kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মামলার জালে আটকা ৩২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব

► ঝুলে আছে ২২ হাজারের বেশি মামলা
► মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও মামলার সুযোগ নেন
► বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের
► বিশেষ ব্যবস্থায় নিষ্পত্তির তাগিদ আইনজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মামলার জালে আটকা ৩২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব

মামলার জালে আটকে আছে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিলেও অনেক ক্ষেত্রে তা থমকে যায় দীর্ঘ মামলার জালে। উচ্চ আদালত ও রাজস্বসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে ২২ হাজারের বেশি মামলা। আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্কের এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজস্বসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

তথ্যানুযায়ী মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতাকে কাজে লাগিয়ে ৩২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে রেখেছে স্বার্থান্বেষী মহল। রাজস্ব আটকে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই মামলা। শুধু বড় শিল্প গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানই নয়, মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও রাজস্ব ফাঁকি দিতে মামলা করছেন। ভ্যাট-ট্যাক্সসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে আদালতের দারস্থ হচ্ছেন। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীরাও আদালতে মামলা করে আটকে রাখছেন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

আইনজ্ঞরা বলছেন, রাজস্বসংক্রান্ত মামলা বেশিদিন ঝুলে থাকার অর্থ, সরকারের কোষাগারের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি হওয়া। যার খেসারত দিতে হয় জনগণকেই। তাঁরা বলছেন, রাজস্বসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির জন্য বর্তমানে হাইকোর্টে একাধিক বেঞ্চ নির্ধারিত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বেঞ্চ বাড়ানোর পাশাপাশি এসব মামলা নিষ্পত্তিতে নিতে হবে বিশেষ উদ্যোগ। বিশেষ ব্যবস্থায় এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে এনবিআরকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে বলেও মত দেন আইনজ্ঞরা।

জানা গেছে, এনবিআর কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ভ্যাট বা ট্যাক্স দাবি করলে এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে আবেদন বা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা যায়। রিট করার পর উচ্চ আদালত আবেদন খারিজ করে এনবিআরে পাঠাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আবেদন করতে হয় এনবিআরের অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে। এ জন্য দাবি করা অর্থের ১০ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজনীয় শুনানি শেষে রায় দেন। এরপর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ফের উচ্চ আদালতে আপিল করে। এভাবে গড়িয়ে যায় বছরের পর বছর।

অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের আওতায় আয়কর খাতের জন্য সাতটি বেঞ্চ এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও শুল্ক খাতের জন্য তিনটি বেঞ্চ রয়েছে। এসব বেঞ্চে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের দুটি শাখার মামলাসংক্রান্ত শুনানি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। জানা গেছে, এনবিআরের অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের দুটি আদালতে এক মাসে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাতটি মামলার শুনানি সম্ভব হয়। আবার কোনো কোনো মাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সাক্ষীর অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে আরো কমসংখ্যক মামলার শুনানি হয়। বিপরীতে প্রতি মাসে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি নতুন মামলা যুক্ত হয় এসব বিভাগে। এভাবে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার চেয়ে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

এনবিআরের তথ্য মতে, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতিতে কিছু মামলা নতুন করে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বড় যেসব করদাতা মামলা করেছেন, এডিআরে তাঁরা যাতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন, সে উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটগুলো। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এডিআরের বিষয়ে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে এনবিআরের আইন কর্মকর্তা লিয়াকত আলী বলেন, রাজস্ব আটকে রাখা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে এনবিআর থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে সব সময় তাগিদ দেওয়া হয়। কারণ এনবিআরের কোনো আলাদা লিগ্যাল উইং নেই। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসই এসব মামলা পরিচালনা করে।

তিনি বলেন, অমীমাংসিত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় হবে। এনবিআর এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

রাজস্বসংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উপায় জানতে চাইলে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, দেশে যে সংখ্যক মামলার জট রয়েছে, তাতে সুযোগসন্ধানীরা তো সুযোগ নেবেই। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী মামলাকে রাজস্ব ফাঁকির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, যেহেতু সরকার এখানে ক্ষতিগ্রস্ত, তাই সরকারকেই এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।

বিচারপতি মানিক বলেন, এনবিআরের উচিত হবে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে এসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে হাইকোর্টে এসংক্রান্ত বেঞ্চ আরো বাড়াতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকেও আরো গুরুত্ব দিয়ে মামলাগুলো পরিচালনা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিচারপতিদের উচিত হবে রাজস্বসংক্রান্ত আবেদন এলে সেগুলো খুব ভালো করে যাচাই-বাছাই করে আদেশ দেওয়া। কোনো ধরনের মুলতবি ছাড়া এসব মামলার শুনানি করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক, সরকারের এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব মামলার কারণে আটকে আছে। এখানে রাজস্ব কর্মকর্তাদেরও ক্রটি আছে। তাঁরা যদি আমদানি পণ্যের সঠিক মূল্যায়ন বা রাজস্ব আদায় তদারকি করতেন, তাহলে এত মামলা হতো না। বর্তমানে হাইকোর্টে রাজস্ব মামলাসংক্রান্ত অনেক বেঞ্চ রয়েছে। এ অবস্থায় এনবিআরের উচিত হবে মামলাগুলো শ্রেণিবিন্যাস করে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা। তাহলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা