kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

মিলিশিয়াদের গুলি করে নদীতে ফেলে দিই

মুস্তফা নঈম, চট্টগ্রাম   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিলিশিয়াদের গুলি করে নদীতে ফেলে দিই

মুক্তিযোদ্ধা মহসিন খান

‘নভেম্বরের মাঝামাঝিতে কর্ণফুলী নদীর চর পাথরঘাটায় দুটি পাকিস্তানি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া, আনোয়ারা থানায় পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও রাজাকার ক্যাম্পে অপারেশন শেষে ১৫-১৬ জনকে আটকের পর চানখাঁর পুলে এনে গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া ছাড়াও রণাঙ্গনে প্রতিটি অপারেশনের ঘটনা আজও চোখের সামনে ভাসে। অপারেশনে গিয়ে বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। চোখের সামনে পাশের সহযোদ্ধাকে শাহাদাত বরণ করতে দেখেছি। আর পটিয়া থানায় অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি বাহিনী, তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর ও থানায় কর্মরত পাকিস্তানি পুলিশ সদস্যদের মনোবলে চূড়ান্ত ধাক্কাটা দিয়েছি ১৩ ডিসেম্বর থানার পুকুরের মাঝখানে বাঁশের মাথায় লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে।’

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কথাগুলো বলেছেন পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রাম এলাকার মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার মহসিন খান। যুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা তাঁর স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া ছাড়াও বোয়ালখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালী, বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় ১২টি সফল অপারেশন পরিচালনা করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। এসব অপারেশনে হানাদার বাহিনীর বহু সদস্য ও তাদের সহযোগী হতাহত হয়। অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটক হয়।

মহসিন খান একাত্তরে চট্টগ্রামের স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ছিলেন ছাত্রলীগ কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে। ২৫ মার্চের পর চট্টগ্রাম শহরে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একপর্যায়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট সেতু ও বোয়ালখালী এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় মহসিন খান ও অন্যরা তাঁদের নানাভাবে সহায়তা করেন।

কালুরঘাট থেকে বাড়ি ফেরার পর এস এম ইউসুফের চিঠি পান মহসিন খান। সেই চিঠি নিয়ে তিনি ফ্লাইট সার্জেন্ট এ এইচ এম মহি আলমসহ হুলাইন এলাকার রফিকের বাড়িতে একত্র হয়ে এপ্রিলের শেষ দিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাড়ি ছাড়েন। হেঁটে ফেনী হয়ে দুই দিন পর ভারতের শ্রীনগরে পৌঁছেন। সেখান থেকে যান ত্রিপুরার হরিণা ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে এসএলআর, থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি, এসএমজি, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার, চায়নিজ স্টেনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র পরিচালনায় এক মাস ট্রেনিং নেন মহসিন খান। জুন মাসের শেষের দিকে তাঁদের আট-দশজনের একটি দল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিলাইছড়ি হয়ে দেশে প্রবেশ করে।

বৈষ্ণবপুর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের সময় ফটিকছড়ির দুটি ও রাঙ্গুনিয়ার একটি গ্রুপ, বোয়ালখালীর আবুল হোসেন গ্রুপ, দক্ষিণ পটিয়ার মনজুরুল হক গ্রুপ, আনোয়ারার কাজী ইদ্রিস ও ফজল গ্রুপ এবং মহসিন খানের গ্রুপ একসঙ্গে ছিল। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মোট সংখ্যা ছিল ১১০। মুক্তিযোদ্ধদের গাইড ও পরিচালক ছিলেন বিমানবাহিনীর ফ্লাইট সার্জেন্ট এ এইচ এম মহি আলম। তাঁকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মহসিন খান পটিয়ার কমান্ডারের দায়িত্ব পালন ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামে আঞ্চলিক গ্রুপের সহকারী কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম ছিল মেজর রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ১ নম্বর সেক্টর।

আলাপচারিতায় মহসিন খান তাঁদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অপারেশনের ঘটনা তুলে ধরেন। এর মধ্যে আনোয়ারা থানা অপারেশন একটি। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন সার্জেন্ট মহি আলম। আগস্টে পরিচালিত ওই অভিযানে থানায় অবস্থানকারী পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি পরাস্ত হয়। হতাহত হয় বহু সেনা ও পুলিশ। আটক করা হয় ১৫-১৬ জন পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও রাজাকারকে। পরে তাদের স্থানীয় চানখাঁরপুল এলাকায় এনে গুলি করে খালে ফেলে দেওয়া হয়।

নভেম্বরের মাঝামাঝি মুক্তিযোদ্ধারা গোপন খবরে জানতে পারেন পটিয়া থেকে পাকিস্তানি সেনা ও সহযোগী মিলিশিয়া এবং রাজাকার বাহিনীর বড় একটি দলের কনভয় চট্টগ্রামে আসছে। মহসিন খান ও শাহ আলমের গ্রুপ যৌথভাবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের গৈড়ালার টেক এলাকায় অবস্থান নেয়। হানাদার বাহিনীর কনভয় মুক্তিযোদ্ধাদের সীমার মধ্যে পৌঁছলে তারা গুলিবর্ষণ শুরু করে। দুই পক্ষে ব্যাপক গোলাগুলির একপর্যায়ে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে যায়। বেশ কিছু সেনা হতাহত হয়।

যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম একটি অভিযান ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ব্যবহৃত জাহাজে আক্রমণ। মহসিন খানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের নৌ কমান্ডো গ্রুপ কর্ণফুলী নদীর চর পাথরঘাটা এলাকায় অবস্থান করা দুটি জাহাজ ডিনামাইটের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ডুবিয়ে দেয়।

বাঁশখালী থানার সাধনপুর ইউনিয়ন অফিসে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের ক্যাম্পে সার্জেন্ট মহি আলমের নেতৃত্বে মহসিন খানের গ্রুপ আক্রমণ চালায়। দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে এই অভিযানে ফ্লাইট সার্জেন্ট মহি আলম শহীদ হন, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল বিরাট ক্ষতি।

মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা মহসিন খান ১৯৫০ সালের ১১ নভেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। হাজি মনির আহমদ ও আলিমুন্নেছা দম্পতির চতুর্থ সন্তান মহসিন খান পাঁচ সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার লিপি একজন স্কুল শিক্ষক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা