kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাংলাদেশি চার কন্যার ইতিহাস গড়া জয়

আহমেদ নূর   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশি চার কন্যার ইতিহাস গড়া জয়

ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে আবার বিজয়ের পর টিউলিপ সিদ্দিক, রুশনারা আলী ও রূপা হক

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের আধিপত্য আরো বিস্তৃত হলো। নিজেদের দলের ভরাডুবির মধ্যেও একসঙ্গে বাংলাদেশি চার কন্যা এমপি নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়লেন। নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দাঁড়িয়ে চমক দেখিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আফসানা বেগম। এ ছাড়া এবার নির্বাচনে জয়লাভ করে হ্যাটট্রিক করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক এবং আরেক বাংলাদেশি রূপা হক। আর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রথম বাঙালি এমপি রুশনারা আলী এবার বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে চতুর্থবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাঁচ নারীকে নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এমন নিরঙ্কুশ বিজয় আর লেবার পার্টির এমন পরাজয় হবে তা কেউ ভাবেনি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বর্তমান এমপি রুশনারা আলী, টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক এবং রূপা হকের পাশাপাশি লেবার পার্টির প্রার্থী আফসানা বেগম এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী বাবলিন মল্লিক—এই পাঁচ বাংলাদেশি কন্যাকে নিয়ে আশাবাদী ছিলেন প্রবাসীরা। তবে এই পাঁচজনের মধ্যে বাবলিন মল্লিক জয়ী হতে পারেননি। বাকি চারজনই জয় ছিনিয়ে এনেছেন। বাংলাদেশের চার কন্যার এই বিজয়ে যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশে বইছে আনন্দের বন্যা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বেড়ে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে চারজন এমপি নির্বাচিত হওয়ায় প্রবাসীরাও উল্লসিত।

টিউলিপ ও রূপা হকের হ্যাটট্রিক : যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক ও রূপা হক। ২০১৫ সাল থেকেই তাঁরা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। লন্ডনের হ্যামস্টেড ও কিলবার্ন আসন থেকে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজের আসন পোক্ত করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। লেবার পার্টির প্রার্থী হয়ে ওই নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৯৭৭ ভোট। আর ২০১৭ সালের নির্বাচনে তিনি পান ৩৪ হাজার ৪৬৪ ভোট।

যুক্তরাজ্যের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কয়েকটি আসনের মধ্যে টিউলিপের আসনটি উল্লেখযোগ্য। লন্ডনের অন্য আসনগুলোর মতো এখানে বাংলাদেশিদের তেমন আধিপত্য নেই। এই আসনে ভোটের ফলাফলের অন্যতম নিয়ামক ইহুদি সম্প্রদায়। তবে এই আসনে তাঁর অবস্থান খুবই পোক্ত। যে কারণে এবারও টিউলিপ দল থেকে মনোনয়ন পান এবং বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। নির্বাচনে ২৮ হাজার ৮০ ভোট পেয়ে জয়ী হন টিউলিপ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির জনি লাক পেয়েছেন ১৩ হাজার ৮৯২ ভোট।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও শফিক সিদ্দিকের মেয়ে টিউলিপ লন্ডনের মিচামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে বাংলাদেশ, ভারত ও সিঙ্গাপুরে। ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি লন্ডনের হ্যাম্পস্ট্যাড অ্যান্ড কিলবার্নে বসবাস করছেন। এই এলাকায় স্কুলে পড়েছেন ও কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পলিটিকস, পলিসি ও গভর্মেন্ট বিষয়ে তাঁর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হওয়া টিউলিপ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্রোর লন্ডন অথরিটি এবং সেইভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গেও কাজ করেছেন। ২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে প্রথম বাঙালি নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি।

নির্বাচনে জয়লাভের পর টিউলিপ এক টুইট বার্তায় তাঁর নির্বাচনী আসনের ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি টুইটার বার্তায় জানিয়েছেন, ‘আমাকে পুনরায় নির্বাচিত করায় হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্নের ভোটারদের আরেকবার ধন্যবাদ। আমার ভোটার ও পরিবারকে ধন্যবাদ। কিন্তু জাতীয় ফলাফল বিশেষ করে অনেক মেধাবী এমপি হেরে যাওয়ায় দুঃখ লাগছে। সামনে কঠিন সময়। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের পাবনার মেয়ে রূপা হক। এ নিয়ে টানা তিনবার তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হলেন। রূপা হক ২৮ হাজার ১৩২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির জুলিয়ান গেল্যান্ট পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৩২ ভোট।

রূপার বাবা মোহাম্মদ হক এবং মা রওশন আরা হক ১৯৭০ সালে ব্রিটেনে পাড়ি জমান। তাঁদের মূল বাড়ি পাবনা শহরের কুঠিপাড়ায়। রূপার জন্ম লন্ডনে। তিন বোনের মধ্যে সবার বড় রূপা। রাজনীতিতে আসার আগে লন্ডনে কিংসটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন তিনি। জাতীয় বিভিন্ন ইস্যু এমনকি নিজের দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সরাসরি বক্তব্য ও পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে তাঁকে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বোরকা নিয়ে করা তীর্যক মন্তব্যের জন্য নিজের কলামে বরিস জনসনকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। 

প্রথমবারেই আফসানার চমক : জীবনে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে চমক দেখিয়েছেন আরেক বাংলাদেশি কন্যা আফসানা বেগম। বাংলাদেশি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের পপলার অ্যান্ড লাইমহাউস আসন থেকে তিনি নির্বাচন করেন। এই আসনটি সব সময় লেবার পার্টির দখলে থাকে। এবার এই আসনে লেবার পার্টির প্রার্থী হন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আফসানা বেগম। এর আগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কেউ এই আসনে মনোনয়ন পাননি। গত ২২ বছর ধরে এই আসনে লেবার পার্টির এমপি ছিলেন জিম ফিটজপেট্রিক। তিনি আর নির্বাচন না করার ঘোষণা দিলে এ আসনটিতে কোনো নারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেয় লেবার পার্টি। এ অবস্থায় দলের সোমালি বংশোদ্ভূত অন্য প্রার্থী আমিনা আলীকে পরাজিত করে আফসানা মনোনয়ন লাভ করেন। আফসানার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায়। তাঁর জন্ম লন্ডনেই। তাঁর বাবা মনির উদ্দিন আহমদ একসময় টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলর ছিলেন।

নির্বাচনে ৩৮ হাজার ৬৬০ ভোট পেয়ে আফসানা নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী শন ওক পান মাত্র ৯ হাজার ৭৫৬ ভোট। আফসানা জয়ী হওয়ায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপির সংখ্যা বেড়ে চারজন হলো। জয়লাভের পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি তাঁর আসনের ভোটার, সমর্থক এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

রুশনারা আলীর চতুর্থ জয় : ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাদেশি নারী এমপি রুশনারা আলী। ২০১০ সালে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে মোট ভোটারের ৪২.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি হন রুশনারা। ২০১৫ সালে তাঁর ভোট আরো বাড়ে। মোট ভোটের ৬১.০২ শতাংশ ভোট পান তিনি। আর ২০১৭ সালে তিনি আরো অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। মোট ভোটারের ৭১.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন রুশনারা আলী। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪২ হাজার ৯৬৯। আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী পেয়েছিলেন মাত্র সাত হাজার ৫৭৬ ভোট। এবার তিনি আরো বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। লন্ডনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি। ৪৪ হাজার ৫২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির নিকোলাস স্টোভোল্ট পেয়েছেন মাত্র ছয় হাজার ৫২৮ ভোট।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের প্রবাসী আফতাব আলী ও রানু বেগম দম্পতির দ্বিতীয় কন্যা রুশনারা আলী। মাত্র সাত বছর বয়সে স্থানীয় ভূরকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী রুশনারা আলী মা-বাবার সঙ্গে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে তিনি লন্ডনের মালবেরি স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শনশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় রুশনারা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমার এই জয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন।’ তবে নিজের দলের পরাজয়ে তিনি মর্মাহত বলেও জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা