kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

৪১টি ওয়ার্ডে ‘শক্ত বিদ্রোহী’ প্রার্থী আওয়ামী লীগের

লায়েকুজ্জামান   

১৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৪১টি ওয়ার্ডে ‘শক্ত বিদ্রোহী’ প্রার্থী আওয়ামী লীগের

ঢাকা উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতেই তুমুল ‘বিদ্রোহের’ মুখে পড়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় নেতাদের হুঁশিয়ারি, ‘বিদ্রোহী’ না হওয়ার আহ্বান, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে মহানগর নেতাদের চিঠি—কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। বরং কোনো কোনো ওয়ার্ডে একাধিক ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন।

আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এরই মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে প্রচারে নেমে পড়েছেন মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা।

দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়া একাধিকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিতর্কিত, জনবিচ্ছিন্ন, চাঁদাবাজ-দখলবাজ প্রার্থীদের আওয়ামী লীগ সমর্থন দেওয়ায় ‘বিদ্রোহী’র সংখ্যা বেড়েছে। অবশ্য তাঁরা নিজেদের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে পরিচয় দিতে নারাজ। তাঁরা বলছেন, দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি তাঁরা। শুধু স্থানীয় প্রার্থীর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে তাঁরা প্রার্থী হয়েছেন।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তরের সভাপতি বজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দেশের সর্ববৃহৎ ও সুশৃঙ্খল সংগঠন। বড় দল বলে প্রতিটি স্তরে আমাদের প্রার্থীও বেশি, এটা ঠিক। তবে দল যেহেতু প্রতিটি ওয়ার্ডে একজনকে সমর্থন দিয়েছে, সেহেতু একজনই প্রার্থী থাকবে। আমরা অন্যদের চিঠি দিয়েছি প্রত্যাহার করে নিতে। যারা নেয়নি তাদের এখনো সময় আছে, ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। আওয়ামী লীগে বিদ্রোহ করার সুযোগ নেই।’

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৪১টি ওয়ার্ডেই ‘বিদ্রোহীরা’ বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছেন। এর মধ্যে ২০টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের সঙ্গে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। গত নির্বাচনে কেউ আওয়ামী লীগের সমর্থনে আবার কেউ ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন—এমন ১০ জন কাউন্সিলর এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন পাননি। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন এবারও দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচন করছেন। তাঁরা হলেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক, ১২ নম্বরে ইকবাল হোসেন তিতু, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে হুমায়ুন রশিদ জনি, ২৫ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান ও ৪৯ নম্বরে আনিসুর রহমান নাঈম। বাকি পাঁচজন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে থাকবেন কি না—সে ব্যাপারে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছেন।

এ ছাড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন কদম আলী মাদবর। দলীয় সমর্থন না পেয়ে প্রার্থী হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক একাধিকবারের কাউন্সিলর ইসমাইল হোসেন বেনু। গত নির্বাচনে ওই ওয়ার্ডে কদম আলী মাদবর আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় তিনি পরাজিত হন বিএনপি প্রার্থীর কাছে।

৩ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচন করছেন জিন্নাত আলী মাদবর। এ ওয়ার্ডের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী জহিরুল ইসলাম মানিক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

৪ নম্বর ওয়ার্ডে সরকারি দলের সমর্থন পেয়েছেন জামাল মোস্তফা। এখানে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম।

৫ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন আবদুর রউফ নান্নু। এলাকায় তাঁর নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা। প্রতিদিনই জুয়েল রানার মিছিল বড় হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তাঁর দিকে ঝুঁকছে।

একই অবস্থা ৬ নম্বর ওয়ার্ডে। ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এলাকার বেশির ভাগ নেতাকর্মী। গতকাল বিকেলে প্রায় ১০ হাজার লোক নিয়ে মিছিল করেছেন বাপ্পী। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সালাউদ্দিন রবিন দিনে দিনে একা হয়ে যাচ্ছেন।

৭ নম্বর ওয়ার্ডে দলের সমর্থন পেয়েছেন তোফাজ্জেল হোসেন টেনু। কিন্তু এখানে আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াকুব আলী ও আলমগীর কবিরও (লিমন চৌধুরী) মাঠে আছেন।

৮ নম্বর ওয়ার্ডে ‘বিদ্রোহী’ দুই প্রার্থী হলেন তাজু দেওয়ান ও নজরুল ইসলাম পাখী। এখানে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন আবুল কাসেম মোল্লা।

১০ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থন দিয়েছে বর্তমান কাউন্সিলর আবু তাহেরকে। জানা যায়, তিনি একসময় বিএনপির ক্যাডার ছিলেন। গাবতলীতে আওয়ামী লীগের মিছিলে গুলি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি, চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বিতর্কিত আবু তাহেরের বিরোধিতা করে প্রার্থী হয়েছেন খান মো. আসাদ আল জামান। তবে আবু তাহেরের প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্যর সমর্থন থাকায় বিপাকে পড়েছেন আসাদ।

১২ নম্বর ওয়ার্ডে এবারও দলের সমর্থন পাননি কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন তিতু।

১৩ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া হারুন অর রশিদ মিঠুর বিরুদ্ধে এলাকার ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, পরিবারের লোকেরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত—এমন অভিযোগের কারণে বিতর্কিত তিনি। ওই ওয়ার্ডে দলের সিদ্ধান্ত না মেনে প্রার্থী হয়েছেন একসময় মিরপুরে আওয়ামী রাজনীতির প্রাণপুরুষ খ্যাত শামসুদ্দিন মোল্লার ছেলে ইসমাইল হোসেন মোল্লা। দুই বছর আগে থেকেই এলাকায় কার্যালয় খুলে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন তিনি।

১৪ নম্বর ওয়ার্ডে গত নির্বাচনেও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছিলেন হুমায়ুন রশিদ জনি। দলের সমর্থন পেয়েছেন মইজউদ্দিন। গত নির্বাচনে দলের সমর্থন পেয়ে পরাজিত হওয়া প্রার্থী রেজাউল করিম ভূঁইয়া বাহারও এবার প্রার্থী।

১৫ নম্বর ওয়ার্ডে দলীয় সমর্থন পেয়েছেন আবু সালেক মোল্লা। এখানে প্রার্থী হয়েছেন দলের আরো দুজন। তাঁরা হলেন হাফিজুর রহমান ও নারী নেত্রী নাসিমা হক ডলি।

১৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন মতিউর রহমান মোল্লা। তাঁর বিরোধিতা করে প্রার্থী হয়েছেন আজিজুর রহমান স্বপন।

১৭ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ইসহাক মিয়া শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এলাকায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এখানে প্রার্থী হয়েছেন শরিফুল ইসলাম।

২০ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ প্রথম সমর্থন দিয়েছিল জাহিদুর রহমানকে। পরে সমর্থন দেওয়া হয় নাছিরউদ্দিনকে। তিনি নানা কারণে বিতর্কিত। গতবার জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে। প্রথমে সমর্থন পাওয়া জাহিদুর রহমান প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।

৩০ নম্বর ওয়ার্ডে আবার দলের সমর্থন পেয়েছেন বিতর্কিত আবুল হাসেম হাসু। এবার তাঁর বিরোধিতা করে প্রার্থী হয়েছেন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ।

৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাইদুর রহমান সরদারের বিরোধিতা করে মাঠে আছেন জাহিদুল ইসলাম মোল্লা।

৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন শফিউদ্দিন মোল্লা। কিন্তু বর্তমান কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈমও প্রার্থী হয়েছেন। অবশ্য নাঈমকে ঘিরে বিতর্ক রয়েছে।

নতুন যুক্ত হওয়া ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থন দিয়েছে বর্তমান কাউন্সিলর মোহাম্মদ শরিফুর রহমানকে। কাউন্সিলর হিসেবে বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী কাজ করে এগিয়ে আছেন তিনি। তার পরও তাঁর বিরোধিতা করে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক মেম্বার আবুল হোসেন।

৫৩ নম্বর ওয়ার্ডে নাছিরউদ্দিনকে সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের সিদ্ধান্ত না মেনে প্রার্থী হয়েছেন কফিলউদ্দিন। দুজনের মধ্যে জোর লড়াই হবে বলে মনে করছে এলাকাবাসী।

৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন যুবরাজের বিরোধিতা করে প্রার্থী হয়েছেন শেখ সোহেল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা