kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড

১৯ বছর পর হওয়া রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও জবি প্রতিনিধি   

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড

১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভায় গুলি চালানোর দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির চারজনকে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে ভয়াবহ বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১০ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. রবিউল আলম এই রায় ঘোষণা করেছেন। ওই বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ১৯তম বার্ষিকীর দিন এই রায় ঘোষণা করা হলো। রায়ে দুই আসামিকে খালাসও দেন আদালত।

১৯ বছর পর হলেও বিচার হওয়াটা সন্তোষজনক বলে মনে করে সিপিবি। গতকাল রায় ঘোষিত হওয়ার পর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় দলের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেছেন, এ হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলের সমাবেশে প্রথম বোমা হামলা। এই জঘন্যতম বোমা হামলার বিচারের জন্য নানা বাধা-বিপত্তি পার করে দেশবাসীকে সুদীর্ঘ ১৯ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে বিচার হওয়াটা সন্তোষের বিষয়। বিচারের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

সিপিবিকে নিশ্চিহ্ন করতে জঙ্গিরা ওই হামলা চালিয়েছিল বলে বিচারক পর্যবেক্ষণ দেন। বিচারক বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার জন্য হরকাতুল জিহাদের এই জঙ্গিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত বলে এই আদালত মনে করে।’

রায়ে বিচারক বলেন, আসামিরা হুজির সদস্য এবং তাদের ধারণা, সিপিবির লোকেরা ‘কাফের, বিধর্মী, নাস্তিক, ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী নয়’। সে কারণে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে ‘নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে’ তারা ওই বোমা হামলা ঘটায়।

বিচারক আরো বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কোনো জঙ্গি সংগঠনকে বা কোনো দলকে ধর্মের নামে নিরীহ ও নির্দোষ  মানুষকে হত্যা করার অধিকার আল্লাহ দেননি। তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনের সুরা আল মায়িদাহর ৩২ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, ‘নরহত্যা কিংবা পৃথিবীতে কোনো ফ্যাসাদ সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করে, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করল।’

রায়ে বলা হয়, ‘তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত ও বিব্রত করার জন্য এই বোমা হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলেও আদালত মনে করে।’

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি সিপিবির ‘লাল পতাকা সমাবেশে’ বোমা হামলায় নিহত হয়েছিলেন পাঁচ নেতাকর্মী। আহত হয়েছিলেন আরো ২৩ জন।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী কৌঁসুলি সালাহ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন,  ‘আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট।’ তিনি বলেন, বিএনপির আমলে কোনো আসামিকে চিহ্নিত না করেই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা যায়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করে বিচার করা হয়েছে।

পিপি সালাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মামলা হিমাগার থেকে আমরা টেনে নিয়ে এসেছি। ছয়বার তদন্ত কর্মকর্তা বদলির পর সপ্তম তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্র দেন। ওই হামলায় আহত বেশ কয়েকজন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট।’

দণ্ডপ্রাপ্ত যাঁরা : দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. মইন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মইন ওরফে খাজা ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লা ওরফে মোহাম্মদ খাজা শেখ, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মো. নুর ইসলাম, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন ও আনিছুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন। দণ্ডপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) নেতাকর্মী। খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. মশিউর রহমান ও মো. রফিকুল আলম ওরফে মিরাজ। হুজিবির শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানও ছিলেন এ মামলায় অভিযুক্ত আসামি। অন্য একটি মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এ মামলার অভিযোগ থেকে।

মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে : আদালত রায়ে বলেছেন, অভিন্ন উদ্দেশ্যে ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে খুনের দায়ে প্রত্যেককে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হলো। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মতে হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হবে। আসামিরা ইচ্ছা করলে সাত দিনের মধ্যে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে মুফতি মইন, মাওলানা সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ও আরিফ হাসান সুমন কারাগারে আছেন। বাকি ছয় আসামি পলাতক রয়েছে। তাঁরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর অথবা দেশের কোনো আদালতে আত্মসমর্পন করার পর তাঁদের দণ্ড কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

কড়া নিরাপত্তায় বিচার : গতকাল রায়ের আগে কারাগারে থাকা চার আসামিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয় আদালত এলাকায়ও। রায় ঘোষণা করা হয় সকাল সাড়ে ১০টায়ই। রায় শেষে আসামিদের আবার কারাগারে ফেরত নেওয়া হয়।

গত বছর ১ ডিসেম্বর এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে রায়ের তারিখ ধার্য করেছিলেন আদালত।

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় মামলা করেছিলেন সিপিবির তখনকার সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান। এর দুই বছর পর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে আসামিদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার সঙ্গে যোগসূত্র পেয়ে ২০০৫ সালে আবার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। ১৩ বছর পর ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মৃণাল কান্তি সাহা ১৩ জন আসামি চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেন। ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

নিহত হয়েছিলেন যাঁরা : সিপিবির সমাবেশে ভযাবহ ওই বোমা হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিলেন খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মণ্ডল, রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা আব্দুল মজিদ, ঢাকার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক নেতা আবুল হাসেম, মাদারীপুরের নেতা মোক্তার হোসেন। ওই ঘটনায় আহত খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিপ্রদাস রায় ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। বোমা হামলায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা