kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সেনাদের লঞ্চ ডুবিয়ে দিই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেনাদের লঞ্চ ডুবিয়ে দিই

মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন খান

‘বাঙালি জাতির পূর্ণাঙ্গ আত্মপ্রকাশের চূড়ান্ত ধাপে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অংশগ্রহণ করাটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেছি সমাবেশে উপস্থিত থেকে। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলে ফিরে ক্যান্টিনের দোতলায় গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা-পর্যালোচনার পর আমরা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলি—অস্ত্র হাতে লড়তে হবে।’

মহান মুক্তিযুদ্ধে তৃণমূলের সংগঠক থেকে রণাঙ্গনের লড়াকু যোদ্ধা হয়ে উঠা আনোয়ার হোসেন খান বলছিলেন কথাগুলো। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় একাত্তরে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। জাতীয় পরিষদ সদস্য ও বরগুনা মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রাক্তন ছাত্রনেতা আসমত আলী সিকদারসহ তাঁরা কয়েকজন ঢাকা থেকে ৯ মার্চ বিকেলে এলাকায় পৌঁছেন। তৃণমূল পর্যন্ত সংগ্রাম কমিটি পুনর্গঠন ও যুবক-কিশোরদের সংগঠিত করে ডামি রাইফেল ও গ্রেনেড দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

আনোয়ার হোসেন জানান, মে মাসে বরগুনা মহকুমায় পাকিস্তানি বাহিনী প্রবেশ করার পর দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। তাঁরা প্রকাশ্যে চলাফেরা বন্ধ করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা ছোট ছোট দলে লক্ষ্য স্থির করে শান্তি কমিটির নেতা ও রাজাকার কমান্ডারদের পর্যুদস্ত করা শুরু করেন। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের আটক করে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসেন। বরগুনা মহকুমার বামনা থানা এভাবেই জুন মাস পর্যন্ত শত্রুমুক্ত রাখতে সক্ষম হন তাঁরা।

জুনের মাঝামাঝি খবর রটে যায় যে ডৌয়াতলা বাজারে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আটকদের ছাড়িয়ে নিতে পাকিস্তানি বাহিনী অভিযান চালাতে আসছে। মুক্তিযোদ্ধারাও প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষায় থাকেন। পাকিস্তানি সেনা সদস্য, মিলিশিয়া, মুজাহিদ ও শান্তি কমিটির মহকুমা পর্যায়ের নেতারা ডৌয়াতলা বাজারে আসার পথে ২০ জুন বিষখালী নদীর চালাভাঙ্গা খালের মুখে তাদের বহনকারী মোটর লঞ্চ ডুবিয়ে দেন আনোয়ার হোসেনসহ এক দল মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার বলেন, ‘জুনের ওই সময়টাতে দাউদখালীর (মঠবাড়িয়া) ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম (পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরিরত) ছুটিতে এসে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ২৮ জুন গভীর রাতে বুকাবুনিয়ার উত্তর প্রান্তে হলতা নদীর পারে আখক্ষেতে প্রায় ৩৫০ জন যুবক-তরুণের উপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের শপথ গ্রহণ করানো হয়। থানা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করানোর দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর। এই সমাবেশে ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমামকে সর্বসম্মতিক্রমে পটুয়াখালী সাবসেক্টরের কমান্ডার ঘোষণা করা হয়।’

আনোয়ার বলতে থাকেন, “জুলাইয়ের শুরুতে সগীর ভাই (সওগাতুল আলম, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য) মুজিবনগর থেকে চিঠি লেখেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করতে হলে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োজন, তারও আগে দরকার প্রশিক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তরুণ-যুবকদের মুজিবনগরে এসে নাম তালিকাভুক্ত করে প্রশিক্ষণ নিতে হবে।’ সে অনুযায়ী ১০/১২ দিন পর আমাদের মধ্য থেকে ৩১ জনকে বাছাই করে পিফা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন সিপার নেতৃত্বে ১৪ দিন প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের পাঠানো হয় ৯ নম্বর সেক্টরের বেইস ক্যাম্প হিঙ্গলগঞ্জে। বেইস ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা প্রায় ৩০০ মুক্তিযোদ্ধার অপারেশন পরিচালনার পাশাপাশি ৯ নম্বর সেক্টরের দ্বিতীয় অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।”

কালীগঞ্জে রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণের কথা বলতে গিয়ে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়েন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ক্যাপ্টেন হুদা, লেফটেন্যান্ট বেগ ও অপারেশন কমান্ডার ওয়াহেদুজ্জামান কালীগঞ্জের নাজিমগঞ্জ রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। ক্যাপ্টেন হুদার ঘরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা দু-তিনজন উপস্থিত ছিলাম।’

আনোয়ার হোসেন বলতে থাকেন, “পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত ৮টার আগেই আমি লেফটেন্যান্ট বেগের ইউনিটে পৌঁছে যাই। মোট ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে চারটি গ্রুপে ভাগ করে একজন করে ট্রুপস কমান্ডার নির্ধারণ করে দেওয়া হলো। সার্বিক নির্দেশনার দায়িত্বে লেফটেন্যান্ট বেগ। তিনি আমাকে সরাসরি ‘খ’ ট্রুপসে রাখলেন। আমরা অস্ত্র সংগ্রহ করে চারটি লাইনে দাঁড়ালাম। লেফটেন্যান্ট বেগ রণাঙ্গনে করণীয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলেন। অতঃপর ক্যাপ্টেন হুদা বললেন—আমাদের পক্ষ থেকে ভারী অস্ত্রের ফায়ার ওপেন হওয়ার পর থেকে আধামাইল দূরত্বে থাকা বিএসএফের পক্ষ থেকে ফায়ারিং চলতে থাকবে। শেষে তিনি শপথবাক্য পাঠ করিয়ে আমাদের পাসওয়ার্ড বলে দিলেন। হৃদয়ে অনুভব করছিলাম ভিন্ন এক শিহরণ—দেশমাতৃকাকে হানাদারমুক্ত করার লড়াইয়ে আমি একজন সশস্ত্র যোদ্ধা।”

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা