kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ জানুয়ারি ২০২০। ৯ মাঘ ১৪২৬। ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১          

স্বাধীনতাবিরোধীর প্রথম তালিকায় ১০৭৮৯ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



স্বাধীনতাবিরোধীর প্রথম তালিকায় ১০৭৮৯ জন

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ঘাতক-দালালদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই তালিকায় ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নাম রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ওই তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যাঁরা একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যাঁদের নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি।’

৬৫৯ পৃষ্ঠার তালিকাটি মন্ত্রণালয়ের https://molwa.gov.bd/ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। কালের কণ্ঠ’র পাঠকরা চাইলhttps://www.kalerkantho.com/online/national/2019/12/15/851223 লিংক থেকেও দেখতে পারবেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, সে তালিকায় জেলা প্রশাসনে সংরক্ষিত তালিকা এবং বিভিন্ন সময় গেজেট আকারে যাঁদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে—সেগুলো স্থান পাবে। তিনি জনসাধারণের কাছ থেকেও এসংক্রান্ত তথ্য আহ্বান করে বলেন, কেউ তথ্য দিলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রকাশ করা হবে।

তালিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে কার কী ভূমিকা ছিল জাতির জানা প্রয়োজন। মন্ত্রী হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব থেকে এই তালিকা প্রকাশের কাজটি শুরু করেছি।’ যাঁদের নাম প্রকাশ করা হলো তাঁদের মধ্যে যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের বিচারের আওতায় আনা হবে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই তালিকা নয়। তালিকাভুক্ত হলে মামলা করা যাবে বা তালিকাভুক্ত না হলে মামলা করা যাবে না এমন নয়। বাদী অভিযোগ আনলে মামলা হবে।’ এই তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁদের বিচারের দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

এই তালিকার আইনগত ভিত্তি কী, তালিকাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কোনো গেজেট প্রকাশ করা হবে না। তবে জাতি প্রত্যাশা করলে এবং সরকার মনে করলে গেজেট করবে। আমরা তালিকা প্রকাশ করলাম, আগে রিঅ্যাকশনটা দেখব, জাতি চাইলে এটা হবে।’

মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ ৯ মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি বাহিনীর সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সন্ত্রমহানি করেছে। তিনি বলেন, ‘বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নথি সুকৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ তালিকা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। তৎকালীন ১৯ জেলার রেকর্ড রুমে যেসব দালিলিক প্রমাণ ছিল, সেগুলো দিতে বলা হয়েছিল; আশানুরূপ তালিকা পাইনি। তাই জানুয়ারি মাসের মধ্যে রেকর্ড পাঠানোর জন্য বলেছি।’

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী এবং তাদের তৈরি করা শান্তি কমিটি, আলবদর, আলশামস, আল মুজাহিদ বাহিনী এবং পাকিস্তান সরকারের আধাসামরিক বাহিনী রাজাকারের আলাদা তালিকা প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এটা পরবর্তী সময়ে চেষ্টা করা হবে। এটা ‘রাজাকারের’ তালিকা নাকি ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের’ তালিকা জানতে চাইলে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

একই সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও মন্ত্রী বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম বিভিন্ন পর্যায়ের তালিকায় রয়েছে। সবগুলো সমন্বয় করে বিশুদ্ধ তালিকা দিতে একটু সময় লাগছে। তবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ১০ হাজারের বেশি হবে না। আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

একনজরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তালিকা : প্রকাশিত তালিকাটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার থানাওয়ারি তালিকা দিয়ে এটি শুরু হয়েছে। ৫২০ জনের এই তালিকাকে বলা হয়েছে ‘আলবদর তালিকা’। এরপর আছে ঢাকা সদর দক্ষিণের ৬০৪ জনের তালিকা। থানাভিত্তিক এই তালিকার প্রথমেই রয়েছে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নাম। এরপর আছে দালালির নির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁদের নাম। এরপর আছে শান্তি কমিটির যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাঁদের নাম। এরপর আছে বিচারের অপেক্ষায় থাকা ‘বিশিষ্ট’ ৫৭ জনের নাম।

ওই তালিকায় আছেন—নুরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী, খান এ সবুর, মাহমুদ আলী, ওয়াহিদুজ্জামান, খাজা খায়রউদ্দিন, কাজী এ কাদের, রাজা ত্রিদিব রায়, ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, এ কে এম শামসুল হক, অং শ্যা প্রিউ চৌধুরী, অধ্যাপক গোলাম আযম, শাহ আজিজুর রহমান, এ কি এম শফিকুল ইসলাম, সৈয়দ সাজ্জব হোসেন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, মো. আলমগীর, মো. সিদ্দিক প্রমুখ। এঁরা স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতা এবং শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন বলে জানা যায়।

পর্যায়ক্রমে রয়েছে পলাতক দালালদের ৩২ জন; জামিনে মুক্ত ৩৫৮ জন; ঢাকা হাইকোর্ট বারের ৫৩ জন অ্যাডভোকেটের নাম যাঁরা যৌথ বিবৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় দখলদারির প্রশংসা করেছিলেন; বিশেষ ট্রাইব্যুনালের অধীনে আটকাদেশপ্রাপ্ত ৩৩৭ জন; পলাতক দালাল ১১৭ জনের নাম। এভাবে কারাগারে বন্দি, পলাতক দালালদের তালিকা, জেলাভিত্তিক দালাল তালিকা, কখনো ইংরেজি, কখনো বাংলায় রয়েছে।

আরো আছে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির উপনির্বাচনের জন্য যাঁরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তাঁদের প্রস্তাবক ও সমর্থকসহ তালিকা। আছে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের ৬৯ জন বাঙালি রাজনীতিবিদের তালিকা, যাঁরা দেশ ত্যাগ করে পাকিস্তান বা বিদেশে অন্য কোথাও পলাতক আছেন সে তালিকাও।

‘স্থানীয় পুলিশের তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, ‘মামলা প্রত্যাহার, ‘অব্যাহতি, ‘ক্ষমা মঞ্জুর, ‘তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত, ‘মামলা প্রত্যাহার ও অব্যাহতি, ‘জেলা যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ অনুসারে মুক্তি পেয়েছেন, ‘আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় কেস প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন, ‘স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কর্তৃক অভিযোগ প্রভৃতি মন্তব্য লেখা বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির নামও রয়েছে তালিকায়।

‘ময়মনসিংহ জেলার রাজাকারদের বিরুদ্ধে ২৪টি পৃথক অভিযোগ; তালিকা নথিতে সংযুক্তি নেই। তালিকাসহ তদন্তের জন্য পুলিশ অধিদপ্তরে প্রেরণ।’ ‘রাজাকার, আলবদর ও আলশামস গং-এর নিয়োগসংক্রান্ত রিপোর্ট : ৮২৭০৩-এর মধ্যে কেবল ৭ নাম আছে।’—এমন মন্তব্যও আছে তালিকায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা