kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ আইসিজের

মেহেদী হাসান   

২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ আইসিজের

‘জেনোসাইড’ থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে চারটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস, সংক্ষেপে আইসিজে)। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে আইসিজের বিচারকরা সর্বসম্মতভাবে ওই রায় দেন।

প্রথম ব্যবস্থা হিসেবে জেনোসাইড সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিভিন্ন অপরাধগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হওয়া ঠেকাতে মিয়ানমারকে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। জেনোসাইড সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে অপরাধ হিসেবে বিশেষ করে (ক) কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা, (খ) কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা, (গ) কোনো গোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা তার অংশবিশেষকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করতে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী দুর্ভোগ চাপিয়ে দেওয়া এবং (ঘ) কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম ঠেকাতে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। আইসিজেতে গাম্বিয়া দাবি করেছিল, ওই সব অপরাধই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হচ্ছে।

আইসিজে দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বলেছে, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মিয়ানমার নিশ্চিত করবে যে তার সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি কোনো অনিয়মিত সশস্ত্র ইউনিট কোনো ধরনের জেনোসাইড করবে না বা জেনোসাইডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে না।

তৃতীয় ব্যবস্থা হিসেবে আইসিজে মিয়ানমারকে জেনোসাইড সনদের আওতায় বর্ণিত অপরাধগুলোর তথ্য-প্রমাণ বিনষ্ট না করতে এবং সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। চতুর্থ ব্যবস্থা হিসেবে আইসিজে বলেছে, অন্তর্বর্তী আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে আগামী চার মাসের মধ্যে আদালতকে মিয়ানমারের জানাতে হবে। এরপর আইসিজেতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জেনোসাইডের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস পর পর আদালতে অন্তর্বর্তী আদেশ পালন বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুলকায়ি আহমেদ ইউসুফ গতকাল এই রায় ঘোষণার সময় বলেন, তাঁদের এই আদেশ মেনে চলতে আইনগতভাবে মিয়ানমার বাধ্য। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলেরও কোনো সুযোগ নেই।

আদালতে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর এম তামবাদুইয়ের নেতৃত্বে তাঁর আইনজীবী দল এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের মন্ত্রী চ টিন্ট সুয়ের নেতৃত্বে আইনজীবী দল উপস্থিত ছিলেন। গত নভেম্বর মাসে গাম্বিয়া আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জেনোসাইড প্রতিরোধবিষয়ক সনদ লঙ্ঘন ও রোহিঙ্গা জেনোসাইডের দায়ে আইসিজেতে মামলা করে। সেই মামলায় জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ারও আবেদন করেছিল গাম্বিয়া। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনের ব্যাপারে গত ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর আইসিজেতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেই শুনানিতে মিয়ানমারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। ওই শুনানিতে মিয়ানমার গাম্বিয়ার মামলার বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছিল গতকাল সেগুলো এক এক করে খারিজ করে দিয়েছেন আইসিজে। হেগের পিস প্যালেসে আইসিজের প্রেসিডেন্ট যখন মামলার রায় পড়ছিলেন তখন মিয়ানমারের মন্ত্রী ও আইনজীবী দলকে বিমর্ষ ও গম্ভীর দেখাচ্ছিল।

মামলার নথি ও রায়ের কপি ঘেঁটে দেখা যায়, গাম্বিয়া তার আবেদনে পাঁচটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। আইসিজে সেই পাঁচটি ইস্যু সমুন্নত রেখে চারটি ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

জেনোসাইড কি না নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতে : মিয়ানমারে জেনোসাইড হয়েছে বা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে আইসিজে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। এটি আগামী দিনগুলোতে মূল মামলার শুনানি ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে। তবে গতকাল আইসিজে তাঁর রায়ে গাম্বিয়ার যুক্তি, জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব আমলে নিয়ে বলেছেন, মিয়ানমারে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা জেনোসাইডের ঝুঁকিতে আছে। জেনোসাইড প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে তা ঠেকানো মিয়ানমারের দায়িত্ব।

গাম্বিয়ার মামলা করার অধিকার নিয়ে মিয়ানমারের যুক্তি খারিজ : গত ডিসেম্বর মাসে শুনানির সময় মিয়ানমার যুক্তি দেখিয়েছিল, এই মামলায় গাম্বিয়া ক্ষতিগ্রস্ত নয়। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) হয়ে গাম্বিয়া মামলা করেছে। এই মামলা করার কোনো অধিকার গাম্বিয়ার নেই।

আইসিজে মিয়ানমারের সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়ে বলেছে, গাম্বিয়া স্বনামে এই আবেদন করেছে। এরপর তারা ওআইসিসহ যেকোনো সংস্থা ও দেশের সহযোগিতা চাইতে পারে। এতে করে গাম্বিয়ার মামলা করার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না।

আইসিজে বলেছে, গাম্বিয়া মিয়ানমারে যে সব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ এনেছে সেগুলো জেনোসাইড সনদের আওতায় অপরাধ এবং সেগুলো বন্ধে কিছু না কিছু অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।

জেনোসাইড সনদের আওতায় রোহিঙ্গারা সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য : আইসিজে বলেছে, গাম্বিয়া জেনোসাইড সনদের আওতায় একটি গোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য আবেদন করেছে। আদালতের দৃষ্টিতে জেনোসাইড সনদের আওতায় রোহিঙ্গারা সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য।

গত ডিসেম্বর মাসের শুনানির সময় মিয়ানমার বলেছিল, অভিযানের সময় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হয়ে থাকতে পারে। আইসিজে মিয়ানমারের ওই স্বীকারোক্তির সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এসংক্রান্ত প্রস্তাবের যোগসূত্র স্থাপন করেছে। সাধারণ পরিষদে গৃহীত ওই প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচার ও ব্যাপক মাত্রার নির্যাতন-নিপীড়নের নিন্দা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও রোহিঙ্গা জেনোসাইড হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এসব বিষয় আমলে নিয়ে আইসিজে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনকে যৌক্তিক বলে অভিহিত করেছে।

অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকি : আইসিজে তার রায়ে মিয়ানমারে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি এবং হত্যা ও অন্যান্য নির্যাতন থেকে রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা জেনোসাইডের বড় ধরনের ঝুঁকিতে আছে।

প্রত্যাবাসন ও সুরক্ষায় মিয়ানমারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় : আইসিজে তার রায়ে বলেছে, গত ডিসেম্বর মাসে শুনানিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে বলে জানিয়েছিল। মিয়ানমার আরো বলেছিল, রাখাইন রাজ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনকারী সামরিক সদস্যদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আইসিজে গতকালের রায়ে বলেছে, মিয়ানমারের এসব আশ্বাস তাদের অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় এবং গাম্বিয়ার আবেদন অযৌক্তিক প্রমাণ করতে যথেষ্ট নয়।

আইসিজে থেকে সবার দৃষ্টি এখন মিয়ানমারে : মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত রাতে এক বিবৃতিতে বলেছে, আইসিজের রায়কে তারা আমলে নিয়েছে। তবে মিয়ানমারে কোনো জেনোসাইড হয়নি। মিয়ানমারের তদন্ত কমিশন যুদ্ধাপরাধের তথ্য পেয়েছে। সেগুলো এখন তদন্ত করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থায় বিচার করা হচ্ছে।

মিয়ানমার তার বিবৃতিতে আরো বলেছে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া মিয়ানমারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই কিছু মানবাধিকার গোষ্ঠীর মিয়ানমার পরিস্থিতির বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরার প্রভাব বেশ কিছু দেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কের ওপর পড়েছে।

মিয়ানমার বলেছে, ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাব্য দায় এড়াতেই ঐতিহাসিকভাবে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা সংক্রান্ত আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে। এর সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক নেই।

এদিকে বাংলাদেশ আইসিজের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) এক বিবৃতিতে আইসিজের আদেশকে আমলে নিয়েছে। ইইউ বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মিয়ানমারকে আইসিজের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাসংক্রান্ত আদেশ মেনে চলতে হবে। মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের পাশাপাশি সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইইউ আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট, সংক্ষেপে আইসিসি) নির্দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের তদন্তের দিকেও দৃষ্টি রাখছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আইসিজের আদেশ মেনে চলার ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ আসছে। মিয়ানমার কী করবে সে দিকেই এখন সবার দৃষ্টি থাকবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা