kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

৫ পুলিশের ফাঁসির দণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৫ পুলিশের ফাঁসির দণ্ড

১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার জনসভার আগে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার বিকেলে চট্টগ্রামের বিশেষ জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক ও চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ মো. ইসমাইল হোসেন এই রায় ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন জানিয়েছেন, ২৪ জনকে গুলি করে হত্যা এবং শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা দেশের বিচারিক ইতিহাসের প্রথম রায়। অতীতে একসঙ্গে এতসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির নেই।

দণ্ডিতরা হলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি জোনের প্যাট্রল ইন্সপেক্টর গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল (জে সি মণ্ডল), কনস্টেবল প্রদীপ বড়ুয়া, শাহ মো. আবদুল্লাহ, মমতাজ উদ্দিন ও মোস্তাফিজুর রহমান। দণ্ডিতদের মধ্যে জে সি মণ্ডল মামলার শুরু থেকে পলাতক। বাকি চার আসামিকে রায় ঘোষণার আগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়।

রায় ঘোষণার পর আদালতে উপস্থিত দণ্ডিত আসামিরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের একজন উচ্চৈঃস্বরে বলেন, ‘আমি ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না।’ রায়ের পর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে সাবেক এই পুলিশ কনস্টেবলদের আদালত ভবনের চতুর্থ তলা থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলে দেওয়া হয়। এরপর প্রিজন ভ্যানটি দ্রুত কারাগারের দিকে চলে যায়। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে থাকা দণ্ডিত চার আসামি মুখ লুকানোর চেষ্টা করেন। আর আদালত ভবনের নিচতলায় উপস্থিত আসামিদের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরে পুলিশ তাদেরও সরিয়ে দেয়।

গতকাল বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে এজলাসে আসেন বিচারক। মাত্র ১০ মিনিটে সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শেষে সোয়া ৩টায় এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক মো. ইসমাইল হোসেন। রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা উল্লাস প্রকাশ করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন।

রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। এ ছাড়া ৩২৬/৩৪ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরো ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডিত আসামি গ্রেপ্তার হলে কিংবা পরবর্তী সময়ে আত্মসমর্পণ করলে রায় কার্যকর হবে।’

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে আওয়ামী লীগ সমাবেশের আয়োজন করে। স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেদিন সমাবেশে যোগ দিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে পৌঁছেন। নেতাকর্মীরা তাঁকে একটি ট্রাকে নিয়ে সমাবেশের দিকে রওনা দেন। নিউ মার্কেট পেরিয়ে শেখ হাসিনার ট্রাকবহর বাংলাদেশ ব্যাংক গেটে পৌঁছলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী মারা যান। আহত হন শত শত ব্যক্তি। ওই দিন আইনজীবীরা মানবপ্রাচীর তৈরি করে শেখ হাসিনাকে আদালত প্রাঙ্গণে সরিয়ে নেন।

পুলিশের গুলিতে ওই দিন মারা যান মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথলেবার্ট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মো. কাসেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত হোসেন।

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনার আলামত নষ্ট করতে পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে লাশ অভয়মিত্র শ্মশানে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ওই সময় পুলিশের নির্দেশনা অমান্য করে মরদেহ দাহ করতে অপারগতা প্রকাশ করলে পুলিশ শ্মশানে থাকা লোকদেরও গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়। পরে নিহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হয়। সেই স্মৃতিস্তম্ভে নিহতদের নামের তালিকা স্মৃতি হয়ে আছে।

আদালত সূত্র জানায়, ১৯৮৮ সালের ঘটনায় নিহতের স্বজনরা মামলা করতে পারেনি। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা বাদী হয়ে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদাকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ফলে মামলার তদন্তকাজ ধীরগতিতে চলে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলার তদন্তে গতি আসে। এরই ধারাবাহিকতায় দুই দফা তদন্তের পর ১৯৯৮ সালে ৩ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আটজন পুলিশ সদস্যকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। আট আসামির মধ্যে মীর্জা রকিবুল হুদা, কনস্টেবল আবদুস সালাম ও বশির উদ্দিন মারা যাওয়ায় আদালত বিচারিক কার্যক্রম থেকে তাঁদের নাম বাদ দেন। বাকি পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকে।

বিচারিক আদালতে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সাংবাদিক অঞ্জন কুমার সেন, হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, শেফালী সরকার, অশোক কুমার বিশ্বাস, হাসনা বানু ও মাঈনুদ্দিনসহ ৫৩ জন সাক্ষ্য দেন। গত ১৪ জানুয়ারি সর্বশেষ ৫৩তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন অ্যাডভোকেট শম্ভুনাথ নন্দী। এরপর মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হয়। গত রবিবার রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। গতকাল ছিল আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের নির্ধারিত দিন। কিন্তু আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন না করায় আদালত দুপুরে ঘোষণা করেন, ‘বিকেল ৩টায় মামলার রায় ঘোষণা করা হবে।’ সে মোতাবেক রায় ঘোষণা করেন বিচারক মো. ইসমাইল হোসেন।

রায়ের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই দিন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল পুলিশ। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান; যা ছিল মহান আল্লাহর অশেষ রহমত। নানা কারণে মামলার কার্যক্রম শেষ করতে সময় দীর্ঘায়িত হলেও শেষ পর্যন্ত রায় হলো। রায়ের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা