kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ

আলবদর রাজাকারদের দায় চিহ্নিত হয়নি

একাত্তরের ঘাতক সংগঠনের বিচার-১

আজিজুল পারভেজ   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আলবদর রাজাকারদের দায় চিহ্নিত হয়নি

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ছিল জামায়াতে ইসলামীর গুপ্ত ঘাতক সংগঠন আলবদর বাহিনী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে এটি প্রমাণিত হলেও আলবদরসহ ঘাতক-সহযোগী কোনো সংগঠনের দায়ই চিহ্নিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধকালে আলবদর বাহিনীর তৎপরতা, সদস্যদের পরিচয় এবং গণহত্যায় এ সংগঠনের দায় চিহ্নিত করা জরুরি বলে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, গবেষক ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

আজ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একাত্তরের এই দিনে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল ঘাতক আলবদর বাহিনী। এতে সহায়তা করেছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনী।

শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর স্বামী ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছিল মাওলানা মান্নানের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী। এখন মান্নান বেঁচে না থাকায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। কিন্তু আলবদর বাহিনীর বিচার হলে স্বামী হত্যার বিচারের সান্ত্বনা পেতেন। তিনি বলেন, সংগঠন

হিসেবে আলবদর বাহিনীর বিচার হওয়া, এদের দায় চিহ্নিত হওয়াটা জরুরি।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি সাহিত্যিক-গবেষক শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একাত্তরে সবচেয়ে বেশি অপরাধ করে জামায়াতে ইসলামীর বিশেষায়িত ঘাতক বাহিনী আলবদর। ব্যক্তির পাশাপাশি সংস্থার বিচার ও দায় চিহ্নিত না হলে যুদ্ধাপরাদের বিচারই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করে আলবদর বাহিনীর দায় এবং সারা দেশের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

আলবদরকে যে সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল তার দালিলিক প্রমাণও আছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান জানিয়েছেন, আলবদর বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল বলে তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমা রাজাকার বাহিনীর আগস্ট মাসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর মতে, আলবদর বাহিনীকেও ভাতা দেওয়া হতো। আর সেটা দিতেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারাই। সম্ভবত তাঁরা ওই টাকা সামরিক শাসকদের কাছ থেকেই পেতেন। তিনি জানান, সারা দেশ থেকে আসা মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করতে গিয়ে তাঁরা দেখেছেন, একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধীদের মধ্যে আলবদর বাহিনীই ছিল সবচেয়ে নৃশংস। তাদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে সবচেয়ে বেশি মানুষ। তৎকালীন প্রায় প্রতিটি জেলা ও মহকুমায়ই আলবদর বাহিনীর তৎপরতা ছিল।

পাকিস্তানি গবেষক সালিম মনসুর খালিদের ‘আলবদর’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক আজাদুর রহমান চন্দন বলেন, বইটিতে উল্লেখ আছে, আলবদর বহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সেই সঙ্গে মাথাপিছু ৯০ টাকা করে মাসিক ভাতাও দেওয়া হতো। তিনি আরো বলেন, ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে আলবদর বাহিনীকে উগ্র মুসলিমদের একটি গোপন কমান্ডো ধরনের সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ দল এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিত এবং পরিচালনা করত। ওই সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন ক্যাপ্টেন তাহির। 

বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি ‘পাকিস্তান শাহীন ফৌজ’-এর সদস্য ছিলেন। এই সংগঠনের সদস্যদের ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্য হিসেবে গণ্য করা হতো। সেই হিসেবে ইসলামী ছাত্রসংঘের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মতলিব ১ আগস্ট ১৯৭১ তাঁকে লেখা এক চিঠিতে বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্রসংঘের সকল নেতাকর্মীকে আলবদর বাহিনীতে যোগদানের জন্য সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। আগামী ১০ আগস্ট আপনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মৌলভীবাজার কমান্ডের অফিসে সকাল ১০টার মধ্যে মেজর ফখরুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করিয়া যোগদানপত্র গ্রহণ করিবেন।’ চিঠিতে উল্লেখ ছিল, ‘যাহারা বদর বাহিনীতে যোগ দিবেন না তাহারা ছাত্রসংঘের কর্মী হিসেবে বিবেচিত হইবেন না।’

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী বলেন, একাত্তরে সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল জামায়াতের এই বাহিনী। ইতিহাসের স্বার্থে এই সংস্থার দায় এবং সারা দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করা উচিত।

আলবদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণাকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বলেন, এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীন আলবদর বাহিনীর একটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। আশরাফুজ্জামান ছিলেন বুদ্ধিজীবী নিধন পরিকল্পনার ‘চিফ এক্সিকিউটর’, মঈনুদ্দীন ছিলেন ‘অপারেশন ইনচার্জ’। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর ঘোষিত এই রায়ে একাত্তরের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যার দায়ে ওই দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু ঘাতকরা বিদেশে পালিয়ে থাকায় তা এখনো কার্যকর হয়নি। নাখালপাড়ায় আশরাফুজ্জামানের বাড়ি থেকে একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করেছিল মুক্তিবাহিনী। ডায়েরির দুটি পৃষ্ঠায় ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ছিল, যাঁদের মধ্যে আটজনকে হত্যা করা হয়।

রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জামায়াতে ইসলামীর মস্তিষ্কপ্রসূত ঘাতক বাহিনী আলবদর একাত্তরে বুদ্ধিজীবী নিধনের যে নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছে, তা গোটা জাতির বুকে ক্ষত হয়ে আজও রক্ত ঝরাচ্ছে।’

আলবদর গুপ্ত ঘাতক বাহিনী হওয়ায় এর আত্মপ্রকাশের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যায়, জামায়াতে ইসলামী তাদের আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে ইসলামী ছাত্রসংঘকে দিয়ে এই বাহিনী গঠন করেছিল। ইসলামী ছাত্রসংঘকেই আলবদর বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়েছিল। একাত্তরের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে আলবদর বাহিনী আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করেছিল জামালপুরে। ২২ এপ্রিল জামালপুরে পাকিস্তান বাহিনীর পদার্পণের পরপর ময়মনসিংহ জেলা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মুহম্মদ আশরাফ হোসাইনের নেতৃত্বে এটি আত্মপ্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আলবদর একটি নাম! একটি বিস্ময়।...যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী আলবদর সেখানেই!...ভারতীয় চর বা দোষ্কৃতকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল।’

দৈনিক সংগ্রামে ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইসলামী ছাত্রসংঘের তখনকার কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে। পাকসেনাদের এ দেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ ছাত্রসমাজ বদর যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আলবদর বাহিনী গঠন করেছে। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩১৩। এই স্মৃতিকে অবলম্বন করে ৩১৩ জন যুবকের সমন্বয়ে এক একটি ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

নিজামী ছাড়াও ইসলামী ছাত্রসংঘের তৎকালীন অন্য নেতারাও যে আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সে তথ্যও পাওয়া যায় তৎকালীন সংবাদপত্রের বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে। দৈনিক সংগ্রামের ১৬ আগস্টের এক রিপোর্টে ইসলামী ছাত্রসংঘ নেতা কামারুজ্জামানকে আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার তৎকালীন সভাপতি, পরে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদকে দৈনিক আজাদে ১১ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি ছবির ক্যাপশনে আলবদর প্রধান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক খালেক মজুমদারও ছিলেন একজন আলবদর কমান্ডার। তিনি শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত।

চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মামলায় প্রমাণিত হয়েছে, ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ছিল আলবদর বাহিনীর সদর দপ্তর। আর তখনকার জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার আমির গোলাম আযম ১৭ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে রাজাকার ক্যাম্প পরিদর্শন করেন বলে ১৯ সেপ্টেম্বর ’৭১ দৈনিক সংগ্রামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

গবেষক আজাদুর রহমান চন্দনের মতে, জামায়াতে ইসলামী কৌশলগত কারণে আলবদর বাহিনীকে রাজাকার বাহিনীর শাখা হিসেবে প্রচার করত। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রায় সারা দেশেই আলবদর বাহিনী গড়ে ওঠার বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ চন্দন তাঁর ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন।

বাংলাদেশ ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রধান ডা. এম এ হাসান বলেন, ‘আলবদর বাহিনীকে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দিত পাকিস্তান বাহিনী। অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিত, মাসিক ভাতা দিত। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে বিভিন্ন অপারেশনে যেত আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। যাদেরকে শত্রু মনে করত তারা, তাদের সম্পর্কে খবরাখবর নিত, তুলে নিয়ে যেত এবং গোপন হত্যাকাণ্ড চালাত। কখনো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতেও তুলে দিত।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরীর মতে, সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান বাহিনী ভেতর থেকে কোনো প্রতিরোধ হবে বলে ভাবেনি। তাদের প্রস্তুতিও ছিল না। কিন্তু সারা বাংলাদেশে প্রতিরোধ শুরু হলে দেশের পুনর্নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দরকার পড়ে তাদের। তারা বুঝতে পারে পুরো বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তখন তাদের যে সহায়ক ছিল তাদের নিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়েছিল।’ তিনি জানান, আলবদর তৈরি হওয়ার পর এই বাহিনী মূলত শহরাঞ্চলে কাজ করে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা