kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সুন্দরবন দিবস আজ

প্লাস্টিকদূষণে বিপন্ন বন

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্লাস্টিকদূষণে বিপন্ন বন

সুন্দরবনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। প্রতিবছরই এই বনের অপার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে পর্যটন ব্যবসার পরিধিও বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে দূষণ। বিশেষ করে প্লাস্টিকদূষণের মাত্রা খুব বেশি। এ বিষয়ে যথাযথভাবে এখনই নজর দেওয়া না হলে এই বাদাবনে প্লাস্টিকদূষণের কারণে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশঙ্কা করছে।

সুন্দরবন হলো প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন, যাকে বাদাবনও বলা হয়। এটি বিশ্বের মধ্যে একক বৃহত্তম বাদাবন। এর পরিধি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে বনের বৃহৎ ও ঘন অংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। ভারতের অংশে বনের ৪০ শতাংশ এলাকা পড়েছে। তাদের অংশটি জাতীয় পার্ক হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের তিনটি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বনভূমিকে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বা বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে। এগুলো হচ্ছে কটকা-কচিখালী পূর্ব অভয়ারণ্য, নীলকমল দক্ষিণ অভয়ারণ্য ও পশ্চিম অভয়ারণ্য। এর পর থেকে এই বাদাবনে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

বিশাল এই বনভূমির সৌন্দর্য উপভোগ করা ও প্রকৃতির কাছাকাছি আসার জন্য মোংলার কাছেই সুন্দরবনের করমজল ও হাড়বাড়িয়া, সুন্দরবনের দক্ষিণে সাগরঘেঁষা এলাকায় কটকা, জামতলা, টাইগার পয়েন্ট, বাদামতলা সমুদ্রসৈকত, কচিখালী, দুবলা শুঁটকিপল্লী, হিরণ পয়েন্ট, নীলকমল এবং পশ্চিম অংশের দোবেকী, কলাগাছিয়া, মান্দারবাড়িয়ায় পর্যটকদের নেমে দেখার সুবিধা রয়েছে। এসব জায়গায় পর্যটকদের জন্য বনের মধ্যেই হাঁটার পথ (উডেন ট্রেইল), বন্য জীবজন্তু বিশেষ করে হরিণ, বানর ও কুমির সংরক্ষণস্থল, ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। পর্যটকরা এসব জায়গায় ঘুরতে পারে, সময় কাটাতে পারে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আরো চারটি এলাকায় দর্শনার্থীদের জন্য নামা ও সময় কাটানোর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে। বেশ কিছুদিন ধরে প্রস্তাবিত এই প্রকল্প সম্প্রতি অনুমোদিত হয়েছে। এ জন্য বন বিভাগের ব্যয় হবে ২৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর আওতায় পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের আলীবান্দা ও চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক এবং পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কালাবগী এলাকায় দর্শনার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে। এগুলোতে হরিণ, কুমিরসহ বন্য প্রাণীর মুক্ত বিচরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি ওয়াচ টাওয়ার এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

শীত মৌসুমে বিপুলসংখ্যক দেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণে যায়। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ দিনের প্যাকেজ ট্যুরে ছোট-বড়, সাধারণ ও অত্যাধুনিক লঞ্চযোগে এসব ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। সময় ও সুযোগ-সুবিধার ওপর ভ্রমণব্যয় নির্ভর করে। সুন্দরবন এলাকায় যেহেতু রাতে অবস্থানের জন্য রেস্টহাউসের সুবিধা একেবারেই কম, সে কারণে লঞ্চেই ভ্রমণকারীরা অবস্থান করে। আর দিনের বেলায় তাদের নির্ধারিত স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখানো হয়। পর্যটকরা তাদের খাবারের জন্য নানা ধরণের কাগজ, প্যাকেট, পানির বোতল ব্যবহার করে এবং তা যথারীতি বনে ও নদী-খালে ছুড়ে ফেলে। বিশেষত প্লাস্টিকের প্যাকেট ও পানির বোতলের মতো অপচনশীল দ্রব্য নদী-খালের পলিমাটিতে আটকে গিয়ে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও তৃণরাজির শ্বসনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

জানতে চাইলে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনস অব সুন্দরবনস (টোয়াফ)-এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আযম ডেভিড কালের কণ্ঠকে বলেন, সুন্দরবনে প্রতিবছর পর্যটক বাড়ছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে সুন্দরবন দেখতে দেশি-বিদেশি এক লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি পর্যটক আসে। পরের বছর ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে এ সংখ্যা দুই লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২০১৮-২০১৯-এ এ সংখ্যা আড়াই লাখে উন্নীত হয়। এবার আরো বেশি পর্যটক এসেছে। তাদের সমিতিভুক্ত ট্যুর কম্পানি গত বছর ছিল ৫০টির কম। এবার সেই সংখ্যা ৭০ ছাড়িয়েছে।

পর্যটকরা বা ট্যুর কম্পানিগুলো এখনো দূষণের বিষয়ে যথাযথ সচেতন নয় স্বীকার করে নাজমুল আযম বলেন, ‘বড় আট-দশটি ট্যুর কম্পানি এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। তারা পর্যটকদের দূষণের ব্যাপারে যেমন সচেতন করে, তেমনি আবর্জনা সংরক্ষণের নিজস্ব ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু অন্যদের নেই।’ এ বিষয়ে তিনি বন বিভাগকে আরো সতর্কতা ও কড়াকড়ি অবস্থান গ্রহণের দাবি জানান। 

অবশ্য উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) নামের একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাদের একটি দল গত বছর শুধু কটকা থেকে আট বস্তা (আড়াই মণ ধারণক্ষম) প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেছিল। স্বাভাবিকভাবে এই বর্জ্যের পরিমাণ আরো বাড়ছে। বন বিভাগের ড্রাম দেওয়া আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেগুলো অল্প সময়ে পূর্ণ হয়ে যায়। তা অপসারণের কোনো ব্যবস্থা নেই।’ তাঁর মতে, পর্যটক নিয়ন্ত্রণ ও দূষণ রোধে বন বিভাগের সুনির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি থাকতে হবে। অন্যথায় সুন্দরবনে প্লাস্টিকদূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বশিরুল-আল-মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুন্দরবন ভ্রমণে নীতিমালা তৈরি হয়েছে। সুন্দরবনের প্রতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে।’ দূষণ রোধে তাঁরা যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে দাবি করেন।

সুন্দরবন হলো জীববৈচিত্র্যের আধার। এটি দেশের মোট বনাঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনের এক হাজার ৮৭৪.১ বর্গকিলোমিটার জলভাগের নদ-নদী-খালে রয়েছে ২১০ প্রজাতির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা ও এক প্রজাতির লবস্টার।

সুন্দরবনে সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড রয়েছে। সুন্দরবনে ৩৭৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল ও মায়া হরিণ, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতীসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন, নোনা পানির কুমির, কচ্ছপ, রাজগোখরাসহ (কিং-কোবরা) বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। আরো আছে ৩১৫ প্রজাতির পাখি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা