kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ চৈত্র ১৪২৬। ৩১ মার্চ ২০২০। ৫ শাবান ১৪৪১

নির্দেশনা উপেক্ষিত, সুপারিশ আমলে নেয় না কেউ, অভিযান অসার

ফিটনেসবিহীন গাড়ির চাকায় পিষ্ট সব

পার্থ সারথি দাস   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফিটনেসবিহীন গাড়ির চাকায় পিষ্ট সব

ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে রাজধানীর সড়কে চলছে এমন বাস। ছবি : কালের কণ্ঠ

সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও প্রাণহানির অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি। সড়ক উপযোগী থাকলেও অনুপযোগী গাড়ির কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে মানুষের। শীত যাই যাই করার এ সময়ে কুয়াশার কারণে সড়কে দৃষ্টিসীমাও কমছে। উন্নয়নকাজের জন্য ওড়া ধুলাবালি এবং সেই সঙ্গে কালো ধোঁয়ায় দীর্ঘতর হচ্ছে কুয়াশা। এ অবস্থায় সড়কে ফিটনেসবিহীন বা অনুপযোগী গাড়ি আরো বেশি দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, বিশৃঙ্খলায় যাতায়াতের সময় বাড়ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, দেশে কমপক্ষে তিন লাখ গাড়ির ফিটনেস নেই। এ হিসাবের বাইরে গ্রামীণ সড়ক ও সংযোগ সড়কে চলাচলকারী অননুমোদিত ইজি বাইকসহ তিন চাকার বিভিন্ন ধরনের গাড়ি এবং অন্যান্য যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়িও অনুপযোগী। ঢাকা মহানগরী থেকে ২০ বছরের পুরনো বাস ও ট্রাক উচ্ছেদের জন্য দেড়

দশক ধরে ‘জোরালো’ ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব যানবাহন পুলিশ ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই চলাচল করছে। ২০১৮ সালের আগস্টে বিআরটিএ তথ্য দিয়েছিল, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেল ছাড়া বিভিন্ন ধরনের পাঁচ লাখ গাড়ি চলাচলের উপযোগী নয়। প্রসঙ্গত, মোটরসাইকেলের ফিটনেস সনদ নিতে হয় না।

মানুষের প্রাণ ছিনিয়ে নেওয়ার এ রকম আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে গতকাল রবিবার হাইকোর্ট সড়ক-মহাসড়কে চলাচলের অনুপযোগী, ফিটনেসবিহীন ও অনিবন্ধিত যান চলাচল বন্ধ  ও তদারকি করতে দেশের সব জেলায় টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোয় অন্যান্য কারণের মধ্যে জড়িত ছিল ৬৬ হাজার ৬৬১টি অনুপযোগী গাড়ি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুসারে, বিদায়ী ২০১৯ সালে পাঁচ হাজার ৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৮৫৫ জন নিহত ও ১৩ হাজার ৩৩০ জন আহত হয়েছে। দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে সাত হাজার ৩৫৬টির  পরিচয় মিলেছে। এর মধ্যে ১৫ শতাংশই ছিল অনুমোদনবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি বাইক, নছিমন-করিমন-মহেন্দ্র-ট্রাক্টর ও লেগুনা। এ সংগঠন বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ১২টি কারণের অন্যতম ফিটনেসবিহীন যানবাহন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীর বছিলা, পোস্তগোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনবিহীন যানবাহন চলছে। অনুমোদনবিহীন গাড়ির ফিটনেসও থাকে না। এর বাইরে বাস ও ট্রাকের মতো যানবাহনের অর্ধেকের বেশির ফিটনেস নেই। সনদ থাকলেও ফিটনেস কতটুকু আছে, তা বলা মুশকিল।’

বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন. ‘ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল বন্ধে আমরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে অভিযান চালাচ্ছি। তা আরো জোরদার করব। এ ছাড়া অন্যান্য জেলায় আমরা জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় অভিযান পরিচালনার জন্য চিঠি পাঠাব।’

জানা গেছে, পুলিশ ও পরিবহন নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের চাঁদাবাজির উৎস হয়ে উঠেছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি। নিয়ম থাকলেও গাড়ি বিআরটিএ কার্যালয়ে হাজির না করে ফিটনেস সনদ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাতে গাড়ির সনদ থাকলেও তা উপযোগী কি না, সেটা প্রকৃতপক্ষে জানা কঠিন হয়ে পড়ে।

সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আনার জন্য সর্বোচ্চ সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ। ১৯৯৮ সাল থেকে এটির উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সভা হচ্ছে। সভায় বারবারই অনুপযোগী যানবাহন উচ্ছেদের সুপারিশ ও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। অনুপযোগী যানবাহন উচ্ছেদের অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত পরিবহন নেতাদের ধর্মঘটের হুমকিসহ বিভিন্ন কৌশলী চাপে সরকার অবস্থান থেকে সরে আসে।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে অনুপযোগী যানবাহন চালালে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর পরও ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল অসহনীয় মাত্রায় বেড়েছে। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য, বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, এ পরিষদের জন্মলগ্ন থেকেই সুপারিশ ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তবে পরিবহন শ্রমিক নেতাদের চাপ, আইন প্রয়োগের ধারাবাহিক শক্ত অবস্থান না থাকা এবং বিআরটিএর জনবল সংকট ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতায় লক্ষ্য অর্জন হয়নি। বিআরটিএর ঢাকার মিরপুর ছাড়া অন্যান্য কার্যালয়ে ফিটনেস পরীক্ষার যন্ত্র নেই। ফলে মোটরযান পরিদর্শকরা শুধু চোখ দিয়ে দেখেই গাড়ির উপযুক্ততা পরীক্ষা করে সনদ (ফিটনেস সনদ) দিচ্ছেন।

বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শকরা জানান, কোনো গাড়ির চলাচলের উপযোগিতা যাচাইয়ে ৩২টি বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে হয়। খালি চোখে এত কিছু পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই শুধু গাড়ির বডি, চেসিস নম্বর, ইঞ্জিনের অবস্থা, হেডলাইট ও লুকিং গ্লাস এ ধরনের ছয়-সাতটি অবস্থা দেখে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়। গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা যান্ত্রিক উপায়ে করতে ১৯৯৪ সালে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট পাঁচটি  সেমি অটোমেটিক (আধাস্বয়ংক্রিয়) ভেহিকল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) বা যানবাহন পরীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এ পর্যন্ত শুধু বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয়ে এই ধরনের কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

২০১২ সালের এপ্রিলে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা কমিটির সভায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৩ সালের জুনে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা কমিটির সভায় তিন মাসের মধ্যে ফিটনেসবিহীন গাড়ি অপসারণের ঘোষণা আসে। এভাবেই নিয়মিত ঘোষণায় ঘুরছে অনুপযোগী যানবাহন উচ্ছেদ কর্মসূচি। ২০১০ সালে রাজধানীতে ২০ বছরের অধিক পুরনো বাস-মিনিবাসের চলাচল নিষিদ্ধ করে অভিযানও চালানো হয় কিছুদিন। এরপর সব থেমে যায়। এভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে দিন দিন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা