kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন

শিক্ষায় যত পিছিয়ে সম্পদে তত এগিয়ে

লায়েকুজ্জামান ও জহিরুল ইসলাম   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিক্ষায় যত পিছিয়ে সম্পদে তত এগিয়ে

সব কিছু ঠিক থাকলে ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিধান অনুসারে কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরাও তাঁদের হলফনামায় ব্যক্তিগত তথ্য, আয়-ব্যয়, সম্পদ, মামলা ইত্যাদির বিবরণ দিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে সাধারণ কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৩১৫ জন, আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) জমা দিয়েছেন ২৫১ জন। ওই প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম, তাঁদের সম্পদ এবং মামলার সংখ্যা বেশি। আর যেসব প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি তাঁদের সম্পদ এবং মামলার সংখ্যাও কম। তবে ডিএনসিসিতে কয়েকজন শিক্ষিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই সিটিতেই উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী যথেষ্ট কম। সর্বাধিক প্রার্থী তাঁদের হলফনামায় নিজেদের ‘স্বশিক্ষিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ডিএসসিসির প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ৩১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে স্বশিক্ষিত হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন ৮৯ জন। হলফনামায় পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পাস হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন ৪৯ জন, এসএসসি পাস উল্লেখ করেছেন ৫৮ জন, এইচএসসি পাস দেখিয়েছেন ৪৫ জন, বিএ, বিএসএস ও বিএসসি সম্মানসহ পাস ৩৫ জন, এমএ, এলএলএমসহ সমমান পাস ২১ জন। মাত্র একজন প্রার্থী রয়েছেন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। দুজন প্রার্থী হলনামায় উল্লেখ করেছেন তাঁদের কোনো শিক্ষা নেই। ১৬ জন প্রার্থী বলেছেন তাঁরা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। একজন প্রার্থী রয়েছেন কোরআনে হাফেজ, একজন ইউনানি পাস, একজন অটোমোবাইল কোর্সে ডিপ্লোমা, একজন কম্পিউটার কোর্সে ডিপ্লোমা, একজন দাওরায়ে হাদিস পাস। পাঁচজন প্রার্থীর হলফনামায় কোনো তথ্য নেই।

ডিএনসিসির সাধারণ কাউন্সিলর পদে সর্বমোট ২৫১ প্রার্থীর মধ্যে স্বশিক্ষিত ৭৮ জন, পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণি পাস ৩৬ জন, এসএসসি পাস ৩০ জন, এইচএসসি পাস ৩২ জন। বিএ থেকে এমএ পাস ৫৯ জন, অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ১১ জন। পাঁচজন প্রার্থীর হলফনামায় শিক্ষাসংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।

হলফনামার তথ্যানুসারে দুই সিটি করপোরেশনেই বিএ ও এমএ পাস প্রার্থীর সংখ্যা যথেষ্ট কম। বেশির ভাগ প্রার্থী অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন এবং এইচএসসি পাস। দুই সিটিতে মোট প্রার্থী ৫৮৬ জন। এর মধ্যে বিএ ও এমএ পাস ১১৫ জন। বাকি ৪৭১ প্রার্থী অক্ষরজ্ঞান থেকে এইচএসসি পাস। স্বশিক্ষিত এবং অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন, এসএসসি, এইচএসসি পাস ৪৭১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭১ জনের ঢাকায় বাড়ি বা ফ্ল্যাট নেই। বাকি ৪০০ জনেরই ঢাকায় বাড়ি বা ফ্ল্যাট রয়েছে। বার্ষিক আয়ের দিক থেকেও তাঁরা এগিয়ে।

তাঁদের সবার পেশা ব্যবসা।

ডিএসসিসির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী হয়েছেন মাহমুদা ফেরদৌস। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ এলএলবি। হলফনামায় দেওয়া তথ্যানুসারে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ৩৭ লাখ টাকা। একই সিটির ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী আকাশ কুমার ভৌমিক নিজেকে স্বশিক্ষিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন হলফনামায়। তাঁর রয়েছে বিপুল বিত্ত। আওয়ামী লীগের সমর্থনে তিনি নির্বাচন করছেন। বর্তমানেও তিনি কাউন্সিলর। হলফনামায় দেওয়া তথ্যানুসারে তাঁর বার্ষিক আয় সাত কোটি ৮৯ লাখ ৫৪ হাজার ২৯০ টাকা। আর স্ত্রীর বার্ষিক আয় ১০ কোটি পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৭ টাকা। দুজনের বার্ষিক আয় ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৬৭ টাকা। তাঁর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ আট কোটি ৫৩ লাখ দুই হাজার ৯৮৮ টাকা। আর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ সাত কোটি ৪৫ লাখ পাঁচ হাজার ৩৯৭ টাকা। দুজনের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১৫ কোটি ৯৮ লাখ আট হাজার ৩৮৫ টাকা। এ ছাড়া ভৌমিকের নিজের নামে স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১১ কোটি ৭১ লাখ ৩০ হাজার ৫৪০ টাকার, আর স্ত্রীর নামে ১০ কোটি ৭১ লাখ চার হাজার ৬১০ টাকার। দুজনের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২২ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার ১৫০ টাকা।

ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী পিএইচডি ডিগ্রিধারী ওমর বিন আব্দাল আজিজ। বর্তমানেও তিনি কাউন্সিলর। হলফনামা অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক আয় চার লাখ ৩০ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নিজের নামে ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ৩০ টাকা, স্ত্রীর নামে ৮২ লাখ ৩৬ হাজার ২৮০ টাকা। আজিজের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ নিজের নামে ১৫ কাঠা জমি ও একটি দোকান, ২.৯৮ শতাংশ এবং ৮.২৯ শতাংশের দুটি ভবনের উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক। স্ত্রীর নামে রয়েছে ১.১৪ অংশ দোকান ও পাঁচতলা একটি ভবনের কিছু অংশের মালিকানা।

ডিএসসিসির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের জুবায়েদ আদেল উচ্চ মাধ্যমিক পাস। এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় ২০ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। স্ত্রীর আয় ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। হলফনামায় স্থাবর সম্পদের উল্লেখ না থাকলেও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে দুই কোটি ৬৯ হাজার ৭০ টাকা।

একই সিটিতে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী হয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম বাবুল। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি। তাঁর বার্ষিক আয় ৯৪ লাখ ৭৪ হাজার ৮৯৭ টাকা। অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ৩০৯ টাকা, স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছয় কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার ৬৮৯ টাকা। এ ছাড়া একটি ১০ তলা ভবনের বেশির ভাগ অংশের মালিক তিনি।

ডিএনসিসির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মো. তাজুল ইসলাম দেওয়ান। হলফনামার তথ্যানুসারে তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস। তাঁর বার্ষিক আয় ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ১০০ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নিজের নামে রয়েছে ২২ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, স্ত্রীর নামে রয়েছে ৫৭ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে মিরপুরে পাঁচটি দোকান, ছয়তলা একটি বাড়ি।

ডিএনসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মো. তফাজ্জল হোসেন টেনু এইচএসসি পাস। তাঁর বার্ষিক আয় তিন কোটি ৬৭ লাখ ৩৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। নিজের নামে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১৫ লাখ টাকা, আর স্ত্রীর নামে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে সাভারে ১০ কাঠা জমি, ২.৫ কাঠার ওপর একটি বাড়ি, ৮১৩ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট।

একই ওয়ার্ডের আরেক প্রার্থী মো. ইয়াকুব মিয়া অষ্টম শ্রেণি পাস। তাঁর বার্ষিক আয় ৯৭ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৪ টাকা। নিজের নামে অস্থাবর সম্পদের মূল্য এক কোটি ৩৬ লাখ সাত হাজার ৬৫ টাকা। স্থাবর সম্পদ ১.৭৫ কাঠার ওপর নির্মিত একটি বাড়ি।

ডিএনসিসির ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মোকছেদ আলী মোল্লা মুকসু বিএ পান। হলফনামায় তাঁর বার্ষিক আয় দুই লাখ ৯৭ হাজার ৮৫০ টাকা। নিজের নামে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা। স্ত্রীর নামে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নিজের নামে ১.২৫ কাঠা অকৃষি জমি এবং স্ত্রীর নামে একই পরিমাণ অকৃষি জমি।

৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী খন্দকার হামিদুল হক। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ পাস। এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নিজের নামে তিন লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা রয়েছে। এই কাউন্সিলর প্রার্থীর স্থাবর সম্পদ বলতে কিছু নেই।

ডিএনসিসির ২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন। স্বশিক্ষিত। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ২৩টি। বার্ষিক আয় তিন কোটি টাকা। অস্থাবর সম্পদ ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদের বিবরণ হলফনামায় নেই।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা