kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ইশরাকের প্রচারের সময় সংঘর্ষ, ফাঁকা গুলি

♦ নির্বাচন বানচাল করতে হামলা : ইশরাক
♦ বিএনপি প্রার্থীর অস্ত্র থেকে গুলি হয়েছে : তাপস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইশরাকের প্রচারের সময় সংঘর্ষ, ফাঁকা গুলি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনের প্রচারণায় গতকাল গোপীবাগে হামলার ঘটনা ঘটে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী ইশরাক হোসেনের নির্বাচনী প্রচারের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় ফাঁকা গুলিও হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুরে গোপীবাগ এলাকায় এ সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে।

প্রায় আধাঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলার পর পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে সাতটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ বলেছে, কারা গুলি করেছে সেটি তাৎক্ষণিক জানা যায়নি। আশপাশের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরা থেকে ছবি সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এ ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থীরা। বিএনপির প্রার্থী ইশরাক বলেছেন, নির্বাচন বানচাল করতে তাঁর প্রচারে হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে সুপরিকল্পিত হামলার অভিযোগ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, তিনি যতটুকু জেনেছেন, বিএনপি প্রার্থীর নিজের অস্ত্র থেকে গুলি করা হয়েছে।

যেভাবে ঘটনা : প্রত্যক্ষদর্শী আলাউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, দুপুর পৌনে ১টার দিকে ইশরাক হোসেন কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল করে মতিঝিলের দিক থেকে টিকাটুলীর দিকে যান। টিকাটুলীর মোড় ঘুরে তাঁরা গোপীবাগে ইশরাকের বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। বাসা থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ের সামনে দলটির ২০-২৫ জন দাঁড়িয়ে ছিল। আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি মূলত নির্বাচনী ক্যাম্প। এটি একটি দোতলা ভবন, যার তিনতলার নির্মাণ কাজ চলছে। ইশরাকের নেতৃত্বে বিএনপির নেতাকর্মীরা ওই স্থানে পৌঁছলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুরু হয়। এরপর হাতাহাতি। এ সময় নির্মাণাধীন ভবনের দোতলা থেকে কে বা কারা ইট ও চেয়ার ছুড়ে মারে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষের শুরুতে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়।

প্রতক্ষ্যদর্শী আরিফ রহমান জানান, টিকাটুলী মোড় থেকে ইশরাক হোসেন কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল করে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের গলিতে প্রবেশের সময় কলেজের মূল ফটকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী রোকনউদ্দিন আহমেদের সমর্থকদের সঙ্গে ইশরাকের কর্মী-সমর্থকদের প্রথমে বাগিবতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষই একে অপরের উদ্দেশে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা শুরু করে। এর মধ্যে অন্তত ১০টি গুলির শব্দও শোনা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে শুরু হয়ে ১টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত থেমে থেমে এই সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন সময় টিভির ক্যামেরা পারসন আশরাফ, বিএনপিকর্মী আবদুর রহিম দীপ্ত, সবুর, রহিম ভূঁইয়াসহ দুই পক্ষের অন্তত ১০ জন।

আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বলছে, ইশরাকের মিছিল থেকে উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থকরা বলছে, তারা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় হঠাৎ করে হামলা চালানো হয়।

ইশরাক হোসেন তাৎক্ষণিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর এখানে কার্যালয় রয়েছে। সেখান থেকে হামলা করা হয়েছে। আমি আমার কর্মীদের শান্ত থাকতে বলেছি। ১ ফেব্রুয়ারি ভোটের মাধ্যমে আমরা এর জবাব দেব।’ তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় তিনি মামলা করবেন। এদিকে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন তাঁর গণসংযোগে হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগে এ ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ডিএসসিসি ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের বিপরীত পাশে নির্মাণাধীন ভবনে স্থাপিত আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প থেকে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে।

গত রাতে ইশরাক হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী আমরা ডিএমপি কমিশনার ও দক্ষিণের রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। থানায় মামলা করতে গেলেও মামলা নেওয়া হয়নি। কাল (আজ) আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব।’

পুলিশ যা বলল : ঘটনাস্থলে আসা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইশরাক হোসেন যে এ সময় প্রচার চালাবেন তা পুলিশকে জানানো হয়নি। আগে জানতে পারলে তাঁরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে পারতেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নূরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়র প্রার্থীরা কোথাও গণসংযোগে গেলে আগে থেকে জানিয়ে যান। টিকাটুলী এলাকায় ইশরাক বিকেল ৫টার সময় আসবেন—এমন কথা ওয়ারী থানাকে জানানো হয়েছিল। তবে তিনি ১টার দিকে চলে আসেন। যে কারণে সেখানে টহল পুলিশ ছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল না।

আরেক প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কেউ মামলা করতে গেলে মামলা নেওয়া হবে। তদন্ত করা হবে। এরই মধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে সাতটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো কোথা থেকে এলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

ইশরাকের জরুরি সংবাদ সম্মেলন : গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে ইশরাকের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর গোপীবাগের বাসায় যান ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন। তিনি সেখানে প্রায় ৩০ মিনিট ছিলেন। এরপর জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন ইশরাক হোসেন। তিনি সংঘর্ষের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বিএনপি কর্মীদের ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, তাঁর দলের কেউ গুলি ছোড়েনি, বরং তাদের ওপর গুলি করা হয়েছে।

ইশরাক আরো বলেন, নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মেনেই নির্বাচনী প্রচার শেষে গোপীবাগে নিজের বাসায় ফেরার পথে তাঁর এবং তাঁর সমর্থকদের ওপর হামলা চালানো হয়।

তাপসের বক্তব্য : সবুজবাগ এলাকায় গতকাল জনসংযোগকালে গোপীবাগে সংঘর্ষের ঘটনায় ইশরাক ও তাঁর কর্মী-সমর্থকদের দায়ী করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের কর্মীরা ভোটার স্লিপ নিয়ে কাজ করছিল। বিএনপি প্রার্থী নিজে সদলবলে হাজির হয়েছেন। আমাদের নৌকার ক্যাম্পে হামলা হয়েছে। আমি যতটুকু জেনেছি, বিএনপি প্রার্থীর নিজের অস্ত্র থেকেই গুলি করা হয়েছে। একজন প্রার্থীর অস্ত্র বহন করার কোনো সুযোগ নেই। এটা শুধু আচরণবিধি নয়, আইনেরও লঙ্ঘন। এমন অনভিপ্রেত পরিবেশ কাম্য নয়, এটা নিন্দনীয়।’

তাপস বলেন, ‘নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির কূটকৌশল নিয়ে সফল হচ্ছে না বিএনপি। সন্ত্রাসীদের বের করে এনেছে। তারা ভয়ভীতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হবে।’

শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘জাতীয় রাজনীতির কূটকৌশল প্রয়োগ করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই, এটা স্থানীয় নির্বাচন।’

সর্বশেষ গত রাতে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী রোকন উদ্দিন আহমেদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সচিব মাকসুদ ওয়ারী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় আজ্ঞাতপরিচয় ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা