kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

পাচারের নৌকা ডুবে মৃত্যু ১৫ রোহিঙ্গার, নিখোঁজ ৫০

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পাচারের নৌকা ডুবে মৃত্যু ১৫ রোহিঙ্গার, নিখোঁজ ৫০

বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধ থাকার পর নতুন করে শুরু হওয়া মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের একটি নৌকা ডুবে ১৫ জনের সলিলসমাধি ঘটেছে। কাঠের তৈরি ইঞ্জিনচালিত ছোট আকারের নৌকাটিতে ১৩৮ জন যাত্রী ছিল বলে জানিয়েছে উদ্ধারপ্রাপ্ত লোকজন। যাত্রীদের প্রায় সবাই রোহিঙ্গা এবং তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। নৌকার ৭২ যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। অর্ধশত নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। জীবিত উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চার দালালও রয়েছেন, যাঁদের দুজন বাংলাদেশি। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন্সের ছেঁড়াদ্বীপের পাশে সাগরের ‘মগঘোলা’ নামক এলাকায় ঘটেছে এ মর্মান্তিক নৌকাডুবি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ উপকূলের বাহারছড়া এলাকা থেকে নৌকাটি যাত্রা করেছিল। মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাবোঝাই আরো দুটি নৌকা ওই নৌকাটির সঙ্গে প্রায় একই সময়ে রওনা দেয়। ওই দুটি নৌকার হদিস জানা যায়নি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এস এম জাহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সকালে খবর পাওয়ামাত্রই সাগরের অকুস্থলে ছুটে যাই। সাথে সাথেই নৌবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজ শুরু করে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যাওয়া নৌকাটি উদ্ধার করতে সক্ষম হই।’ তিনি জানান, নৌকার ভেতর থেকেই চার-পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজদের সন্ধানকাজ অব্যাহত রয়েছে।

কোস্ট গার্ড টেকনাফ স্টেশনের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সোহেল রানা জানান, নৌকাডুবির খবর পাওয়ামাত্র তাঁরাও যোগ দেন নৌবাহিনীর সঙ্গে। উদ্ধার অভিযানে ৭২ জন যাত্রীকে জীবিত এবং ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা লাশের মধ্যে ১২ জন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে রয়েছে ৪৮ জন নারী, ২০ জন পুরুষ ও চারটি শিশু।

উদ্ধারপ্রাপ্ত নৌকার মাঝি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়ার বাসিন্দা ফয়েজ আহমদ পাচারকারী দলের সদস্য। তিনি স্বীকার করেছেন, মাত্র ২২ অশ্বশক্তির ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করার কারণে দ্বীপের কাছাকাছি স্থানে গিয়ে বিকল হয়ে পড়েছিল। এ সময় যাত্রীরা সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে নেমে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু  তিনি তাতে রাজি না হয়ে নৌকাটি মেরামত করে আবার সাগরে রওনা দেন। একপর্যায়ে নৌকাটি ডুবে যায়।

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যত দূর জানি মাছ ধরার কাঠের নৌকাটি টেকনাফ উপকূলের বাহারছড়া ইউনিয়নের এলাকা থেকে রোহিঙ্গা বোঝাই করে মালয়েশিয়া যাচ্ছিল। মাত্র ৩০-৪০ জন যাত্রী বহনের উপযুক্ত নৌকাটিতে ১৩৮ জনকে বহন করা হচ্ছিল।’ উদ্ধারপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা যাত্রীরাও জানিয়েছে, নৌকাটি অত্যন্ত ছোট আকারের ছিল। গাদাগাদি করেই তাদের বসতে হয়েছিল। নারী-পুরুষ ও শিশুরা নৌকাটিতে সাগর পাড়ি দিচ্ছিল একজন-অন্যজনের কোলে-পিঠে বসেই।

রোহিঙ্গাদের পাচারকাজে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে উদ্ধার পাওয়াদের মধ্য থেকে চার পাচারকারী দালালকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি এবং দুজন রোহিঙ্গা। দুই বাংলাদেশি হলেন নৌকাটির মাঝি ফয়েজ আহমদ এবং তাঁর সহযোগী বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়ার হাসিম আলীর ছেলে সৈয়দ আলী। দুই রোহিঙ্গা হলেন বালুখালী ক্যাম্পের মোহাম্মদ ওসমান ও কুতুপালং ক্যাম্পের আজিম উদ্দিন।

নৌকাটির যাত্রী এবং কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা তরুণী সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিয়ে ঠিক হয় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত এক রোহিঙ্গা যুবকের সাথে। মালয়েশিয়ায় থাকা আমার হবু বর এখানকার দালালদের ৩০ হাজার টাকা দিয়ে নৌকায় করে আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে। আগের দিনই সেই দালাল ক্যাম্পে সিএনজি ট্যাক্সি পাঠিয়ে আমাকে সাগরপারের বাহারছড়ার পাহাড়ে এনে রাখে। পরে রাতের বেলায় আমাকে অন্যদের সাথে নৌকায় তুলে দেওয়া হয়।’

উদ্ধারপ্রাপ্ত যাত্রী ইয়াসির আরাফাত জানান, তিনি থাইনখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা। তিনি তাঁর দুই ভাবিসহ নৌকায় উঠেছিলেন। দুই ভাবিই সাগরে ডুবে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁরা পাচারকারী দালালদের জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। উদ্ধারপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা নারী সাফিয়া জানান, তিনি টেকনাফের লেদা শিবিরের বাসিন্দা। এক মেয়ে ও এক ননদকে নিয়ে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। মেয়ে হাফসা মনি (৮) ও ননদ সেতারা সাগরে ডুবে মারা গেছে।

নৌকার মাঝি ও পাচারকারী ফয়েজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নৌকাটির মালিক হচ্ছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়ার আবদুল আলীর পুত্র। আবদুল আলী একজন দাগি মানবপাচারকারী ও এলাকার তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি। তাঁর বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা আছে। দেড় মাস আগে দুই হাজার ইয়াবা নিয়ে আবদুল আলী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর পুত্র সাইফুলই মানবপাচারের কাজটি পরিচালনা করে আসছিলেন।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়াটিই হচ্ছে মানবপাচারের অন্যতম এলাকা। পাড়ার সহস্রাধিক বসতির বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েকটি সিন্ডিকেট রয়েছে মানবপাচারের কাজে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট হচ্ছে বর্তমানে ইয়াবার মামলায় কারাগারে থাকা আবদুল আলীর সিন্ডিকেট। আবদুল আলী (৫০) টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বেই রয়েছে প্রায় ২৫-৩০ সদস্যের সিন্ডিকেট। আবদুল আলী ২০১২ সাল থেকেই মানবপাচারে জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে টেকনাফের বাহারছড়া ফাঁড়ির পুলিশ।

বাহারছড়া কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি আজিজ উল্লাহ এবং সদস্য মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, আবদুল আলী সিন্ডিকেটের সদস্যরাই রোহিঙ্গা পাচারকারীদের সঙ্গে মিলেমিশে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের পাচার করে আসছে। আবদুল আলীর রয়েছে পাঁচটি মাছ ধরার নৌকা। এসব নৌকা দিয়েই বাহারছড়া থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের অদূরে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডগামী বড় আকারের জাহাজে তুলে দেওয়া হয়।

বাহারছড়া ফাঁড়ির পরিদর্শক লিয়াকত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোমবার রাতে স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশিং কর্মীদের দেওয়া সংবাদের ভিত্তিতে আমি ফোর্স নিয়ে নোয়াখালীপাড়া সৈকতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অল্পের জন্য রোহিঙ্গাবোঝাই সাইফুলের নৌকাটি ধরতে পারিনি।’ তিনি জানান, গতকাল সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়ে আবদুস সালাম নামের একজন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তি বিএনপি নেতা আবদুল আলী সিন্ডিকেটের সদস্য।

সাহায্যে প্রস্তুত জাতিসংঘ

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) গতকাল এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নৌকাডুবির ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, তারাসহ জাতিসংঘের সব সংস্থা ও অন্যান্য এনজিও বাংলাদেশ সরকারের পাশে থেকে উদ্ধারকৃতদের খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা বা যেকোনো সহায়তায় প্রস্তুত রয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘কক্সবাজার থেকে অনিয়মিত ও অনিরাপদ নৌযাত্রা নতুন কোনো ঘটনা নয়; রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশের জনগণ উভয়েই বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই ঝুঁকি নিয়ে থাকে। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে উভয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে আসছে। আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছি যেন পাচার রোধ করা যায় এবং এর ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায়।’

সবার বোধোদয় হওয়া উচিত

‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘মিয়ানমারে নির্যাতন এবং বাংলাদেশে দীর্ঘদিন শরণার্থীশিবিরে মানবেতর জীবনযাপনে রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের পরিবারগুলো হতাশ হয়ে পড়েছে, ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপজ্জনকভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত এই জীবন থেকে তারা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে। যেহেতু তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার কোনো জোরালো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না, তাই ভবিষ্যতের কোনো লক্ষ্য না থাকায় রোহিঙ্গা শিশুরা হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’

‘বঙ্গোপসাগরে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমাদের সবার বোধোদয় হওয়া উচিত’—এ মন্তব্য করে বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সরকার দুই বছরের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে উদারতার পরিচয় দিয়েছে। এর পরও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অস্তিত্বের জন্য রোহিঙ্গাদের মরিয়া ভাব প্রকট হয়ে উঠছে। আর তাই রোহিঙ্গা শিশুদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও স্বীকৃত শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা