kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলন

অনশনে মৃত্যুর পর আরো শ্রমিক অসুস্থ

রবিবার আন্ত মন্ত্রণালয় সভা আহ্বান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনশনে মৃত্যুর পর আরো শ্রমিক অসুস্থ

দাবি আদায়ে অনশনকারী পাটকল শ্রমিক আব্দুস ছাত্তারের মৃত্যুর প্রতিবাদে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন গতকাল ঢাকায় প্রেস ক্লাবের সামনে কালো পতাকা মিছিল করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

মজুরি কমিশন, বকেয়া মজুরিসহ ১১ দফা দাবিতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের আমরণ অনশনে আরো শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গতকাল শুক্রবার অনশনের চতুর্থ দিন পর্যন্ত খুলনায় দেড় শতাধিক, নরসিংদীতে ১৭ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত বৃহস্পতিবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যু হয় এক শ্রমিকের। শ্রমিক নেতারা গতকালও বলেছেন, দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।

এদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল করপোরেশনের শ্রমিকদের জন্য সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি কমিশন ২০১৫ বাস্তবায়নে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় আগামীকাল রবিবার আন্ত মন্ত্রণালয় সভা ডেকেছে বলে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান জানিয়েছেন। তিনি গত

বৃহস্পতিবার রাতে এক যৌথ সভায় মজুরি কমিশন বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ বিষয়ে আঞ্চলিক কার্যালয়, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধির পাঠানো খবর—

খুলনা : গতকাল খুলনায় শীত ও কুয়াশা মোকাবেলা করে আমরণ কর্মসূচিতে অটল ছিলেন শ্রমিকরা। একই সঙ্গে প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক আব্দুস সাত্তারের মৃত্যুতে অনশনস্থলগুলোতে ছিল শোকের আবহ। সকাল ১০টায় প্লাটিনাম জুট মিল গেটে বিআইডিসি সড়কে প্রয়াত আব্দুস সাত্তারের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় শ্রমিক নেতারা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল ছুটির দিন হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনে স্থবির ছিল খুলনার শিল্পাঞ্চল খ্যাত খালিশপুর, আফিল গেট। বিশেষ করে, খালিশপুরের বিআইডিসি সড়কে পৃথক স্থানে অনশন করা প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট, স্টার, দৌলতপুর ও খালিশপুর জুট মিলের শ্রমিকদের মধ্যে ছিল শোকের আবহ। সকালে আব্দুস সাত্তারের মরদেহ তাঁর কর্মস্থল প্লাটিনাম জুট মিলের গেটে আনা হলে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে সেখানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ নন-সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ হোসেন, হুমায়ুন কবির, সোহরাব হাসান, শ্রমিক নেতা কাওসার আলী মৃধা, খলিলুর রহমান, স্টার জুট মিলের আবু হানিফ, তবিবর রহমান, আলমগীর হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, লিয়াকত হোসেন, আব্দুল হামিদ, হারুন অর রশিদ মো. আলাউদ্দিনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে লাশ দাফনের জন্য পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নিয়ে যান স্বজন ও সহকর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অসুস্থ অবস্থায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে মৃত্যু হয় আব্দুস সাত্তারের। গতকাল তাঁর পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে শ্রম অধিদপ্তর।

প্রতিমন্ত্রী মতবিনিময়ে যা বললেন গত বৃহস্পতিবার রাতে খুলনার বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে খুলনায় পাটকল শ্রমিকদের অনশন প্রত্যাহারের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। সভায় তিনি শ্রমিক কর্মসূচি স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে জাতীয় মজুরি কমিশন বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এটি বাস্তবায়নে এক হাজার ১০৩ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। সংশ্লিষ্ট পাটকলগুলোর পণ্য বিক্রি করে এ অর্থ সংস্থান সম্ভব হবে না। তাই প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। গত সপ্তাহে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি বাবদ ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া চলমান ধর্মঘটের কারণে ছাঁটাই এবং বরখাস্ত করা শ্রমিকদের পুনর্বহাল করা হয়েছে। আগামীকাল আন্ত মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এ সমস্যার সমাধান হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, মৃত শ্রমিকের (আব্দুস সাত্তার) পরিবারকে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। তিনি খুমেক হাসপাতাল ও খুলনা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনশনরত শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল টিম গঠনের নির্দেশনা দেন।

মতবিনিময়সভায় খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন, শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. কাউসার শিকদার, খালিশপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সানাউল্লাহ নান্নু, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুল ইসলাম বাশার, শ্রমিক নেত্রী শাহনাজ আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ নন-সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও প্লাটিনাম জুট মিলের সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, প্লাটিনাম জুট মিলের ৮০ জনসহ দেড় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। তাঁরা সুস্থ হয়ে আবার কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া শ্রমিকদের ঘরে ফেরার পথ খোলা নেই।

নরসিংদী : গতকালও আমরণ অনশন করেন নরসিংদীর ইউএমসি জুট মিলের শ্রমিকরা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতভর শীত উপেক্ষা করে কাঁথা-বালিশসহ অনশনস্থলে অবস্থান করেন তাঁরা। গত চার দিনে অনশনরত ১৭ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এদিকে আমরণ অনশনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে জুটমিলে। মিলের উৎপাদন বন্ধ হওয়াসহ পাটবাহী কোনো ট্রাক ও কর্মকর্তারা মিলে ঢুকতে পারছেন না।

অনশনে অসুস্থ শ্রমিকদের মধ্যে নরসিংদী সদর ও জেলা হাসপাতালে ভর্তি আছেন মো. ফুয়াদ, মো. আবদুর রব, মো. রুবেল, মো. কামাল হোসেন, মো. আলী আকবর, চান মিয়া, মো. সফিউদ্দিন, সামসুল হক, রাজিয়া বেগম, বিল্লাল হোসেন ও আলী হোসেন। ইউএমসি জুট মিলস শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. সফিকুল ইসলাম মোল্লা এ তথ্য জানান।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর অনশনের সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় অনশনস্থলে আসেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নরসিংদী কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁরা শ্রমিক নেতাদের কাজে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান এবং হাসপাতালে অসুস্থ শ্রমিকদের খোঁজখবর নেন।

রাজশাহী : শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে রাজশাহী পাটকল শ্রমিকরা গতকাল চতুর্থ দিনের মতো মিলগেটে অবস্থান করেন। যতই দিন যাচ্ছে অসুস্থ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। রাজশাহী পাটকল সিবিএ নন-সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জিল্লুর রহমান জানান, আমরণ অনশনে গত বুধবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত ১০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়েছেন। দুজন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনজনকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অসুস্থরা হলেন আসলাম হোসেন (৬৫), মোস্তাফিজুর রহমান (৪০), সাইদুর রহমান (৫৫), আব্দুল গফুর (৪৮) ও মনসুর রহমান (৫২)। আসলাম হোসেন ও আব্দুল গফুর হাসপাতালে আছেন। আসলাম পাটকলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। গতকাল অসুস্থ হয়ে পড়া পাঁচ শ্রমিক হলেন জয়নাল আবেদিন, আলতাফুন বেগম, মহসীন কবীর, মোশাররফ হোসেন ও মোজাম্মেল হক। তাঁদের অনশনস্থলেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, গত ১৭ নভেম্বর ১১ দফা দাবিতে ছয় দিনের কর্মসূচির ডাক দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ নন-সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ। পরে ১০ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশন শুরু হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা