচ্ছে—এমন খবরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে মাদক মামলার আসামি ইয়াসমিনকে গ্রেপ্তার এবং তাঁর হেফাজত থেকে ১০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। তাঁর মাদক ব্যবসায়ী স্বামী পালিয়ে যান। গ্রেপ্তারের পর ইয়াসমিনকে গোয়েন্দা অফিসে নিলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত ১০টার দিকে তাঁকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। পরে তাঁকে ঢাকায় পাঠানোর প্রস্তুতিকালে মারা যান। ইয়াসমিন ও তাঁর স্বামী আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে মাদক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১০টা ১০ মিনিটে ইয়াসমিনকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় তাঁর বুকে ব্যথা ও প্রচণ্ড শ্বাস ছিল। পরে তাঁর ইসিজিও করা হয়। লক্ষণ থেকে প্রাথমিকভাবে বুঝা গেছে তিনি স্ট্রোক করেছেন। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে রাত ১১টা ২০ মিনিটে তিনি মারা যান। হার্ট অ্যাটাকে তিনি মারা গেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে। নিহতের শরীরে বাহ্যিকভাবে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ঘটনা তদন্তের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আজাদ মিয়াকে প্রধান করে বুধবার বিকেলে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যরা হলেন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আব্দুল হানিফ মিয়া ও সহকারী পুলিশ কমিশনার আহসান হাবিব। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা