kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

একাত্তরের ঘাতক সংগঠনের বিচার-শেষ

জামায়াতের বিচারের অপেক্ষা ফুরায় না

আজিজুল পারভেজ   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জামায়াতের বিচারের অপেক্ষা ফুরায় না

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিরোধিতায় নেমেছিল এ দেশের ধর্মভিত্তিক কয়েকটি রাজনৈতিক দল। শুধু রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতাই নয়, হানাদার পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগী হয়ে উঠেছিল তারা। অংশ নিয়েছিল নির্বিচার গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগে। দেশের মাত্র ১৪.৩ শতাংশ মানুষের সমর্থন নিয়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যেও ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল তারা। প্রতিটি দলই গড়ে তুলেছিল নিজস্ব সশস্ত্র ঘাতক বাহিনী। কিন্তু ওই সব বাহিনীর দায় চিহ্নিত হয়নি। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। নিষিদ্ধও করা হয়নি। জামায়াতের বিচারের লক্ষ্যে কয়েক বছর আগে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও তা ঝুলে আছে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচার শুরু হওয়ার পর ২০১৩ সালের আগস্টে জামায়াতের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছিল। ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে সংগঠনের বিচার ও শাস্তি সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ২০১৪ সালে আইন মন্ত্রণালয় অপরাধী সংগঠনের শাস্তির বিধান রেখে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। প্রস্তাবিত ওই সংশোধনীতে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘গ্রুপ অব ইনডিভিজুয়ালস’ বা ব্যক্তির সমন্বয়ে দল শব্দগুচ্ছের পর ‘(সংগঠন)’ শব্দটি সন্নিবেশ করা হয়। আরেকটি ধারায় ‘দায়’ শব্দটির পরিবর্তে ‘অথবা সাংগঠনিক দায়’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া সংগঠন হিসেবে দোষী প্রমাণিত হলে ওই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার বিধান রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া একাধিক রায়ে জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন’ আখ্যা দিয়ে এর বিচার করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেই বিচারের উদ্যোগই ঝুলে আছে।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত সংগঠনের বিচার দাবি করে আসছে নির্মূল কমিটি সেই ১৯৮৫ সাল থেকে। এটা আন্তর্জাতিকভাবে সর্ববিদিত সত্য যে অপরাধী সংগঠনের বিচার না হলে সেই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী, রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটির বিচার হতে হবে। না হলে গণহত্যার বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দেখা গেছে, একাত্তরে ৯০ ভাগ ভিকটিম যারা গণহত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা সাধারণত কোনো ব্যক্তির নাম বলতে পারে না, তারা বলে জামায়াতে ইসলামীর লোকেরা, রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেছে। তার মানে বাহিনীর কথা বলছে, তারা ব্যক্তির কথা বলছে না। সুতরাং যুদ্ধাপরাধী সংগঠনগুলোর বিচার যদি না হয়, ৩০ লাখ শহীদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে না। এ অবস্থায় জামায়াতের বিচার না হলে, জামায়াত নিষিদ্ধ না হলে আগামী দিনে আরো ভয়াবহ গণহত্যার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’ তিনি ঘাতক সংগঠনগুলোর দায় এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের চিহ্নিত ও তালিকা করার জন্য গবেষকদের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি করার দাবি জানান।

শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারী আলবদর বাহিনী ও তাদের জন্মদানকারী জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, জার্মানির ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে যেভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধীদের জন্য সংগঠনের বিচার করা হয়েছে, সেভাবেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সংগঠনগুলোর বিচার করা উচিত। জানা গেছে, ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে সাতটি সংগঠন নিষিদ্ধ এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক আফসান চৌধুরী বলেন, ‘রাজাকারদের সঙ্গে শান্তি কমিটি সরাসরি যুক্ত। রাজাকাররা গ্রাম পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধ করেছে। শান্তি কমিটি অনেক বড় দেশদ্রোহী এই কারণে যে তারা শুধু নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখার জন্য পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে গ্রামে, নির্যাতনও হয়েছে গ্রামে। সেখানে শান্তি কমিটির ভূমিকা ছিল মুখ্য। এদের চিহ্নিত করা উচিত ছিল। আলশাসম, আলবদর, জামায়াতে ইসলামী যে অপরাধগুলো করেছে, সেগুলো চিহ্নিত হওয়া উচিত। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির কোনো স্থান হতে পারে না বাংলাদেশে। যারা এ দেশের জন্মই চায়নি তারা কিভাবে এ দেশে রাজনীতি করতে পারে? পাকিস্তানি বাহিনী এ দেশে গণহত্যা করেছে; জামায়াতে ইসলামী তাদের সহযোগিতা করেছে। গণহত্যার দায়েই তাদের বিচার ও নিষিদ্ধ করতে হবে।’

মামলা নিষ্পত্তিতে লাগবে ১৭০ বছর! : ১০ বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪১টি মামলা। বছরে গড়ে বিচার হয়েছে চারটি করে। বর্তমানে তদন্তাধীন ২৯টি, বিচারধীন ৩২টি মামলা। আর অভিযোগ জমা আছে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৮০টি। যে গতিতে বিচার চলছে, তাতে ওই মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে সময় লাগবে ১৭০ বছর! এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত সংস্থার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে হবে। একটি ট্রাইব্যুনাল দিয়ে এটা সম্ভব না।’

স্বাধীনতাবিরোধী দল ও সংগঠন : পাকিস্তান সৃষ্টিকারী মুসলিম লীগ তখন প্রধান রাজনৈতিক দল হলেও এরা তিন খণ্ডে বিভক্ত ছিল। ফজলুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘কনভেনশন মুসলিম লীগ’, খান এ সবুর খানের নেতৃত্বে ‘কাইয়ুম মুসলীম লীগ’ এবং খাজা খয়ের উদ্দিনের নেতৃত্বে ছিল ‘কাউন্সিল মুসলিম লীগ’। আরো ছিল পিডিপি, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ, নেজামে ইসলাম ও তাদের অঙ্গসংগঠন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন থেকে এই দলগুলোর জনসমর্থন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। মুসলিম লীগের তিন পক্ষ মিলে জাতীয় পরিষদে পেয়েছিল ৫.৪ শতাংশ ভোট। জামায়াতে ইসলামী পায় ৬ শতাংশ এবং পিডিপি ২.৯ শতাংশ ভোট। নেজামে ইসলাম ৪৯টি আসনে প্রার্থী দিলেও তাদের ভোট এতই কম ছিল যে হিসাবের মধ্যে আসেনি। একাত্তরের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক আইন প্রশাসক ও গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানকে সরিয়ে ডা. এ এম মালেককে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় এসব দল যোগ দিয়েছিল। এতে কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি ও আওয়ামী লীগের পক্ষত্যাগী দুজন করে এবং কনভেনশন মুসলিম লীগ, কাইয়ুম মুসলিম লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টির একজন করে নেতা মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোর মধ্যে মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর শাখা সংগঠন বিস্তৃত ছিল সারা দেশেই। এরাই বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিতে সারা দেশে মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয় ‘শান্তি কমিটি’। শান্তি কমিটির ব্যানারে সংঘটিত হয় স্বাধীনতাবিরোধী সব রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রশাসনের বিকল্প হিসেবে এই শান্তি কমিটি সারা দেশে পাকিস্তানি অপকর্মের সহযোগী হয়ে ওঠে। তবে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক কাজ করে জামায়াত।

পাশাপাশি আনসার বাহিনী বিলুপ্ত করে প্রথমে পুলিশের সহযোগী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল রাজাকার বাহিনী। তারা পুলিশের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ, সরকারের কাছ থেকে পোশাক, ভাতা-রেশন পেত। পরে তাদের সামরিক বাহিনীর অধীনে নেওয়া হয়েছিল। ধীরে ধীরে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা রাজাকার বাহিনীতে প্রাধান্য বিস্তার করে।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই গড়ে তুলেছিল প্রাইভেট বাহিনী। জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলে সশস্ত্র ‘আলবদর বাহিনী’। আলবদর বাহিনীর নৃশংসতা বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলার রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। জামায়াত, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম পার্টি এবং তাদের ছাত্রসংগঠন, বিশেষ করে মাদরাসাছাত্রদের সংগঠন জামিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার নেতাকর্মীদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল ঘাতক বাহিনী ‘আলশামস’। গবেষক আজাদুর রহমান চন্দনের মতে, উর্দুভাষী লোকজনকে নিয়ে গড়া হয়েছিল ‘মুজাহিদ বাহিনী’ আর শান্তি কমিটিরও একটি নিজস্ব বাহিনী ছিল ‘গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী’ নামে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, নেত্রকোনা মহকুমায় রাজাকার বাহিনীর মাধ্যমে ‘আলবদর’, ‘আলশামস’ ও ‘মুজাহিদ বাহিনী’কে যে অস্ত্র সরবরাহ করা হতো তার প্রামাণ্য দলিল পাওয়া গেছে। রাজাকার বাহিনীর সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকত কোথায় কোন বাহিনীকে কতটি অস্ত্র দেওয়া হয়েছে। আব্দুল হান্নান খান বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্য সম্মুখ সমরের জন্য ‘রাজাকার বাহিনী’ আর সিক্রেট কিলিং বা গুপ্তহত্যার জন্য ‘আলবদর’, ‘আলশামস’ ও ‘মুজাহিদ বাহিনী’ গড়ে তুলেছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা