kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন

হামলা-মামলার ভয়ে আ. লীগ বিদ্রোহীরা

লায়েকুজ্জামান   

২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হামলা-মামলার ভয়ে আ. লীগ বিদ্রোহীরা

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, এই প্রার্থীদের মধ্যে বাড়ছে হামলা-মামলাসহ নানা হয়রানির আশঙ্কা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৪১টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৯টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগ প্রচারণায় খুবই তৎপর।

গত ১৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে দুই দিনের মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ শুরু করার আহ্বান জানান। কিন্তু কোনো প্রার্থী তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দেননি। বিদ্রোহীদের বিষয়ে আওয়ামী লীগও আগের অবস্থানে নেই। দলীয় নেতাদের সুর এখন অনেক নরম।

বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তরের সভাপতি বজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁরা নির্বাচন করছেন।’ হামলা-মামলা, হয়রানির বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘না, এমন কোনো ঘটনা ঘটছে না।’ বিদ্রোহীদের ওপর হামলা-মামলা, হয়রানির ঘটনা অস্বীকার করে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি আবু

আহমেদ মন্নাফী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ হামলা-মামলার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।’

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের একাধিক ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর ওপর হামলা-মামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী হামলা এবং পুলিশি হয়রানির আশঙ্কা করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি)

করেছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রচারকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। আবার মিথ্যা মামলা দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীকে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী তাঁদের ওপর হামলা হতে পারে, মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

ডিএসসিসির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বিল্লাল সরদারের ওপর এরই মধ্যে দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনী প্রচার কাজ এবং জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী ফারহানা আহমেদ বৈশাখী।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর ক্যাডার বাহিনী যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে বলে রূপনগর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ডিএনসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী লিপন চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র চলছে।

গত ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কামরাঙ্গীর চর এলাকায় নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছিলেন ডিএসসিসির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বিল্লাল সরদার। ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেনের ক্যাডার হানিফ, জাহাঙ্গীরসহ আরো কয়েকজন ক্যাডার বিল্লাল সরদারের ওপর হামলা চালায়। ক্যাডাররা তাঁর হাতের একটি আঙুলও ভেঙে দিয়েছে। ওই সময় বিল্লাল সরদার কামরাঙ্গীর চর থানার ওসিকে ফোন করে ঘটনা জানালে তিনি থানা থেকে দুজন পুলিশ পাঠান। পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে বলেন, ‘আপনি এখন প্রচার করেন, আমরা আপনাকে পাহারা দেব।’ কিন্তু কিছু সময় পর পুলিশ চলে গেলে ক্যাডার জাহাঙ্গীর ও তাঁর সহযোগীরা আবারও বিল্লাল সরদারের ওপর হামলা চালায়।

বিল্লাল সরদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই ঘটনার পর থেকে মোহাম্মদ হোসেনের ক্যাডার বাহিনী নিয়মিত আমার সমর্থকদের রাস্তাঘাটে হুমকি দিচ্ছে। আমি নিরাপত্তার কারণে প্রচারকাজে নামতে পারছি না।’

ওই ওয়ার্ডের আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুর রহমান রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন নিজে উপস্থিত থেকে আমার সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। প্রচারকাজে বের হলেই তাঁর ক্যাডার বাহিনী আমার সমর্থকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হুমকি দিচ্ছে।’

এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব মিথ্যা অভিযোগ। আমি বা আমার কোনো কর্মী কারো ওপর হামলা করেনি।’

ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী ফারহানা আহমেদ বৈশাখী মতিঝিল থানায় করা জিডিতে উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন তাঁর ওপর হামলা করতে পারে।

ফারহানা আহমেদ বৈশাখী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তাই থানায় জিডি করেছি।’

জানতে চাইলে মতিঝিল থানার ওসি ইয়াসির আরাফাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈশাখী থানায় যে জিডি করেছেন তার তদন্ত চলছে।’

ডিএসসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী তারিকুল হক সজীব, ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী আলাউদ্দিন, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী বিল্লাল শাহ ও ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন খান হামলা-মামলা করে তাঁদের হয়রানি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করা হতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করছি।’

গত ১৯ জানুয়ারি ডিএনসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাউনিয়া বাঁধের ডি ব্লকে স্থানীয় মাদক কারবারি শান্ত গ্রুপ ও পিংকু গ্রুপের মধ্যে মারামারির ঘটনায় পিংকু গ্রুপের ক্যাডাররা শান্তকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। ওই ঘটনার দায় বিদ্রোহী প্রার্থী জুয়েল রানার ওপর চাপাতে গুরুতর আহত শান্তকে প্রতিপক্ষরা রাতভর বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে ঘোরাঘুরি করলেও তাঁর চিকিৎসা করায়নি। পরে ঘটনাটি জানতে পেরে পল্লবী থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা শান্তকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপতালে ভর্তি করান। ফলে তিনি জানে বেঁচে যান।

বিদ্রোহী প্রার্থী জুয়েল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনে আমি জয়লাভ করব। আমাকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে নানা রকম ষড়যন্ত্র চলছে। তবে আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াব না।’

ডিএনসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন তফাজ্জল হোসেন টেনু। ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লিপন চৌধুরী। তিনি তাঁর ওপর হামলা হতে পারে বলে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে রূপনগর থানায় একটি লিখিত আবেদন করেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী প্রচারে নামলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর ক্যাডাররা আমাদের আশপাশ ঘিরে অশ্রাব্য ভাষায় গাল দিতে থাকে।’ একই ওয়ার্ডে আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী আনসার আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই দিন আগে তফাজ্জল হোসেন টেনু আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে নিয়ে নানা ধরনের হুমকি দিয়েছেন। এতে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’ ওই ওয়ার্ডের আরেক প্রার্থী শেখ নাসির উদ্দিন নির্বাচন কমিশনে লিখিত আবেদন করে জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছেন।

ডিএনসিসির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সালাউদ্দিন রবিনের ক্যাডাররা। পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকার দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেশির ভাগ মানুষ আমার সমর্থক। এ কারণে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশি হয়রানির হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

ডিএনসিসির ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী গাজী ওলিয়ার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাকে প্রচারকাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কর্মীরা পোস্টার টাঙাতে গেলে পোস্টার ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রচারে নামলে প্রচারপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কাজগুলো করানো হয় এলাকায় অপরিচিত কিছু নতুন মুখ দিয়ে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা