kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

নিয়োগপত্রহীনতায় বেপরোয়া চালক

পার্থ সারথি দাস   

১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিয়োগপত্রহীনতায় বেপরোয়া চালক

দেশে অন্তত ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিকের নিয়োগপত্র নেই। চালকের ভুয়া নিয়োগপত্র দেখিয়ে গাড়ির রুট পারমিট নেওয়া হলেও বেশির ভাগ গাড়ির মালিকই নিয়োগপত্র দিচ্ছেন না চালকদের। ফলে দেশে কমপক্ষে ২৫ লাখ পেশাদার গাড়িচালক নিয়োগপত্র ছাড়া গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। গাড়িচালকরা বলছেন, নিয়োগপত্র ও বিধি অনুসারে বেতন-ভাতা না দিয়ে গাড়ির মালিকরা তাঁদের বেশি ট্রিপ দিতে বাধ্য করছেন। ফলে গতিসীমাসহ সড়কের আইন পুরোপুরি মানা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

চালকদের দাবি, চাকরি রক্ষার জন্যই তাঁরা মালিকদের নির্দেশ মেনে আসছেন। ফলে সড়ক ও মহাসড়কে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, দুর্ঘটনাও বেড়েছে।

জানা যায়, ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ, ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এ নিয়োগপত্র দেওয়ার বিধান থাকলেও বেসরকারি পরিবহন মালিকরা অতি মুনাফার লোভে চালকদের নিয়োগপত্র দিচ্ছেন না।

বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের মধ্যে ২০১৯ সালেই সড়কে দুর্ঘটনার হার ছিল সর্বোচ্চ। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ বেপরোয়া গতি।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়োগপত্র না দিয়ে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে বেশি মুনাফা লাভের পথটি খোলা রাখছেন মালিকরা। যেখানে আট ঘণ্টা শ্রম দিতে হয়, সেখানে কোনো চালক না ঘুমিয়ে টানা দুই দিনও গাড়ি চালাচ্ছেন। তাতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ গতিসীমা না মেনে গাড়ি চালানো। এ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের নিয়োগপত্র থাকছে না। নিয়োগপত্র না থাকায় সড়কে বিশৃঙ্খলা আরো বাড়ছে। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, চালক নিয়োগ করেও নিয়োগপত্র না দেওয়ার বড় কারণ তাঁদের ইচ্ছামতো (মালিকের) ব্যবহার করা।

২০০৯ সালে প্রকাশিত টিআইবির জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ৯৬ শতাংশ চালক নিয়োগপত্র পাননি। গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গাড়িচালকদের কাছে নিয়োগপত্র দেখতে চেয়েও পাওয়া যায়নি। অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানান পরিবহন শ্রমিক নেতা ওসমান আলী। তিনি বলেন, ‘১৯৮০ সালে এসংক্রান্ত আইন হওয়ার পরও চালকরা নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না।’ তিনি জানান, দেশে অন্তত ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিকের নিয়োগপত্র নেই। এর মধ্যে চালক ছাড়াও আছেন হেলপার, কন্ডাক্টর এবং অন্যান্য পরিবহন শ্রমিক।

কেন নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না—জানতে চাইলে কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক নেতা বলেন, আইন মেনে নিয়োগপত্র দিলে নিয়মিত মাসিক মূল বেতন ছাড়াও উৎসব বোনাস, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, এসব সুবিধা দিতে হবে মালিকদের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া সার্ভিস বুক সংরক্ষণ করতে হবে শ্রমিকদের। কোনো অনিয়ম হলে তা দেখিয়ে আইনি ব্যবস্থায় যেতে পারবেন শ্রমিকরা। এসব কারণে মালিকরা নিয়োগপত্র দেন না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্ল্যাহ অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাড়িচালকদের আমরা নিয়োগপত্র দিতে চাই; কিন্তু তারা নিতে চায় না। ৮০ শতাংশ পরিবহন শ্রমিকই অস্থায়ী। ৯৫ শতাংশ গাড়িই চলছে দৈনিক চুক্তিতে। আমরা দূরপাল্লার এসি বাসে মাসিক ভিত্তিতে চালক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’ 

জানা গেছে, চালকদের নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক করতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দিতে মালিক নেতাদের ধারাবাহিকভাবে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শিল্পে নিয়োজিত কর্মীদের ন্যূনতম মজুরিও চূড়ান্ত করেছে এসংক্রান্ত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড। ওই বোর্ডের সাত সদস্যের একজন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইনসুর আলী কালের কণ্ঠকে জানান, গত ১২ ডিসেম্বর বোর্ডের সর্বশেষ সভায় প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে শ্রম অধিদপ্তর পরিবহন মালিক সংগঠনকে নিয়োগপত্র প্রদানের অনুরোধ জানিয়ে চিঠিও দিয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি শ্রম বিভাগকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মালিক ও শ্রমিকপক্ষকে চিঠি দেওয়ার সুপারিশ করেছিল গত নভেম্বরে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিবহন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির বিষয়ে এখন শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করা বাকি। গাড়িচালকদের নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে শ্রম অধিদপ্তর পরিবহন মালিকদের সংগঠনগুলোকে এরই মধ্যে চিঠি দিয়েছে। সর্বশেষ গত ১২ ডিসেম্বর ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সভায় চালকসহ অন্য পরিবহন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর মোটরযান শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি তিনবার নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০১০ সালে নির্ধারণের পরও মালিকপক্ষ তা বাস্তবায়ন করেনি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন এসংক্রান্ত মজুরি বোর্ড মোটরযান চালকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে সাত হাজার টাকা বাড়িয়ে ২০ হাজার ১০০ টাকা করার নতুন প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে।

নিয়োগপত্র ছাড়া কাউকে মোটরযানে শ্রমিক নিযুক্ত করার সুযোগ নেই আইনে। অভিযোগ আছে, মোটর মালিক ও কম্পানি ভুয়া নিয়োগপত্র বিআরটিএতে জমা দিয়ে গাড়ির রুট পারমিট নিয়ে আসছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন কালের কণ্ঠকে জানান, বিআরটিএ কার্যালয়ের আশপাশে অবস্থান করা দালালদের কাছে অবৈধ সিল-স্বাক্ষরসহ চালকের নিয়োগপত্রসংক্রান্ত নথি পাওয়া যায়। ওই নথি সংগ্রহ করে বিআরটিএর কার্যালয় থেকে গাড়ির রুট পারমিট নিচ্ছেন মালিকরা।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, নিয়োগপত্র বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি নতুন সড়ক পরিবহন আইনে। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও ততটা সুরক্ষিত হয়নি। যেটুকু আছে তাও বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করার ব্যবস্থা না থাকায় মালিকরা আইন মানছেন না।

মালিকপক্ষ মনে করে, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো সমস্যা হলে তার দায় মালিকপক্ষের ওপর বর্তাবে। শ্রমিকরা ঘন ঘন কম্পানি বা পরিবহন পরিবর্তন করায় নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক কণ্ঠকে বলেন, ‘বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে ছুটি উপভোগের সুযোগ ও অতিরিক্ত কাজের জন্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়েও গাড়ি চালাতে বাধ্য হই আমরা।’

নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে গত নভেম্বরে। এসংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গত ২৬ নভেম্বর গাড়িচালক ও হেলপারদের নিয়োগপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মালিকপক্ষ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা