kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

‘সোনার হরিণ’ বিসিএসে ঝোঁক বাড়ছে

৮ বছরে প্রার্থী বেড়ে আড়াই গুণ ► সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়াকে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে

শরীফুল আলম সুমন   

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সোনার হরিণ’ বিসিএসে ঝোঁক বাড়ছে

বিসিএসে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে ব্যাপকভাবে। গত ৯ বছরে ১০টি বিসিএসে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে আড়াই গুণ। বিশেষ করে, গত তিন বছরে এই আগ্রহ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ফলে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হচ্ছে প্রার্থীদের। তদবির ছাড়া চাকরি পাওয়া এবং সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা অনেক বাড়াই এ আগ্রহের মূল কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অধিকসংখ্যক প্রার্থীকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করাটাকে অনেকটা বোনাস বা বাড়তি পাওয়া হিসেবে দেখছেন প্রার্থীরা।

সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সূত্রে জানা যায়, ৪১তম বিসিএস পরীক্ষায় আবেদনের সময়সীমা শেষ হয়েছে গত ৪ জানুয়ারি। এবার বিসিএসের ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। এর আগে ৪০তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন চার লাখ ১২ হাজার ৫৩২ প্রার্থী। তবে পিএসসি শুধু চিকিৎসকদের জন্য আয়োজন করেছিল ৩৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার। সেখানেও ৩৭ হাজার ৭১৩ জন আবেদন করেছিলেন। ৩৮তম বিসিএসে আবেদন ছিল তিন লাখ ৪৬ হাজার ৪৪৬টি। ৩৭তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন দুই লাখ ৪৩ হাজার ৪৭৬ জন। এ ছাড়া ৩৬তম বিসিএসে দুই লাখ ১১ হাজার ৩২৬ জন, ৩৫তম বিসিএসে দুই লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন, ৩৪তম বিসিএসে দুই লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন এবং ২০১২ সালের ৩৩তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন এক লাখ ৯৩ হাজার ৫৯ জন। আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩২তম ছিল বিশেষ বিসিএস। সেবার আবেদন করেছিলেন ২৬ হাজার ৪৩৭ জন।

জানা যায়, গত আট বছরে দুটি বিশেষ বিসিএসসহ ১০টি বিসিএস পরীক্ষা হয়েছে। মূলত ৩৮তম বিসিএস অর্থাৎ ২০১৭ সাল থেকেই বিসিএসে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ৩৭তম বিসিএস থেকে ৩৮তম বিসিএসে প্রার্থীর সংখ্যা এক লাখেরও বেশি বাড়ে। এরপর প্রতি বিসিএসেই প্রায় এক লাখ করে বেড়ে গত বছরের ৪১তম বিসিএসে তা প্রায় পৌনে পাঁচ লাখে পৌঁছে। এবার প্রতিটি পদের জন্য প্রায় ২২২ জন প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।

বিসিএসে তরুণদের আগ্রহ বাড়ার বিষয়ে পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার পিএসসিকে স্বাধীনতা দিয়েছে। এর ফলে তদবির ছাড়া চাকরি পাওয়া যায়। এখন যদি কারো মেধা থাকে, তাহলে তিনি ক্যাডার পদে চাকরি পেতে পারেন। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে আগের চেয়ে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেড়েছে। বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে যাঁরা ক্যাডার পদ পাবেন না, তাঁদের জন্য নন-ক্যাডারে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান কমিশন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে। এমনকি পিএসসিতে চাকরিরত কেউ যদি বিসিএস পরীক্ষা দেন, তাহলে তাঁকেও কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হয় না। একজন সাধারণ প্রার্থীর মতোই একই সুযোগ পান তিনি। ফলে সব মিলিয়েই বিসিএসের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বেড়েছে।’

জানা যায়, আগেও বিসিএসে মেধাবীরা চাকরি পেতেন। তবে সেটি ছিল হাতে গোনা। পিএসসিতে তদবির, অনিয়ম ও বাণিজ্য বাসা বেঁধেছিল। সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল চোখে পড়ার মতো। দেখা যেত, সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী এবং যাঁরা বড় অঙ্কের ঘুষ দিতে পারতেন, তাঁদের প্রাধান্য থাকত বিসিএসে। এমনকি বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগে ২৭তম বিসিএস বাতিল পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে তদবির ও অনিয়ম নেই বললেই চলে। ফলে প্রার্থীদের আগ্রহ বেড়েছে। আগে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পড়ালেখা শেষে বিসিএস না দিয়ে দেশের বাইরে চলে যেতেন কিংবা বহুজাতিক কম্পানি, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওতে চাকরি নিতেন। কিন্তু এখন মেধাবীরা আগে বিসিএসে চেষ্টা করছেন।

৪০তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা সৈকত আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার প্রথম পছন্দ পররাষ্ট্র, দ্বিতীয় প্রশাসন আর তৃতীয় পুলিশ। আমার কয়েকজন বড় ভাই কোনো তদবির ছাড়াই শুধু নিজের চেষ্টায় বিসিএসে সুযোগ পেয়েছেন। তাই আমারও আগ্রহ বেড়েছে। নিয়মিত প্রস্তুতি নিয়েছি, লিখিত পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। আর প্রথম শ্রেণির ক্যাডার পদে সম্মান ও আর্থিক সুবিধাদি একজন মানুষের সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য যথেষ্ট। সব মিলিয়ে আমার পছন্দ বিসিএস ক্যাডার হওয়া। সামনের আরো তিন-চারটি বিসিএসে অংশগ্রহণের বয়স রয়েছে। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব।’

পিএসসি সূত্রে জানা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে পিএসসির সুপারিশ পেয়েছিলেন ১৬ হাজার ৯০ জন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্যাডার পদে ১২ হাজার ৭১৯ জন এবং নন-ক্যাডার পদে তিন হাজার ৩৭১ জন। ২০০৭-০৮ সালে ক্যাডার পদে তিন হাজার ৬৪৬ জন এবং নন-ক্যাডার পদে ৫১৯ জন অর্থাৎ মোট চার হাজার ১৬৫ জন সুপারিশ পেয়েছিলেন। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট সুপারিশ পেয়েছেন ৬৬ হাজার ২৫৬ জন। তাঁদের মধ্যে ক্যাডার পদে ৩১ হাজার ৩৩৩ জন এবং নন-ক্যাডার পদে ৩৫ হাজার ৯২৩ জন।

জানা যায়, আগে প্রতিটি বিসিএসের পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশে দীর্ঘ সময় লেগে যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সময়ও অনেকটা কমে এসেছে। বর্তমানে ৪১তম বিসিএসের আবেদন গ্রহণ শেষ হয়েছে। লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে ৪০তম বিসিএসের। ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের সুপারিশ করা হয়েছে। আর ৩৮তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা চলছে, ফেব্রুয়ারির শেষে ফল প্রকাশিত হওয়ার কথা।  অর্থাৎ একই সঙ্গে তিনটি বিসিএসের কার্যক্রম চলছে।

কয়েক বছর ধরে বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের যাঁরা ক্যাডার পদে সুপারিশ পাননি, তাঁদের মধ্য থেকে অধিকসংখ্যক হারে নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হচ্ছে। অর্থাৎ উত্তীর্ণ হলে যে পদেই হোক, চাকরি অনেকটা নিশ্চিত। কিন্তু আগে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ চাকরির সুযোগ পেত। ৩৭তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে প্রথম শ্রেণির পদে এক হাজার ৩১৪ জনকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হয়েছিল। আর ওই বিসিএসেই প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে ৬৯২ জন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে এক হাজার ৫৭৭ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। নন-ক্যাডারে আরো প্রার্থী সুপারিশের কার্যক্রম চলমান আছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা