kalerkantho

শনিবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

মতিনের দুই গোলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ৩ : ০ শ্রীলঙ্কা

সনৎ বাবলা   

২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মতিনের দুই গোলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ

বাঘের থাবায় গোল ফিরেছে। তাই ‘বাঘে-সিংহে’ লড়াইয়ে বাঘের জয়জয়কার। মতিন মিয়ার জোড়া গোলে ৩-০ গোলে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে। আগামী ২৩ জানুয়ারি তারা দ্বিতীয়  সেমিফাইনালে লড়বে বুরুন্ডির সঙ্গে।  

ফিলিস্তিন একাদশ ভেঙেচুরে লঙ্কানদের জন্য নতুন এক একাদশ সাজান জেমি ডে। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে কাটা পড়েছেন জামাল ভূঁইয়া, তাঁর জায়গায় অভিষেক হয়েছে নতুন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মানিক মোল্লার। ফ্লুতে আক্রান্ত ইয়াসিনের জায়গা নিয়েছেন রিয়াদুল হাসান। এ ছাড়া ডিফেন্ডার রাহান হাসান ও মিডফিল্ডারকে বেঞ্চে রেখে একাদশে ফেরেন বিশ্বনাথ ঘোষ ও ফরোয়ার্ড মাহবুবুর রহমান। চার বদলেই লাল-সবুজের রং বদলে গেল। তারুণ্যের ঝংকারে তাদের পায়ে ফোটে ফুটবলের ফুল। এমনকি গোলের ফুলও! এই ফুল যে সচরাচর প্রস্ফুটিত হয় না, সেখানে হয়ে গেছে ৩ গোল। জাতীয় দলের জার্সিতে জোড়া গোলে নবজন্ম হয়েছে নতুন এক স্ট্রাইকারের। তিনি মতিন মিয়া, যাঁর পায়ের ঝলকে ঘরোয়া ফুটবল মোহনীয় হলেও জাতীয় দলে ছিল না কোনো গোল। গত বছর জাতীয় দলে অভিষিক্ত বসুন্ধরা কিংসের এই স্ট্রাইকারের সেরা একাদশে এটা চতুর্থ ম্যাচ। অনেক অনিশ্চয়তায় ঘিরে থাকা বাংলাদেশের বাঁচা-মরার ম্যাচ। শুধু জিতলেই স্বাগতিকরা টিকে থাকে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে। এমন কঠিন সমীকরণের চাপ মাথায় নিয়ে সাবেক ‘রংমিস্ত্রি’ রঙে রঙে ভরিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবলকে।

সত্যি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এ ম্যাচের আগে স্বাগতিকদের খেলায় এত রং কল্পনা করা যায়নি। উল্টো ভয়ভীতি কাজ করছিল। কারণ বাংলাদেশ যে সমীকরণের হিসাব মিলিয়ে নিজেদের উত্তরণ নিশ্চিত করতে পারে না। গতকাল রবিবার আর সেই ভুল করেনি। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই স্বাগতিকদের নিয়ন্ত্রণে ম্যাচ। তাদের উৎসাহ জোগাতে মাঠে হাজির হাজার দশেক দর্শক-সমর্থক। তাদের উল্লাসে যেন আরো তেতে ওঠেন সাদ-মতিনরা। জয় ছাড়া হিসাব মেলে না বলেই যেন এ ম্যাচে কোচ একসঙ্গে খেলিয়ে দিয়েছেন সাদ, মতিন, মাহবুবুর রহমানদের। ফরমেশন বদলে কোচ ফিরেছেন ৪-৪-২-এ এবং মতিন ও মাহবুব খেলেছেন সামনের দিকে আর দুই দিকে সাদউদ্দিন ও ইব্রাহিম। মাঝমাঠে সোহেল রানার নতুন সঙ্গী মানিক মোল্লা। চট্টগ্রাম আবাহনীর এই ফুটবলার অভিষেক ম্যাচে খেলেছেন পোড় খাওয়া মিডফিল্ডারের মতো। প্রথম গোলে দিয়েছেন কারিগরি সহায়তাও। এর আগেই গোলের ঘনঘটা ছিল। দশম মিনিটে ইব্রাহিমের ক্রসে ভারত ম্যাচের গোলের নায়ক সাদউদ্দিনের হেড এবার লক্ষ্যে থাকেনি।

কিন্তু গোল ছাড়া ভালো খেলা যে অর্থহীন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে হারলেও ভালো খেলার মোড়কে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার সুযোগ ছিল। এই ম্যাচে গোল বিনা স্বস্তি খোঁজার উপায় নেই। সেমিফাইনালে উঠতে গেলে জয় লাগবেই। গোলের প্রবল চাহিদাপত্র মেনে জেমি ডে তিন ধরে ট্রেনিংয়ে গোলের প্র্যাকটিস করিয়েছেন। ১৭ মিনিটে তার সুফল পেয়েছেন হাতেনাতে। ওই মানিকের লং বলটি দারুণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মতিন এক ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে লক্ষ্য ভেদ করে গোলের হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছেন দেশের ফুটবলকে। যে গোল এত দিন সোনার হরিণ হয়ে ছিল, সেটি এত তাড়াতাড়ি ধরা দেবে, তা কেউ ভাবেনি। প্রথমবারের মতো স্বপ্নরঙিন হয়ে ওঠে স্বাগতিকরা। কয়েক মিনিট বাদে ইব্রাহিমের এক দৌড়ে ম্যাচটি পকেটে পুরে ফেলার অবস্থা! এতটা যেন বাংলাদেশকে মানায় না, তাই বুঝি ইব্রাহিম বক্সে ঢুকে ফাঁকায় থাকা মাহবুবুর রহমানকে না দিয়ে নিজেই শট নেন। মাহবুবের পায়ে দিলেই ২২ মিনিটে ২-০ গোলের লিড হয়ে যেত! ইব্রাহিম স্বার্থপর ফুটবলে তা হয়নি। এরপর এই উইঙ্গারের দৌড়ে ভীতি ছড়ালেও ফাইনাল পাসটি তাঁর মোটেও ভালো হয়নি।              

স্বাগতিকদের আগ্রাসনে শ্রীলঙ্কা সুবিধা করতে পারেনি। ফিলিস্তিনের সঙ্গে রক্ষণাত্মক ফুটবলটি তারা ভালো খেললেও কাল তাদের পায়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল মোটেও ফোটেনি। কয়েবার আক্রমণ করলেও তারা পারেনি স্বাগতিক গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলামকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে। এদিকে গোলটি ধরে রাখতে গিয়ে রক্ষণে মনোযোগী হলেও আরেকটি গোল খুঁজেছে হন্যে হয়ে। ৬৪ মিনিটে সেই গোলটিও পেয়ে যায় মতিন মিয়ার দুর্দান্ত এক কাউন্টারে। লঙ্কান ডিফেন্ডারের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে বসুন্ধরা কিংসের এই স্ট্রাইকার দৌড় শুরু করেন হাফলাইন থেকে। ছোটখাটো গড়ন, কিন্তু দৌড়ে যেন ঘোড়ার গতি। তাঁর পেছন পেছন শুধু দৌড়ে গেছেন লঙ্কান জুডে সুপান। গোলরক্ষক হেরাথ অনুরাসিরিকে ডজে ছিটকে দিয়ে মতিন অবিশ্বাস্য দ্বিতীয় গোল করে সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন। এমন গোল তাঁর নতুন নয়। এক মৌসুম আগে ঘরোয়া লিগে সাইফ স্পোর্টিংয়ের জার্সিতে ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার একে একে মুক্তিযোদ্ধার পাঁচজনকে কাটিয়ে করেছিলেন দুর্দান্ত এক গোল। সেই ঝলকে এবার ফিরেছে জাতীয় দলে, সুবাদে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তাঁর সৌরভ ছড়িয়ে ছিল ম্যাচের শেষ পর্যন্ত। এই গোল হাজার দর্শকের স্মৃতিতে থেকে যাবে অনেক দিন। এর মিনিট দশেক আগে সোহেল রানাও এমন একটি সুযোগ পেয়েও বল তুলে দেন ক্রসবারের ওপর দিয়ে। এই মিস খুব হতাশায় পোড়ায়নি। কারণ মতিনের দুই গোলের পর ৮৩ মিনিটে বদলি রাকিবের ক্রসে ইব্রাহিম ৩-০ গোলে শেষ করে দেন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি। 

গোলের যেখানে এত আকাল, সেখানে ৩-০ গোলের জয় বিশাল এক উপলক্ষ। এর মধ্যেও ছোট যন্ত্রণা হয়ে আছে তপু বর্মণের লাল কার্ড। ৯০ মিনিটে অযথা দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে এই ডিফেন্ডার নিষিদ্ধ হয়ে গেলেন সেমিফাইনালে। এই দুশ্চিন্তা এক পাশে সরিয়ে আপাতত উড়ছে নতুন বছরের লাল-সবুজের প্রথম জয়ের রং মশাল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা