kalerkantho

চট্টগ্রাম

বিক্ষোভ শেষে এক রাতেই তৈরি হয়

মুস্তফা নঈম, চট্টগ্রাম   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিক্ষোভ শেষে এক রাতেই তৈরি হয়

উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা—মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এ ঘোষণার পর থেকেই ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ভাষা ও সংস্কৃতি হরণ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম শহরে সীমিত পরিসরে আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার পল্টন ময়দানে পুনরায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার খাজা নাজিমুদ্দীনের ঘোষণায় সারা দেশের মতো প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম। প্রাদেশিক সরকারের বাজেট অধিবেশন শুরুর দিন সামনে রেখে ঢাকা থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রামে হরতাল সফল ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সীমান্ত পত্রিকার সম্পাদক মাহাবুব উল আলম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এ ছাড়া আলাদাভাবে একটি সাংস্কৃতিক কমিটিও করা হয়। সংগ্রাম পরিষদের কার্যালয় করা হয় ১২০ আন্দরকিল্লার আওয়ামী লীগ অফিসকে।

চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলন বিষয়ে তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রাম কলেজের তরুণ ছাত্র এ কে এম এমদাদুল ইসলাম (পরবর্তী সময়ে অ্যাডভোকেট) বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালনের জন্য প্রস্ততি চলছে। ঢাকার পত্রিকায় সব খবর ছাপতে দেওয়া হতো না। তখন ভারত থেকে সত্যযুগ ও স্টেটসম্যানস পত্রিকা আসত। এ দুটি পত্রিকার মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু জানতে পারতাম। চট্টগ্রাম শহরে চট্টগ্রাম কলেজ, কর্মাস কলেজ ছাড়াও মফস্বলের মাত্র তিনটি কলেজ—কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ, নাজিরহাট কলেজ ও সাতকানিয়া কলেজকে কেন্দ্র করে এবং পটিয়া, রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। আমরা চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মঘট, বিশেষ করে ছাত্র ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিই। আমাকে ও আমার বন্ধু আবু জাফরকে (পরবর্তী সময়ে অ্যাডভোকেট) নাজিরহাট ও ফটিকছড়ি এলাকার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়।’

২১ ফেব্রুয়ারি সারা দিন এলাকায় মিছিল-মিটিং করে রাতে শহরে এসে শুনি ঢাকায় গুলি করে অনেক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সারা শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মোজাফফর আহমদের সভাপতিত্বে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তারা হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও নুরুল আমিনের ফাঁসি দাবি করেন। সেই সভায় আগের রাতে লিখিত মাহাবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি চৌধুরী আর রশীদ (পরে প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা ও সংসদ সদস্য) পাঠ করলে উপস্থিত জনতা ক্রোধে ফেটে পড়ে। এরপর লালদীঘি পারসংলগ্ন ভিক্টোরিয়া পার্কে (বর্তমানে পেট্রল পাম্প অবস্থিত) ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার গড়ে তোলা হয়।

চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ মিনার তৈরির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন মাহাবুব উল আলম চৌধুরী তাঁর এক সাক্ষাৎকারে। তিনি জানান, সংগ্রাম কমিটির শহর ও গ্রামে নানা কাজের চাপে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জলবসন্তে আক্রান্ত হন। পরে নেতাদের মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার ওপর গুলির খবর পান। তিনি বলেন, “এটা শোনার পর আমি অসুস্থ শরীর নিয়ে রাতেই দীর্ঘ এ কবিতাটি লিখে ফেলি। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে পরদিন বিকেলে লালদীঘির মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশে জনতার ঢল নামে। সমাবেশে চৌধুরী হারুন আমার কবিতাটি পড়ে শোনান। এ কবিতা শুনে জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ‘চল চল ঢাকা চল’ স্লোগান ওঠে। পরদিন ২৩ তারিখ সারা দিন শহরজুড়ে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। খুরশীদ মহলের সামনে রাতারাতি আমাদের কর্মীরা ভিক্টেরিয়া গার্ডেনে ইট-সিমেন্ট দিয়ে একটি শহীদ মিনার তৈরি করে, যা পরে পুলিশ ভেঙে দেয়।”

এভাবেই নির্মিত হয় ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারি মানে একুশ। আমাদের জাতিসত্তার প্রথম পরিচয়। আমরা যা কিছু ঐতিহ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি একুশ তারই উন্মোচন। ‘একুশ’ এবং শহীদ মিনার এই শব্দে অন্তর্নিহিত আছে আমাদের রাজনৈতিক চেতনার সম্পৃক্ততা দীর্ঘ ঐতিহ্যের স্মারক।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা