kalerkantho

সোমবার । ১১ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বঙ্গবন্ধু বিপিএল

ফাইনালে আছে শক্তির সঙ্গে ব্যাকরণের লড়াইও

মাসুদ পারভেজ   

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফাইনালে আছে শক্তির সঙ্গে ব্যাকরণের লড়াইও

আজ ট্রফিটা কার হাতে উঠবে, মুশফিকুর রহিমের, না আন্দ্রে রাসেলের? বঙ্গবন্ধু বিপিএলের ফাইনালের আগে ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠানে খুলনা টাইগার্স ও রাজশাহী রয়ালস অধিনায়ক। ছবি : মীর ফরিদ

জিমে তাঁর ওয়েট ট্রেনিং একটু অন্য রকমই। সামনের পা বাড়িয়ে লং অন আর মিড উইকেটের মাঝখান দিয়ে বিশাল যেসব ছক্কা মারেন, একই ভঙ্গিমায় জিমেও শ্যাডো করেন আন্দ্রে রাসেল। পার্থক্য হলো তখন হাতে ব্যাটের জায়গায় থাকে অলিম্পিক বার (লোহার দণ্ড), যার বাঁ প্রান্তে লাগানো থাকে আয়রন প্লেট। ইনস্টাগ্রামে সেই ভিডিও আপলোড দিতেই ও রকম শটে এই জ্যামাইকানের শক্তির উৎসও অজানা নেই কারো।

মুশফিকুর রহিম তাঁর মতো সুঠামদেহী কিছুতেই নন। বরং গতকাল দুপুরে বঙ্গবন্ধু বিপিএলের ট্রফি নিয়ে ফটোসেশনেও রাজশাহী রয়ালস অধিনায়ক রাসেলের তুলনায় ভীষণ ছোটখাটোই দেখাল তাঁকে। তা দেখালেও দিনের পর দিন নিবেদন আর পরিশ্রমে ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে খুলনা টাইগার্স অধিনায়কের শটের ভাঁড়ারও কম সমৃদ্ধ নয়। লিগ পর্বে রাজশাহীর বিপক্ষেই ৯৬ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলার পথে বৈচিত্র্যময় শটের পসরাও সাজিয়ে বসেছিলেন। এরপর নিজ দলের কোচ জেমস ফস্টারের কাছ থেকে ‘৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটসম্যান’-এর সার্টিফিকেটও পাওয়া হয়ে যায় মুশফিকের।

যা এতকাল শুধু এবি ডি ভিলিয়ার্সকেই বলে আসা হয়েছে। অবশ্য এ রকম প্রশংসায় ভেসে যেতে অনাগ্রহী মুশফিক নিজের কাজটি ঠিকঠাকই করে এসেছেন এই আসরে। কুমিল্লা ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষেও অপরাজিত ৯৮ রানের ইনিংসে আরেকবার পুড়েছেন সেঞ্চুরি বঞ্চনায়। তাই বলে ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তির বুদবুদও তেমন ওঠার কারণ নেই। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৪৭০ রান তাঁরই। ঘুচেছে বিপিএলের ফাইনাল খেলতে না পারার অতৃপ্তিও। এবার চোখ শুধু প্রথম শিরোপায়। সেটিতে হাত ছোঁয়ানোর পথে মূল বাধা হতে পারেন যিনি, তাঁর সঙ্গেই তো বিপিএলের সোনালি ট্রফি নিয়ে ছবি তুললেন কাল। আজ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হতে যাওয়া ফাইনালে টসও করবেন তাঁর সঙ্গেই—সেই বিধ্বংসী আন্দ্রে রাসেল।

যাঁর ব্যাটে গত পরশু রাতে ধ্বংস হয়েছে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স। অথচ রাজশাহীর হারকে একসময় কেবলই সময়ের ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে। সেখান থেকে ব্যাট হাতে বিশাল সব ছক্কায় উল্টো প্রতিপক্ষের হারের নিয়তি লিখেছেন রাসেল। তাঁর মতো শক্তিমানের দিকে তাই ফাইনালেও তাকিয়ে থাকবে রাজশাহী। আবার মুশফিকও দেখিয়েছেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শক্তি ছাড়াও ম্যাচ জেতানো যায়। ক্রিকেট ব্যাকরণ মানা শুদ্ধ ব্যাটিংয়েও যে জয়ের সৌরভ ছড়ানো যায়, ক্রিকেটীয় দক্ষতা দিয়েই যে একের পর এক বাধা পার হওয়া সম্ভব, এই মুহূর্তে মুশফিকই হয়ে আছেন এর সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ।

শক্তি আর ব্যাকরণে বিপরীতমুখী ব্যাটিংয়ের দুই ম্যাচ উইনার আজ ফাইনালে মুখোমুখি আরেকবার। আজকের ফাইনালে দুই দলের মোড়ক আছে যদিও, তার ভেতরেও রেখে দিয়েছে আরেকটি লড়াই। সে লড়াই শক্তি আর ব্যাকরণেরও। তাই এটি শুধুই খুলনা টাইগার্স-রাজশাহী রয়ালসের লড়াই নয়, মুশফিক-রাসেলেরও। প্রথমজন টুর্নামেন্টজুড়েই আলো ছড়িয়েছেন। অন্যজন একটু দেরিতে হলেও আসল সময়ে ডানা মেলেছেন। ফাইনালে দুই দলেরই লক্ষ্য থাকবে প্রতিপক্ষের ভারবাহী ডানা দুটি দ্রুত ছেঁটে ফেলার।

যেটিই ছেঁটে ফেলা হোক না কেন, এই বঙ্গবন্ধু বিপিএলের ফাইনাল বিশেষ এক উপহারও পেতে চলেছে। খুলনা কিংবা রাজশাহী, যে-ই জিতুক, সপ্তম আসরে ঘরোয়া এই টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা খুঁজে পাবে নতুন চ্যাম্পিয়ন। আগের ছয় আসরে তিনবার জিতেছে ঢাকা, দুবার কুমিল্লা এবং রংপুর একবার। ২০১৬-র আসরে ড্যারেন সামির নেতৃত্বাধীন রাজশাহী ফাইনালে উঠলেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। আর খুলনারও এর আগে কখনো ফাইনালে খেলা হয়নি। এবার মুশফিকের নেতৃত্বে তারা ফাইনালে, প্রথম শিরোপার হাতছানি। একই সঙ্গে মুশফিকের সামনেও সুযোগ অধরা ট্রফিটা তুলে ধরে দলীয় উল্লাসের মধ্যমণি হওয়ার।

আবার শেষ পর্যন্ত এটি দলীয় খেলাও। এখানে জেতানো কারো একার ভারও নয়। অবশ্য সেই ভার বইতে জানা একাধিক পারফরমারও আছেন দুই দলে। বিশেষ করে টুর্নামেন্টসেরা ব্যাটসম্যান হওয়ার লড়াইয়ে মুশফিকের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন তাঁর নিজের দলেই—রাইলি রুশো (৪৫৮ রান)। একই দৌড়ে শামিল রাজশাহীর শোয়েব মালিক (৪৪৬ রান) ব্যাটিংয়ে সেরাদের তালিকার তিন নম্বরে। কে জানে যে ছয় নম্বরে থাকা একই দলের লিটন কুমার দাসও (৪৩০ রান) ফাইনাল দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যাবেন না! আবার রাসেলের মতোই একটু দেরিতে পারফরম করতে শুরু করা খুলনার ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্তরও ক্ষমতা আছে ম্যাচ ভাগ্য ঘুরিয়ে দেওয়ার। শেষ দুই ম্যাচে তাঁর স্কোর সেই সক্ষমতার জানানই দিচ্ছে—১১৫* ও ৭৮*। বল হাতেও সেরা পাঁচে আছেন খুলনার রবি ফ্রাইলিংক ও মোহাম্মদ আমির। পরেরজন তো প্রথম কোয়ালিফায়ারে রাজশাহীকে একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন ১৭ রানে ৬ উইকেট নিয়ে; যা বিপিএল ইতিহাসের সেরা বোলিংও।

নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে তাই একের ভেতরে থাকছে বহুমুখী লড়াইও, যার একটি শক্তি আর ব্যাকরণেরও!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা