kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৯ চৈত্র ১৪২৬। ২ এপ্রিল ২০২০। ৭ শাবান ১৪৪১

ঢাকায় ‘আকাল’ গণপরিবহনের

পার্থ সারথি দাস   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকায় ‘আকাল’ গণপরিবহনের

গোটা ঢাকা শহরই যেন বাস দাঁড়ানোর জায়গা। শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই। তার ওপর অপ্রতুল গণপরিবহনে জায়গা করে নিতে একরকম যুদ্ধে নামতে হয়। গতকাল বনানী মোড় থেকে তোলা। ছবি : লুৎফর রহমান

বাসা থেকে অলিগলি ধরে নানা বয়সী লোকজন জড়ো হচ্ছিল মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা বাস স্টপেজে। তবে সেসব স্থানে তাদের সামনে দিয়েই ছুটে চলছিল দরজা বন্ধ করা বাস-মিনিবাসগুলো। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছতে দেরি হওয়ার আশঙ্কায় তাদের উদ্বেগও বাড়ছিল।

তালতলা থেকে যেতে যেতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সড়কে দেখা গেল যাত্রীদের বিরাট জটলা। চলন্ত বাস থামিয়ে কোনো রকমে পাদানিতে পা রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিল অনেকে। মিরপুর-১২ নম্বর থেকে ছেড়ে আসা বিআরটিসির বাসে ঝুলে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন শহীদুল ইসলাম। ভিড়ের মধ্যে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে বললেন, ২৫-৩০ টাকায় যেখানে যাওয়া যায় সেখানে বাস না পেয়ে এখন অন্য উপায়ে যেতে হবে। মতিঝিল যাওয়ার জন্য অন্য উপায় হিসেবে উবার, পাঠাওয়ের গাড়ি ডেকেও সাড়া পেলেন না। পৌনে এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর ৪০০ টাকা চুক্তিতে অটোরিকশায় চেপে বসলেন।

রাজধানীতে প্রতি কর্মদিবসে কর্মজীবী ছাড়াও বিভিন্ন কাজে গণপরিবহন পেতে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয় শিক্ষার্থী, রোগী, নিয়োগ পরীক্ষার প্রার্থীসহ নানা স্তরের মানুষকে।

মহাখালী মোড়ে সকাল সাড়ে ৯টায় বাস, লেগুনা কিছুই না পেয়ে হেঁটে চলছিলেন এনজিওকর্মী রাহেলা বেগম। গুলশান-১ নম্বর গোলচত্বরে যাওয়ার কোনো বাহন না পেয়ে এভাবে অনেককে হাঁটতে দেখা গেল।

মেট্রো রেলের মতো দ্রুতগামী গণপরিবহন ব্যবস্থা ও কম্পানিভিত্তিক বাস পদ্ধতি চালু না হওয়ায় প্রায় দেড় কোটি মানুষের ঢাকায় সড়কগুলো ছোট গাড়ির দখলে রয়েছে। অবস্থা এমন যে যাত্রীদের এ দুর্ভোগ কমাতে গণপরিবহন না বাড়িয়ে উল্টো ছোট পরিবহন যেমন মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ির বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন বাস না পেলে সেলফোনে বাসের চেয়ে বহুগুণ ভাড়া আদায়কারী পরিবহনের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। মিরপুর-১১ নম্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিয়মিত চলাচলকারী মো. নুর বলেন, বাসে যেখানে ২৫ টাকা ভাড়া দিলেই হয় সেখানে তা না পেয়ে মোবাইল ফোনে যানবাহন ডেকে ৪০০ টাকাও দিতে হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকায় গত জানুয়ারি পর্যন্ত নিবন্ধিত ২০ ধরনের যানবাহন আছে ১৫ লাখ ৪১ হাজার ৭৮৫টি। এসবের মধ্যে নিবন্ধিত বাস ৩৬ হাজার ৪৪৪টি। পরিবহন মালিক সমিতিগুলোর হিসাবে, বাস্তবে রাস্তায় চলাচল করছে প্রায় ছয় হাজার বাস ও মিনিবাস, যা মোট নিবন্ধিত যানবাহনের প্রায় ০.৩৮ শতাংশ। তবে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল মোট নিবন্ধিত যানবাহনের ৪৭ শতাংশ, ব্যক্তিগত গাড়ি ১৯ শতাংশ, অটোরিকশা ০.৯৭ শতাংশ, হিউম্যান হলার ০.৩৪ শতাংশ। ট্যাক্সিক্যাব নিবন্ধন আছে ৩৬ হাজার ৪৪৪টির।

মালিক ও চালকরা জানান, রাস্তায় চলছে মাত্র দেড় হাজার ট্যাক্সিক্যাব। আর্মি ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট ও তমা কন্সট্রাকশন কম্পানি ২০১৪ সালের ২২ এপ্রিল নতুন কিছু ট্যাক্সিক্যাব নামায়। এগুলোর ভাড়া সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে। এগুলোর দেখাও মেলে কম। মোট নিবন্ধিত গাড়ির মধ্যে ঢাকায় এ ধরনের বাহন আছে প্রায় ২ শতাংশ।

ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় কম্পানিভিত্তিক বাস পদ্ধতি চালু করার সুপারিশ ১৬ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এ পদ্ধতি চালু হলে বিশৃঙ্খলা কমে যানজট কমত। বাস-মিনিবাসের মতো গণপরিবহনও বাড়ত। বেসরকারিভাবে ছোট যানবাহন বাড়লেও বিআরটিসির উদ্যোগে বড় বাস বাড়ানোর প্রবণতাও আশাব্যঞ্জক নয়। এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান এহসানে এলাহী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার বিভিন্ন রুটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ও চক্রাকার বাস আমরা চালু করেছি।’

বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান বলেন, ‘ঢাকার বাইরের মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করতে আমরা ঢাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া সাধারণ বাস ও মিনিবাস আর নিবন্ধন করব না। বিশেষ বাস সেবা চালুর বিষয়ে আমরা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করছি।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিল্প হিসেবে পরিবহন খাতকে বিশেষ শুল্ক সুবিধা না দেওয়ায় ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থার এ হাল। বাস-মিনিবাস ছাড়াও সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা ট্যাক্সিক্যাবের মতো পরিবহন যেভাবে রাস্তায় নামছে তা দিয়ে যাত্রীদের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে না।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ঢাকায় রাস্তার বড় অংশ দখল করে ছোট গাড়ির নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক বলেন, উল্টো নীতি থেকে সরে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে সরকারকে। এখানে প্রভাবশালী পরিবহন নেতাদের কারণে শৃঙ্খলাও নেই।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি সূত্রে জানা গেছে, যানজটে ভ্রমণ সময় বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী বাস-মিনিবাস প্রধান সড়ক থেকে কমছেই। মিরপুর-মতিঝিল পথে মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজ হওয়ায় ভ্রমণ সময় দ্বিগুণের বেশি বাড়ায় ওই পথের বিভিন্ন সংস্থার বাস চালানো হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের বিভিন্ন সড়কে।

ঢাকার পরিবহন সমিতিগুলোর হিসাবে, ২১ লাখ ট্রিপের অর্ধেকও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না যানজটের কারণে। রংধনু, পূবালী, মাইলাইন, তাশিকো, শক্তি, ট্রান্সসিলভা, ব্লু-বার্ড, কপোতাক্ষ, ওয়ান লাইন, এরভিন, মধুমতি, কর্ণফুলী, গ্রেটওয়াল, পিংক সিটি, রাহবার, পাঞ্জেরীসহ বিভিন্ন সংস্থার বাস বন্ধ হয়ে গেছে যানজট পরিস্থিতির কারণে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা