kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৩০ জমাদিউস সানি ১৪৪১

রকিবুল হুদার নির্দেশ ছিল

মেরে ফেল ভরাইয়া ফেল হাসপাতাল

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মেরে ফেল ভরাইয়া ফেল হাসপাতাল

১৯৮৮ সালের ২৪ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে আয়োজন করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের সমাবেশ। সেই সমাবেশে যোগ দিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। ট্রাকবহরযোগে তিনি নিউ মার্কেটের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন সমাবেশস্থলে। পথে নগর পুলিশ তিন স্তরের কর্ডন তৈরি করেছিল—নিউ মার্কেটে, বাংলাদেশ ব্যাংক গেটে ও লালদীঘি মাঠে। উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনা যাতে সমাবেশস্থলে পৌঁছতে না পারেন।

তৎকালীন স্বৈরশাসকের অধীনে থাকা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার নির্দেশনায় সেদিন কর্ডন তৈরি করেছিল পুলিশ। কিন্তু শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাক নিউ মার্কেটের সামনে পুলিশ কর্ডন ভেঙে এগোতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক গেটে ট্রাক পৌঁছার আগেই তৎকালীন পুলিশ কমিশনার ওয়াকিটকির মাধ্যমে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, ‘মাইরা ফেল, জ্বালাই ফেল, হাসপাতাল ভরাইয়া ফেল।’

ওয়াকিটকির মাধ্যমে পুলিশ কমিশনারের এমন নির্দেশনা শুনেছিলেন সেই সময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। ওই সময় সিএমপির বিভিন্ন পদে দায়িত্বরত ছিলেন এমন ১৩ জন পুলিশ কর্মকর্তা আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে পুলিশ কমিশনারের ওই নির্দেশনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

একাত্তরে রকিবুল হুদা ছিলেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মেজর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি সিএমপি কমিশনার হয়েছিলেন তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের আনুকূল্য পেয়ে। সেই আনুকূল্যে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করতেই ‘গণহত্যার’ নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে দাবি করেন।

আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রকিবুল হুদার ওই নির্দেশনার পরই কোতোয়ালি থানার তৎকালীন প্যাট্রল ইন্সপেক্টর গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল ওরফে জে সি মণ্ডল গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। তখনই বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কর্ডনে থাকা পুলিশ সদস্যরা নির্বিচারে গুলি ছোড়া শুরু করেন। এতে মারা যান আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী। আহত হন কয়েক শ ব্যক্তি।

প্রায় তিন দশক পর গতকাল সোমবার এই মামলার রায় ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ইসমাইল হোসেন। মামলাটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ছিল। কিন্তু ওই আদালতে বিচারক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করেন। এ মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষ্য পর্যায়ে তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের কর্মকাণ্ড ও নির্দেশনার বিষয় উঠে এসেছে।

‘আমি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলছি, আপনারা গুলি থামান’ : আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্যে উঠে এসেছে, পুলিশ সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করলে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলছি, আপনারা গুলি থামান।’ কিন্তু পুলিশ সদস্যরা শেখ হাসিনার আহ্বানে কর্ণপাত না করে নির্বিচারে গুলি চালান। পরে আইনজীবীরা মানবঢাল সৃষ্টি করে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যান আদালত প্রাঙ্গণে। এতে তিনি প্রাণে রক্ষা পান।

আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার রায় ২০০ পৃষ্ঠার বেশি। তাতে আদালতের পর্যবেক্ষণ অংশে সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ওই সব তথ্য উঠে এসেছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার ওয়াকিটকির মাধ্যমে প্রদত্ত অবৈধ নির্দেশে সাবেক প্যাট্রল ইন্সপেক্টর কোতোয়ালি থানার পলাতক আসামি জে সি মণ্ডলের অবৈধ হুকুমে আসামীরা এলোপাতাড়ি রাইফেলের গুলি ছুড়তে আরম্ভ করেন। আসামিদের নির্বিচার গুলিতে ২৪ জন মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তী সময়ে আসামি পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত সাক্ষ্য প্রমাণাদি বিনষ্ট ও গোপন করার জন্য নিহত মুসলিম ও হিন্দুদের গোপনে এবং নিহতদের আত্মীয়স্বজনের অগোচরে কোতোয়ালি থানার অভয়মিত্র মহাশ্মশানে পোড়াইয়া ফেলে।’

পর্যবেক্ষণের আরেকাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে আরো প্রমাণিত হয় যে ঘটনার তারিখ ও সময়ে আসামি জে সি মণ্ডল, প্রদীপ বড়ুয়া, শাহ মো. আবদুল্লাহ, মমতাজ উদ্দিন ও মোস্তাফিজুর রহমান শান্তিপ্রিয় জনগণের ওপর বিনা উসকানিতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শত শত নিরীহ লোককে আহত ও পঙ্গু করেছেন। এ অপরাধের কারণে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৩২৬/৩৪ ধারায় আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরো ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা সমীচীন হবে বলে অত্র আদালত মনে করেন।

মামলায় মোট আসামি ছিলেন আটজন। এঁদের মধ্যে মীর্জা রকিবুল হুদা, বশির উদ্দিন ও আবদুস সালাম মারা যান। বাকি পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা