kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন

পরাজয়েও লাভ দেখছে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরাজয়েও লাভ দেখছে বিএনপি

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয় সত্ত্বেও দলগত ও রাজনৈতিকভাবে বেশ কিছু অর্জন বা লাভ দেখছে বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মহানগরী বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা দলের সামনে যেমন স্পষ্ট হয়েছে; পাশাপাশি যেসব লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, তাও পূরণ হয়েছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নির্বাচনে অংশ নিলেই বিএনপি প্রার্থীরা জয়লাভ করবেন বলে দলটির নেতারা নিশ্চিত ছিলেন না। এ অবস্থায় কয়েকটি লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বলে দলটির নেতারা বলছেন।

তাঁদের মতে—প্রথমত, বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে হাজার হাজার মামলা থাকার কারণে পুলিশের ভয়ে তাঁরা প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন না। তাই সিটি নির্বাচন সামনে রেখে তাঁরা নেতাকর্মীদের ঘর থেকে বের করতে চাচ্ছিলেন এবং এই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বলেও তাঁরা মনে করছেন। তাঁদের মতে, বিএনপির প্রচার-প্রচারণার মিছিলে হাজার হাজার নেতাকর্মীর সমাগম হয়েছে। আর এতে দল চাঙ্গা হয়েছে। কারো কারো মতে, মানুষ ধানের শীষের কথা প্রায় ভুলে গিয়েছিল, সেটি আবার সামনে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, দলাদলি ও বিভেদের কারণে মহানগরী বিএনপির মধ্যে অনৈক্য অনেক দিন ধরে আলোচনায় ছিল। কিন্তু নির্বাচন উপলক্ষে ওই ঐক্য ফিরে এসেছে। ঢাকা মহানগরী বিএনপির প্রয়াত নেতা সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল প্রভাবশালী আরেক নেতা মির্জা আব্বাসের। কিন্তু সেই আব্বাস ও তাঁর পুরো পরিবার খোকার ছেলে, মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনের নির্বাচনে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। বিষয়টি বিএনপির পাশাপাশি বাইরেও অনেকের নজর কেড়েছে। দলের মধ্যেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। একইভাবে মহানগরী দক্ষিণে পরস্পর বৈরী সম্পর্কের দুই নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ ও নবীউল্লাহ নবীও ঐক্যবদ্ধ ছিলেন ইশরাকের পেছনে। উত্তরে তাবিথ আউয়ালের পেছনেও নেতাকর্মীরা সমভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন।

তৃতীয়ত, দলের মহানগরী কমিটিতে তরুণ নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি এবার ঢাকার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই মেয়র প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। দলটির নেতারা মনে করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনের ব্যাপারে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জনমনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। এটা মহানগরী বিএনপিতে তাঁদের নেতৃত্বে আসার পথ সুগম করবে।

চতুর্থত, সিটি নির্বাচনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটদানের যে বিরোধিতা বিএনপি করেছে, এটিও সঠিক প্রমাণিত হয়েছে বলে দলটির নেতারা মনে করছেন। তাঁদের মতে, ইভিএমের কারণে ভোটাররা নিরুৎসাহিত হয়েছেন। যে কারণে অনেক মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাননি। তা ছাড়া ৩০ শতাংশেরও কম ভোট পড়ায় বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থা তথা ভোটের প্রতি মানুষের ‘অনাস্থা’র বিষয়টি এবার প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপি নেতাদের মতে, নির্বাচনে ফলাফল কী হবে, এ বিষয়টি আগেভাগে জেনেই মানুষ আর ভোট দিতে যাচ্ছে না। সেটি পরোক্ষভাবে বর্তমান সরকারের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা বলেই দলটির বিশ্বাস।

এদিকে, দুই সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মহানগরী বিএনপির সাংগঠনিক দুরবস্থার চিত্র এবার নেতাদের সামনে উঠে এসেছে। তাঁরা মনে করেন, মামলা থাকার কারণে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাকর্মীদের কাছ থেকে প্রতিরোধের এক ধরনের ভয় ছিল এটি সত্য। কিন্তু তার পরও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সমান সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে মাঠে দাঁড়ানো গেলে পরিস্থিতি কিছুটা অনকূলে আনা যেত। এজেন্ট এবং কর্মী-সমর্থকদের শক্ত অবস্থান না থাকার কারণে বহু ভোটকেন্দ্র আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের একতরফা প্রচারণা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল; যা পরে বিএনপির কাছে স্পষ্ট হয়েছে। এসব ঘটনায় মহানগরী বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে (ডিএসসিসি) বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল এবং ভোটের অধিকার পূনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই বলেই আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।’ বিএনপির উদ্দেশ্য সফল হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থীরা ভোটে জয়ী হলেও ইভিএমের কাছে পরাজিত হয়েছেন। সেই সঙ্গে আমরা এটিও প্রমাণ করতে পেরেছি যে, এই সরকারের সময় ভোটের প্রতি মানুষের আর আস্থা নেই।’

‘সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং আগামীতে মহানগরীতে তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া মহানগরী বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে তা দূর করতে বিএনপি উদ্যোগী হবে,’ বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ এই নেতা।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ঢাকা উত্তরের আহ্বায়ক ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের হাতে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এটি বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছে।’ তিনি বলেন, মহানগরী বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাও বিএনপির সামনে এসেছে। কিন্তু সেটাই পরাজয়ের কারণ নয়। কারণ হলো ইভিএম একটি ব্যর্থ ও অকার্যকর পদ্ধতি; সেটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে।’

নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ এবং চাঙ্গা হয়েছে—এই দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ এই নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলে তরুণ নেতৃত্ব বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হয়েছে।’

নির্বাচন থেকে বিএনপির অর্জন কী জানতে চাইলে দক্ষিণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘মানুষকে বোঝানো গেল, নির্বাচন কমিশনসহ সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রযন্ত্র মিলেমিশে এমনভাবে একাকার হয়েছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এ দেশে আর কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটদানের জন্য দেশের জনগণ প্রস্তুত নয়, এটাও প্রমাণিত হলো।’ তাঁর মতে, ‘ইভিএমের ব্যাপারে দেশের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে প্রশ্ন তো রয়েছেই, পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের কাছেও এটি আরো জটিল একটি বিষয়, যা এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বোঝা গেল।’ ইশরাক এও বলেন, ‘নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা মহানগর বিএনপি কিছুটা চাঙ্গা হয়েছে এটা স্পষ্ট। কিন্তু একে আরো চাঙ্গা করতে হবে। মহানগরী চাঙ্গা না হলে কোনো আন্দোলনই সফল হবে না।’

মন্তব্য