kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

আকবর দ্য গ্রেট!

নোমান মোহাম্মদ   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আকবর দ্য গ্রেট!

শুধু যদি উইনিং শটটি আসত আকবর আলীর ব্যাট থেকে! শুধু যদি সেটি ছক্কা হতো!

লং অনের ওপর দিয়েই উড়ে যেতে হবে, সাদা বলের গায়ে অমন ভালোবাসার চিঠি লিখে রাখেনি কেউ। বিজয়ের অক্ষরে খামের গায়ে রূপকথার ঠিকানা লিখে মাঠের যেকোনো কোণ দিয়ে ভাসিয়ে দিলেই হতো। তাহলেই ক্রিকেটের মহাকালে ২০১১ মিশে যায় ২০২০-এ। বিশ্বজয়ের ক্যানভাসে দুই শিল্পী হয়ে ওঠেন একে অন্যের প্রতিবিম্ব। দুই উইকেটরক্ষক, দুই ব্যাটসম্যান, দুই অধিনায়ক হয়ে যান পরস্পরের দর্পণ। ভারতের মহেন্দ্র সিং ধোনির জাতিস্মর হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের আকবর আলী।

না হয় সেটি হয়নি। না হয় এটি সত্যিকারের বিশ্বকাপ ফাইনাল নয়। তাতে কী? কীর্তিতে আকবর পিছিয়ে কিসে ধোনির চেয়ে! ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের স্মৃতিই তো কাল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফিরে ফিরে এলো। ফিরিয়ে আনলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক।

২০১১ বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী সেই দ্বৈরথটির কথা মনে করুন। যৌথ আয়োজনের সে টুর্নামেন্টের ফাইনাল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ের স্টেডিয়ামে। ছয় উইকেটে ২৭৪ রান তুলে শ্রীলঙ্কা প্রবল চাপ তৈরি করে স্বাগতিকদের ওপর। দলের চেয়ে ব্যক্তি ধোনির ওপর চাপ কম নয়। ফাইনালের আগ পর্যন্ত ভারত অধিনায়কের ব্যাট হাসেনি সেভাবে। আট ম্যাচে করেন মোটে ১৫০ রান। আর পৌনে তিন শ রান তাড়ায় ১১৪ রানে তৃতীয় উইকেট পড়ার পর সবাইকে চমকে ক্রিজে নেমে যান ধোনি। নিজেকে ব্যাটিং অর্ডারে ওপরে উঠিয়ে আনেন বিশ্বকাপজুড়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা যুবরাজ সিংয়ের আগে পর্যন্ত। এরপর ৭৯ বলে অপরাজিত ৯১ রানের অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। নুয়ান কুলাসেকেরাকে লং অনের ওপর দিয়ে উড়িয়ে ছক্কায় উইনিং শট মারার পর ধোনির ব্যাট উঁচু করেই তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটি তো হয়ে গেছে আইকনিক।

তাঁর মতো বাংলাদেশের এই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের অধিনায়কও উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। টুর্নামেন্টে যে ব্যাট হাতে বাজে ফর্মে ছিলেন আকবর, তা নয়। ব্যাটিংয়ের সুযোগই তো পাননি সেভাবে! জিম্বাবুয়ে-স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচে ক্রিজে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে আউট ৫ রানে। পরের দুই ম্যাচে থাকেন অপরাজিত। কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৬ এবং সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ রানের  ইনিংসের একমাত্র বাউন্ডারিটাই ছিল ‘ম্যাচ উইনিং শট’।

ফাইনালে ক্রিজে নামার সময় এসব উইনিং শটের মতো ‘তুচ্ছ’ বিষয় নিয়ে কল্পনার সুযোগ কই আকবরের! জয় যে দৃষ্টিসীমা থেকে আবছায়ার মতো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে! ভারতকে ১৭৭ রানে আটকে রাখার পর ৬২ রানে পড়ে গেছে তৃতীয় উইকেট। এর আগেই পেশির টানে আহত অবসরে ওপেনার পারভেজ হোসেন; ফিরবেন কি না নিশ্চিত নয়। তখনই ক্রিজে যান আকবর। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখেন ৬৫ রানে চতুর্থ উইকেটের পতন। পারভেজ না ফিরতে পারলে হয়তো সেটিই পঞ্চম!

কিন্তু বাংলাদেশ অধিনায়ক ঘাবড়ান না। ইস্পাতের স্নায়ুতে এক প্রান্ত আগলে রাখেন। আগলে রাখেন অন্য প্রান্তের সতীর্থদেরও। আস্কিং রেট যেন বোঝা হয়ে না চাপে, সে জন্য অথর্ব আনকোলেকারকে ছক্কা কিংবা ভারতের সেরা বোলার লেগ স্পিনার রবি বিষ্ণুকে পর পর দুই বলে চারও মারেন আকবর। দুটো ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ফিরে যান শামীম হোসেন, অভিষেক দাস। অধিনায়ক থেকে যান যুদ্ধ ময়দান কামড়ে পড়ে থাকা সেনাপতির মতো। ইনজুরি থেকে পারভেজ ফেরার পর তাঁর সঙ্গে ৪১ রানের জুটিতে দূরের জয় নিয়ে আসেন কাছে।

সেটি আবার খানিক অনিশ্চয়তায় পারভেজের আউটে। তখনো ৮৪ বলে ২৭ রান প্রয়োজন; হাতে সাত উইকেট। ৪১ বলে ৩২ রানে অপরাজিত আকবর এরপর খোলসবন্দি। নিজের উইকেট সুরক্ষায় তৈরি করেন যে ব্যূহ, তা ভেদ করার সামর্থ্য ভারতীয় বোলারদের ছিল না। দলের জয় যখন মোটে ১৫ রান দূরে, বৃষ্টির ফোঁটায় তখন আরেক দফা রোমাঞ্চ। ওসবে থোড়াই কেয়ারে আকবর অবিচল! ঝিরিঝিরি বিরতি শেষে ৩০ বলে ৭ রানের লক্ষ্যের সামনে দাঁড়িয়েও।

এরপর কেবল একটি বল খেলেন আকবর। সতীর্থ রকিবুল হাসান মেটান বাকি ৬ রানের প্রয়োজনীয়তা। সপ্তম উইকেট পড়ার পর শেষ ৩৬ বলে আকবর করেন মোটে ১১ রান। উইনিং শটও নিতে পারেননি। ছক্কা মারার প্রশ্নই তাই ওঠে না। তবু, তবুও...

ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের মাহেন্দ্রক্ষণে মহেন্দ্র সিং ধোনির নাম যেমন লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে; বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বজয়ের রূপকথাতেও তেমনি আকবর আলীর নাম ঔজ্জ্বল্য ছড়াবে হিরের দ্যুতিতে। অনেক, অনেক, অ-নে-নে-নে-ক কাল। আসলে চিরকালই।

কারণ রূপকথা তো কখনো পুরনো হয় না!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা