kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সক্রিয় শতাধিক মাদক কারবারি

এস এম আজাদ   

১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সক্রিয় শতাধিক মাদক কারবারি

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকায় নির্বিঘ্নে চলছে মাদক কারবার। বিশেষ অভিযান শুরুর পর চিহ্নিত স্পটগুলোয় প্রকাশ্যে বিক্রি কমলেও কৌশল পাল্টে নিয়েছে কারবারিরা। সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে কারবারিরা পুরনো মাদক স্পট এড়িয়ে এলাকায় ঘুরে ঘুরে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল বিক্রি করছে। এমন অন্তত দুই ডজন এলাকায় সক্রিয় শতাধিক মাদক বিক্রেতা ও তাঁদের মদদদাতা। রাজনৈতিক দলের নেতা, কাউন্সিলর প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ কর্মী, পুলিশের আশপাশে থাকা সোর্সরাই এই মাদক কারবারে যুক্ত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৩ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এসব মাদক স্পট। স্থানীয়রা বলছেন, সাবেক কাউন্সিলরসহ অনেকের আশপাশেই দেখা যায় এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারিদের। এই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এমন জনপ্রতিনিধি চান তাঁরা আসছে সিটি নির্বাচনে।

গত এক সপ্তাহ পল্লবী এলাকা ঘুরে জানা গেছে, বাউনিয়াবাদ এ-ব্লক থেকে সি-ব্লক পর্যন্ত, লালমাটিয়া, ১১ নম্বর সেকশন, মিল্লাত ক্যাম্প, পলাশনগর, বাউনিয়াবাদ বাজার, বালুর মাঠ, আইডিয়াল কলেজ, বেড়িবাঁধ, কালশী কলাবাগান, উত্তর কালশীর সিরামিক, টেকেরবাড়ী, কালাপানি, ডি-ব্লক ঈদগাহ মাঠ, কালশী কবরস্থানের পাশসহ দুই ডজন এলাকায় চলছে মাদক কারবার। এসব স্থানে আগে প্রকাশ্যে মাদক কারবার চললেও বর্তমানে সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ পদ্ধতিতে বিক্রি করা হচ্ছে। আব্দুর রহিম ও সোহাগ নামে দুই মাদকসেবী কালের কণ্ঠকে জানান, অভিযানের কারণে মাদক কারবারিরা কৌশল পাল্টে বর্তমানে মাদক বিক্রি করছেন। নতুন ক্রেতা গেলে বুঝেশুনে তাঁরা ইয়াবা বিক্রি করছেন।

ডিএনসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর আব্দুর রউফ নান্নু। মিল্লাত ক্যাম্পের বড় মাদকের ডিলার মোস্তাক ও তাঁর ছেলে মিনিস্টারকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। মাদক কারবারিদের তালিকায় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে তাঁর নাম। মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলে বেশ কিছুদিন গাঢাকাও দিয়েছিলেন তিনি। ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকে মোস্তাক ও মিনিস্টার এখনো তাঁদের সহযোগীদের দিয়ে মাদক কারবার অব্যাহত রেখেছেন। তাঁদের অন্যতম সহযোগী কিশোর সাকলাইন। মাদক কারবারিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করছেন আব্দুর রউফ নান্নু। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এটা মিথ্যা বলেই আমি দলের মনোনয়ন পেয়েছি। জনগণ আমার সম্পর্কে জানে। আমি মাদকের বিরুদ্ধে।’

১১ নম্বর সেকশন ও মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আড়ালে-আবডালে চলছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজার কারবার। বি-ব্লকের কাল্লু গোটা এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন ইয়াবা। মিল্লাত ক্যাম্পের বি-ব্লকের ২২ নম্বর লাইনে খলিল সরদারের ছেলে রুস্তম ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন বিক্রি করেন। একই এলাকায় ইসলামের স্ত্রী জমিলা, কলিমের স্ত্রী কালি, রুস্তমের ভাই আক্তার, মাহাবুবের স্ত্রী গোলাপী, আলী আহমেদের ছেলে সেলিম মাদক বিক্রি করছেন। মিল্লাত ক্যাম্পে মাদক কারবারে আরো যাঁরা জড়িত তাঁরা হলেন—জুম্মন, তাঁর শাশুড়ি শভ্য, শ্বশুর কামাল, কলিম-সেলিম দুই ভাই, ইউনুস, আলী, আরজু, নাদিম, রাজ্জাকের স্ত্রী গুড়িয়া, দুলালের স্ত্রী শাম্মী, বি-ব্লকের ৪ নম্বর লাইনের রুস্তম, ফয়সালের স্ত্রী সায়মা, মহরমের ছেলে জাহাঙ্গীর, নিমতলী বাজারের রহমান বস্তির আরমান ও তাঁর স্ত্রী ফতেহ, আক্কু সোহেল, ঘাড়কাটা খোরশেদ, ২৩ নম্বর লাইনের সানা, বাদল, লালমতি, রতন, বাবু, আবিদ, ইমু, রামুদা ক্যাম্পের নাদিম, ঝুটপট্টির ন্যাটা জুম্মন, ২৭ লাইনের সোর্স রাজীব, রানা, সোর্স ফরহাদ, সোর্স জুলফিকার, মুন্না, ওয়াবদা ভবনের ফয়সাল, শাহনেওয়াজ, সালাউদ্দিন, আলাউদ্দিন, আসলাম, ১০ নম্বর মুসলিম ক্যাম্পে বাস্তুহারা মুন্না, এডিসি হিজড়া বাবর, ন্যাংড়া রুবেল, ফিরোজ, আবিদ, ১১ নম্বর সেকশনের ডুইপ প্লটে ফজলু, জামাই হাফিজ ও মারুফ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিল্লাত ক্যাম্পে আগে পরিচিত মাদক ক্রেতাদের দেখলে এগিয়ে আসতেন বিক্রেতারা। এখন ফোনে যোগাযোগ করে ক্যাম্পের বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে। দুপুর ও সন্ধ্যার পর ফেনসিডিল ও ইয়াবা সেবন এখন কম দেখা যায়। তবে বিক্রি চলছে।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শনগরে গিয়ে জানা গেছে, ডুইপ প্লট থেকে লালমাটিয়া এলাকায় অনিক, বাউনিয়াবাঁধের ডি-ব্লকে পুলিশের সোর্স শান্ত, ইউসুফ, চোরা স্বপন ও তাঁর দুই ছেলে হারুন ও স্বপন মাদক কারবার চালাচ্ছেন। এ-ব্লকে পুলিশের সোর্স আরিফ, মালিন, লভা, রানা, ফারুক, রকি, টুটুল, সুমন, মাওরা সিরাজ, আকরাম, আকতার, এমপি ফয়সাল, পোড়াবস্তিতে আবু কালাম, জনি, রাশেদ, আলদী, মুন্না, সোহাগ, রফিক, জসি, বি-ব্লকে মামুন, লম্বা ফারুক, ডাকু রমজান, বাউনিয়াবাঁধের কলাপট্টির সুলাইমানের স্ত্রী টুম্পা, কাশেম, ইসমাইল, বাবুলের স্ত্রী পাখি, ২৪ নম্বর লাইনে চোরা আমির, ইদ্রিসের ছেলে পাতা সোহেল, সেলিম, ফর্মা রাজিব, ১৫ নম্বর লাইনে মজনু, ১ নম্বর রোডে রুবেল, বাবু, সোর্স সোলাইমান, লিটন, জনি, ৩ নম্বর লাইনে শামীম, মিজান, ১৪ নম্বর লাইনে মান্নান, সোহেল, ১৩ নম্বর  লাইনে মেহেদি, মুরগি রনি, সাইফুল, ১০ নম্বরে পিন্টু, শাওন, ২ নম্বরে কানুল, সালাম, ১ নম্বরে মাসুদ রানা ইয়াবা কারবার করছেন। বাউনিয়াবাঁধের আইডিয়াল স্কুলের সামনে লিটন এবং কালোমন্দির এলাকায় যুবলীগকর্মী জমির ও তার চাচাতো ভাই স্বপন, পলাশনগরের এক পাশে তালিমনগরের কালা মান্নান ও হান্নান দুই ভাই মাদক কারবার করছেন।

৫ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী যুবলীগের পল্লবী থানার সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা। নিজে মাদকের বিরুদ্ধে সব সময়ই সোচ্চার থাকলেও পলাশনগরের পশ্চিম পাশে লালমাটিয়ায় তাঁর স্ত্রীর বড় ভাই জয়নাল চেয়ারম্যানের ছেলে রিয়াজ মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জুয়েল রানা বলেন, ‘আমার আশপাশে মাদকের সঙ্গে জড়িত কোনো লোক নেই। আমি নির্বাচিত হলে এ ওয়ার্ডটিকে মাদকমুক্ত ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তুলব।’

উত্তর কালশীর হিন্দুপাড়ার সূত্রগুলো জানায়, সেখানকার আশানন্দ সরকার জামিনে ছাড়া পেয়ে ডিওএইচএস পর্যন্ত ইয়াবা ও গাঁজার কারবার করছেন। ঘাটিপাড়া বস্তিতে সেলিম, বুড়িরটেক, সাগুপ্তা এলাকায় আশরাফ উদ্দিন, ইদ্রিসেরটেকে যুবলীগকর্মী রুবেলের নামে কারবার চলছে। ইদ্রিসেরটেকে খলিলের হোটেলের গলি, ডিওএইচএস গেটে ময়লার স্তূপের পাশে, ঘাটিপাড়ার পকেটগেট, উত্তর কালশী কবরস্থান এলাকায়ও কেনাবেচা চলছে মাদক। তুষার, শুভ, খোকন শীল, সুজন, মিরাজ ও রনি এসব এলাকায় মাদক বিক্রি করে।

১২ ডি ও ত-ব্লকে ইব্রাহিম (কালীর ছেলে) ও সুমন, রানা, মাহাবুব, ছাত্রলীগকর্মী সুমনের ভাই বাবু, চোরা সেলিমের ভাই সাগর, স্কুল মোড়াপাড়া ক্যাম্পের করিম, টেকেরবাড়ীর বাদল ও সাজ্জাদ মাদকের কারবার করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মাদক কারবারিদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আর এঁদের অধিকাংশ পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি।

জানতে চাইলে পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন তেমন মাদক কারবার নেই। স্পটও নেই। ফাঁকফোকরে মোবাইলে কিছু হতে পারে। তবে আমরা খবর পেলেই অভিযান চালাই।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মিরপুর সার্কেলের পরিদর্শক খন্দকার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তার পরও মামলা করার চেষ্টা করছি। পল্লবীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আমাদের নজরদারি অব্যাহত আছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা