kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বুদ্ধিজীবী দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ

বুদ্ধিজীবী ও রাজাকারদের সঠিক তালিকা প্রকাশের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বুদ্ধিজীবী ও রাজাকারদের সঠিক তালিকা প্রকাশের দাবি

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন। গতকাল মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে। ছবি : কালের কণ্ঠ

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের মাত্র দুই দিন আগে তাদের সহায়তায় আলবদর, আলশামস ও রাজাকাররা বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় মেতে ওঠে। পরে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মৃতদেহ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়ের বাজারে। জাতির সূর্যসন্তানদের হারানোর বেদনার দিনটিতে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের আপামর মানুষ। শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নেমেছিল রায়ের বাজার বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধেও।

গতকাল শনিবার সকাল ৭টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে দলীয় নেতাদের নিয়ে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা সারিবদ্ধভাবে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি শ্রদ্ধা জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। এ সময় সাধারণ মানুষের হাতে ফুল, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে লেখা ব্যানার, লাল-সবুজের ছোট-বড় পতাকা দেখা যায়।

পরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগ নেতারা যান রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে। রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতেও শনিবার সকাল থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। সবার শুভেচ্ছায় শহীদ বেদি ফুলে ফুলে ভরে যায়।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির রূপকার। তাঁদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, উদার ও গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা জাতীয় অগ্রগতির সহায়ক। জাতির বিবেক হিসেবে খ্যাত বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের ক্ষুরধার লেখার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি, যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারকে পরামর্শ দেওয়াসহ বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে বিপুল অবদান রাখেন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ও তাদের দোসররা পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে নামে। তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। স্বাধীনতাবিরোধীরা এই পরিকল্পিত নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়। বাংলাদেশ যাতে আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেটাই ছিল এ হত্যাযজ্ঞের মূল লক্ষ্য।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সেই পরাজিত শক্তিই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে এবং পরে দেশের মুক্তমনা, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালায়। ওই সন্ত্রাসী-জঙ্গিগোষ্ঠী ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বানচাল করতে দেশব্যাপী আগুন-সন্ত্রাস চালায়। এখনো তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে।’

স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে এসে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে বিএনপি। এদিকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় রাজাকার কাদের মোল্লাকে শহীদ আখ্যায়িত করায় ধিক্কার ও ঘৃণা জানান আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা।

তরুণ প্রজন্মের কাছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ দেশের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা ও বুদ্ধিজীবী এবং রাজাকারদের সঠিক তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সন্তানরা। রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা জানানো শেষে তাঁরা এ দাবি জানান। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীদের সঠিক তালিকা করতে হবে। সেই সঙ্গে রাজাকারদের তালিকাও করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী সব ধরনের অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে।’

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মকে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কথা জানাতে হবে। তারা তো বুঝতে পারছে না, তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে, আমাদের বাবাদের অবদানের কথা।’ সংগ্রাম পত্রিকায় কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করার তিনি বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীকে শহীদ বলা মানে বাংলাদেশকে অস্বীকার করা। পত্রিকাটি দেশের শহীদদের অবমাননা করে খবর ছাপিয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করেছে। পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি গোলাম সারোয়ার, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ দক্ষিণের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা।

বায়তুল মোকাররমে দোয়া মাহফিল : শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পবিত্র কোরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হয়েছে। মিলাদ ও মোনাজাত পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম মুফতি মাওলানা এহসানুল হক জিলানি। মোনাজাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। এ ছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধে সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়।

স্পিকারের শুভেচ্ছা বিনিময় : মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। ওই সময় তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, গতকাল সকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যান। ওই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন হুইপ ইকবালুর রহিম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনসহ সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা