kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনে বিজয়ী আ. লীগের মোছলেম উদ্দীন

আ. লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ ককটেল বিস্ফোরণ

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আ. লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ ককটেল বিস্ফোরণ

চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণের সময় গতকাল চান্দগাঁও থানার খাজা রোডে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। সকাল ১০টায় তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোছলেম উদ্দীন আহমদ। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে নৌকা প্রতীকে ৮৭ হাজার ২৪৬ ভোট পেয়ে তিনি বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির আবু সুফিয়ান পেয়েছেন ১৭ হাজার ৯৩৫ ভোট। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি পুনর্ভোটের দাবি করেছেন।

ভোটগ্রহণ শেষে গতকাল রাতে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়ামে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান। তিনি জানান, গতকাল উপনির্বাচনে এই আসনের ভোটারদের মধ্যে ২২.৯৪ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। বোয়ালখালী উপজেলা এবং নগরীর চান্দগাঁও ও বায়েজিদের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৮ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৭৪ হাজার ৪৮৫ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৪১ হাজার ১৯৮ জন পুরুষ, দুই লাখ ৩৩ হাজার ২৮৭ জন নারী। এর মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলায় ভোটারের সংখ্যা এক লাখ ৬৪ হাজার ১৩১ জন, বাকি ভোটার চট্টগ্রাম মহানগরীর।

অন্য চার প্রার্থীর মধ্যে বিএনএফের এস এম আবুল কালাম আজাদ (টেলিভিশন) ১১৮৫ ভোট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সৈয়দ মোহাম্মদ ফরিদ আহমদ (চেয়ার) ৯৯২ ভোট, ন্যাপের বাপন দাশগুপ্ত (কুঁড়েঘর) ৬৫৬ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক (আপেল) পেয়েছেন ৫৬৭ ভোট।

১৭০টি কেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। এর মধ্যে এক হাজার ১৯৬টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ হয় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)।

এদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানোর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ইভিএমে ভোটগ্রহণকালে বিভিন্ন কেন্দ্রের বাইরে এসব ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় সংঘর্ষে আহত তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন বিএনপির অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ও খোরশেদ আলম, আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ রাশেদ।

নগরীর বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থকদের। তবে উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করেছেন, ভোট সুষ্ঠু হয়েছে।

ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল। আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্য চার প্রার্থীর সমর্থকদের দেখা যায়নি। ভোটগ্রহণকালে নগরীর বিভিন্ন কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট দেখা যায়নি। বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ানের অভিযোগ, তাঁর নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সকাল ৯টায় ভোট শুরুর পর নগরীর অনেক ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়, ভোটারের উপস্থিতি কম। তবে কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে ছিল মানুষের ভিড়।

গতকাল সকাল ১১টার দিকে নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় একটি কেন্দ্রের সামনে সংঘর্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ৮-১০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া টেকবাজার কাজী কালামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালুরঘাট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়, এখলাছুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কেন্দ্রের বাইরেও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

টেকবাজার কাজী কালামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বাইরে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু কেন্দ্রের ভেতরে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে এ সময় প্রায় ১০ মিনিট ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।

সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার ড. অজয় কুমার দত্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, উপস্থিতি খুবই কম। আমাদের কেন্দ্রে মোট ভোটার এক হাজার ৯১৯ জন (পুরুষ ও মহিলা)। এর মধ্যে ভোট শুরুর পর এক ঘণ্টায় ৩০টি ভোট পড়েছে।

নগরীর চান্দগাঁও এনএমসি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুলিশ-বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নগরীর রাবেয়া বশর ইনস্টিটিউট ও আল হুমায়রা মহিলা মাদরাসায় বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টকে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিএনপি সমর্থকদের অভিযোগ, এনএমসি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে থেকে ধানের শীষের এক সমর্থককে পিটিয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। এ সময় ওই সমর্থককে পুলিশ গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।

আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, টেকবাজার কাজী কালামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা প্রথমে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর হামলা চালান। পরে আওয়ামী লীগ কর্মীরা বিএনপি কর্মীদের ধাওয়া দিলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

এর আগে সকাল ১০টায় রাবেয়া বশর ইনস্টিটিউট ভোটকেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট সালাউদ্দিন শাহেদ অভিযোগ করেন, তাঁদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। ধানের শীষ সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে পারছেন না।

সকাল ৯টায় ভোট শুরুর পর বহদ্দারহাট এখলাছুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান। এ সময় তাঁর সঙ্গে নেতাকর্মীরা ছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর একই কেন্দ্রে আসেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমদ। উভয় প্রার্থীই ওই কেন্দ্র পরিদর্শনকালে কোলাকুলি করেন।

মোছলেম উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপি আসলে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচন করছে। তাদের কাজই হলো অভিযোগ করা। এখন পর্যন্ত কোথাও কারচুপির কোনো ঘটনা ঘটেনি। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হচ্ছে। ফলাফল যাই হবে আমি মেনে নেব।’

আবু সুফিয়ান বলেন, ‘বোমাবাজির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র দখল করে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ভোট দিচ্ছে। আমাদের সমর্থকদের ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। আমার এজেন্টদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে নির্বাচন হলে তা মেনে নেব না। তবে শেষ পর্যন্ত আমি ভোটের মাঠে থাকব।’

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক এম রেজাউল করিম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে যেভাবে মিথ্য, ভিত্তিহীন অভিযোগ করে থাকে এই উপনির্বাচনেও তেমনটি করছে। ভোটাররা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে রায় দিয়ে বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগের জবাব দেবে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হচ্ছে।

টেকবাজার কাজী কালামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বের হওয়ার পথে আবুল বশর (৮৯) নামে এক বৃদ্ধ কালের কণ্ঠকে বলেন, ভোট দিতে লাইনে দাঁড়াতে হয়নি। জীবনে অনেকবার ভোট দিয়েছি। কিন্তু এবার প্রথম মেশিনে (ইভিএম) ভোট দিয়েছি। কোনো সমস্যা হয়নি।

ভোট শেষ হওয়ার ৪ ঘণ্টা আগে পুনর্ভোটের দাবি : ভোটগ্রহণ চলাকালে বিএনপি প্রার্থী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান তা স্থগিত করে ফের নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এ উপনির্বাচন বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলছিল। এ অবস্থায় দুপুর ১টার দিকে নগরের নাসিমন ভবনে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সুফিয়ান নির্বাচন কমিশনের কাছে এ দাবি জানান।

আবু সুফিয়ান বলেন, ‘১৭০টি কেন্দ্রের মধ্যে অলমোস্ট সব কেন্দ্র থেকে আমার এজেন্টদের (ধানের শীষ) বের করে দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। গোপন বুথে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা ভোট দিচ্ছেন। এসব কারণে ভোট স্থগিত করে আবার ভোটের আবেদন করছি।’

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে বলেছি। কিন্তু আমরা দেখেছি, প্রশাসনের চোখের সামনে ছাত্রলীগ-যুবলীগকর্মীরা সেখানে কিভাবে গিয়েছেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা