kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

বন্দিজীবনের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে কাল

খালেদার সাজা স্থগিতের আবেদন নিয়ে দোটানা

কৌশলগত কারণে জড়াতে চায় না বিএনপি ► অভিভাবকহীন ‘ফিরোজা’

এনাম আবেদীন   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



খালেদার সাজা স্থগিতের আবেদন নিয়ে দোটানা

একসময়ের জমজমাট ফিরোজা ভবন এখন সুনসান

খালেদা জিয়ার কারাবন্দি জীবনের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল শনিবার। একটি দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাজা হওয়ায় সে দিন থেকে তিনি বন্দিজীবন যাপন করছেন। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। এ কারণে গুলশানে ‘ফিরোজা’ নামের বাড়িটি এখন অভিভাবকহীন। সরেজমিনে গিয়ে বাড়িটি সুনসান দেখা গেছে। যত্নের অভাবে বাড়িটি নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। এদিকে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা সাজা স্থগিত চেয়ে আবেদন করার আভাস দিলেও বিষয়টি নিয়ে দোটানা রয়েছে। কারণ এ আবেদনের জন্য খালেদা জিয়ার পাশাপাশি তারেক রহমানেরও সম্মতি লাগবে। তাঁদের সবুজ সংকেত না আসা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক আবেদন সম্ভব নয়।

এর আগে প্যারোল (শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি) নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া তাতে রাজি হননি। বিএনপি নেতারা এ কারণে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় হওয়ায় তাঁরা একদিকে গোপনীয়তা অবলম্বন করছেন, অন্যদিকে কৌশলগত কারণে দলীয়ভাবেও বিএনপি জড়িত হতে চাইছে না। কারণ দলীয়ভাবে বিষয়টি ‘হ্যান্ডল’ করতে গেলে রাজনৈতিক লাভক্ষতির প্রশ্ন উঠবে। তা ছাড়া সমঝোতার মাধ্যমে মুক্তির বিষয়ে দলের মধ্যেও কিছুটা মতভেদ থাকায় বিএনপিতে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

বিএনপির নেতারা মনে করেন, ওই পরিস্থিতিতে সরকার শেষ পর্যন্ত ‘ছাড়’ নাও দিতে পারে। ফলে পরিবার এবং দু-একজন আইনজীবীর মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকছে।

আইনজীবীদের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং সিনিয়র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, আবেদন করা হয়েছে কি না বিষয়টি তাঁরা জানেন না এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও হয়নি। অন্যদিকে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘আবেদন তো করা হয়েছে। আমরা তো প্রতিদিন বলেছি যে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী এটি সরকারের সদিচ্ছার ব্যাপার। অন্য কোনো প্রসিডিউরের এতে প্রয়োজন হয় না। সরকার চাইলেই এটা করতে পারে।’ কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদনের দরকার আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিচারাধীন বিষয় হলে আনুষ্ঠানিকতার দরকার পড়ে। কিন্তু কনভিকটেড হলে দরকার পড়ে না।’

খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাজা স্থগিতের আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে চিন্তা করছি। দেখা যাক কী হয়!’ তিনি আরো বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা যে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের প্রভাবের কারণে এখনো কারাগারে আছেন।’

অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, সাজা স্থগিতের আবেদন সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা নেই। তবে তিনি বলেন, ‘এটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার ইচ্ছা করলে নিজেও করতে পারে। আবার উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকেও আবেদন করা যায়।’ এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়ার এই আইনজীবী বলেন, ‘দুই উপায়ে ম্যাডামের মুক্তি হতে পারে। এক. রাজপথের আন্দোলন, যেটি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এখন সমঝোতার ভিত্তিতে একটা উপায় হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধের কৌশলে কখনো আগাতে এবং কখনো পেছাতে হয়। সব সময় একগুঁয়েমি মনোভাব নিয়ে থাকলে ফল পাওয়া যায় না। এখন চিকিৎসার অভাবে ম্যাডামের কিছু হয়ে গেলে তো লাভ হলো না!’ আনুষ্ঠানিক আবেদন ছাড়া সরকার উদ্যোগ নেবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো রাজনীতি করতে চাইবে। চাইবে তাদের তোয়াজ করা হোক।’  

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতির আশঙ্কায় তাঁর মুক্তির জন্য ‘বিশেষ আবেদন’ করার কথা জানিয়েছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। গত ২৪ জানুয়ারি বিএসএমএমইউ হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁর বোন সেলিমা রহমান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। পরে জানা যায়, খালেদা জিয়ার পরিবারের তরফ থেকে সাজা স্থগিতের চিন্তাভাবনা চলছে।

এ বিষয়ে এক ধরনের যোগসূত্র স্পষ্ট হয়েছিল এর আগে ১৪ জানুয়ারি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মন্তব্যে। সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিতের আবেদন করা হলে সরকার তা বিবেচনা করবে।’ তিনি সেদিন আরো বলেন, ‘জেলখানায় যাঁরা থাকেন এবং বহুদিন কারাদণ্ড ভোগ করেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী তাঁদের দণ্ড নানা বিবেচনায় অনেক সময় স্থগিত হয়। সাধারণত সাজা স্থগিত হয় অনেক দিন জেলখাটার পর।’

অ্যাটর্নি জেনারেলের ওই বক্তব্যের কিছুদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ওই একই ধারা মোতাবেক খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তাঁর মুক্তি দাবি করেছিলেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আগামীকাল শনিবার দুপুর ২টায় নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ ডেকেছে বিএনপি। সমাবেশের অনুমতির বিষয়ে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেন বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আবদুস সালাম আজাদ ও সেলিমুজ্জামান সেলিম।

বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, সমাবেশের অনুমতির বিষয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তাঁরা সাক্ষাৎ করেছেন। কমিশনার বলেছেন, আলোচনা করে এ বিষয়ে তাঁদের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

জানা যায়, খালেদা জিয়ার কারাবাসের দুই বছর উপলক্ষে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর উদ্যোগে পোস্টার ও লিফলেট প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া তাঁর রোগমুক্তি ও সুস্বাস্থ্য কামনায় আজ শুক্রবার দেশব্যাপী মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

অভিভাবকহীন ‘ফিরোজা’ : গত দুই বছরে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে গুলশান-২-এর ‘ফিরোজা’ নামের বাড়িটি। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছাড়াও ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের পদচারণে যে বাড়িটি গম গম করত, ৭৯ নম্বরের সেই বাড়িটি এখন সুনসান। গতকাল বাড়িটির সামনে গিয়ে কোনো নিরাপত্তা রক্ষ্মীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সাত-আটজন (সিএসএফ) সদস্য এখনো রাতে ওই বাড়িতে থাকেন। অবশ্য এঁদের অনেকের বেতনও অনিয়মিত হয়ে গেছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দৃষ্টিনন্দন ওই বাড়িটির ভেতরের অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গ্যাস ও পানির সংযোগসহ ভেতরের ফিটিংস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ির ভাড়া বাকি পড়েছে ১৬ মাসের। মালিক তানভীর ইসলাম অনেক চেষ্টা করেও বাড়িটির বিষয়ে নিষ্পত্তি করতে পারেননি। মাসিক তিন লাখ টাকা চুক্তির বিনিময়ে ২০১২ সালের ২১ এপ্রিল ওই বাড়িতে উঠেছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁর পক্ষে বাড়িভাড়া চুক্তি করেছিলেন বিএনপির পদত্যাগকারী নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালু। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাড়ির মালিককে ফালু বলে দিয়েছেন, ওই বাড়ির বিষয়ে তিনি আর কিছু জানেন না। তারেক রহমানসহ অন্য কোনো নেতাও ওই বাড়ির বিষয়ে দায়িত্ব নিতে রাজি হননি বলে জানা গেছে।

তবে বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া যে বাড়িতে থাকতেন সেই বাড়ি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা দলীয় নেতাদের নেই। তবে তাঁরা মনে করেন, কারামুক্ত হতে পারলে এরপর খালেদা জিয়া ফিরোজার পাশেই তাঁর নিজের নামে বরাদ্দকৃত বাড়িতে উঠতে পারেন। ১৯৬ নম্বর গুলশান এভিনিউয়ে দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি বিচারপতি সাত্তার সরকারের সময়ে খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। মাসিক কয়েক লাখ টাকার ভাড়ার বিনিময়ে বর্তমানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর সিইওর কাছে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া আছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা