kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভারতে নাগরিকত্ব বিলবিরোধী ক্ষোভ

জ্বলছে আসাম, কারফিউ ভেঙে রাস্তায় মানুষ

► পুলিশের গুলিতে নিহত ৩
► গুয়াহাটিতে বাংলাদেশি দূতের গাড়িবহরে হামলা, ঢাকার প্রতিবাদ, দূতালয়ের নিরাপত্তা জোরদার

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জ্বলছে আসাম, কারফিউ ভেঙে রাস্তায় মানুষ

ভারতীয় পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) পাস হওয়ার পর থেকেই উত্তাল হয়ে উঠেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম। রাজধানী গুয়াহাটিতে গতকাল বৃহস্পতিবার কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ গুলি ছুড়লে তিনজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। এরই মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে রেল যোগাযোগ। বাতিল করা হয়েছে বহু ফ্লাইট। আসামে গত বুধবারই সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। গুজব ছড়ানো বন্ধের কথা বলে ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও সাধারণ মানুষকে শান্ত করতে গতকাল টুইট করেন নরেন্দ্র মোদি। তবে তাঁর আবেদন কয়জনের কাছে পৌঁছেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আমাদের কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, আসাম রাজ্যের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনারের গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। এ ছাড়া সহকারী হাইকমিশনের দুটি পথনির্দেশক খুলে ফেলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল রাত ১০টার দিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ভারতের সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধন বিল গৃহীত হওয়ার পর আসামে সহিংসতা ও কারফিউর পরিপ্রেক্ষিতে গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি বাংলাদেশের দূতালয় থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরের দুটি পথনির্দেশক খুলে ফেলেছে। এ বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। গত বুধবার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাযান বিমানবন্দর থেকে শহরে আসার পথে নাগরিকত্ব সংশোধন বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের হামলার মুখে পড়ে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সহকারী হাইকমিশনারের গাড়িবহরে হামলা ও পথনির্দেশক চিহ্ন ভাঙচুরের প্রতিবাদ জানান।’

ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব ভারত সরকারকে বাংলাদেশ মিশনের কর্মী ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশন এবং আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা জোরদারে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে ভারতীয় হাইকমিশনার আশ্বাস দেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে সহকারী হাইকমিশন, এর কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বর্ধিত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বাস করে, সহকারী হাইকমিশনারের গাড়িবহরে হামলা এবং দূতালয়ের পথনির্দেশক বিনষ্ট করা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না।’

মূলত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে শরণার্থী হিসেবে যাওয়া হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ও পার্সি—এ ছয় ধর্মে বিশ্বাসী মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে এই বিল তোলা হয়। নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে মুসলমানদের। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ভারতের নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে ১১ বছর দেশটিতে থাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছিল। এ সুযোগ মুসলমানদের জন্যও অবারিত ছিল। নতুন প্রস্তাবে সেই সময় কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। সেই হিসেবে প্রতিবেশী দেশ থেকে ২০১৪ সালের আগে যাওয়া এসব মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকজনকে নাগরিকত্ব দিতে চায় ভারত। সে লক্ষ্যেই বিলটি গত সোমবার লোকসভায় তোলা হয়। প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পাস হয়। যদিও আলোচনা রয়েছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্বই নিশ্চিত করতে চাইছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। কারণ এরা বিজেপির ভোটব্যাংক হিসেবে কাজ করে।

সিএবি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ওঠার পর থেকেই আসামে বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে গতকাল তা চরম আকার ধারণ করে। কারফিউ ভেঙে মানুষ রাস্তায় নেমে এলে পুলিশ গুলি ছোড়ে, এতে আহত হয় পাঁচজন। তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনজনের মৃত্যু হয়। আর গত তিন দিনে ৪০ জন আহত হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্র জানায়, গুয়াহাটির লালুঙগাঁওয়ে এ দিন বিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পুলিশ। এ সময় তারা গুলি ছোড়ে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অন্যদিকে ছাবুয়ায় এক বিজেপি বিধায়কের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে। ওই এলাকায় একটি দপ্তরেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) এবং কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি (কেএমএসএস)। গত সোমবার এরাই ধর্মঘটের ডাক দেয়।

এমন পরিস্থিতিতে গুয়াহাটির পুলিশ কমিশনার দীপক কুমারকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ হিংসাত্মক আকার ধারণ করায় গতকাল থেকেই অবরুদ্ধ আসাম। রেল যোগাযোগ বন্ধ। গতকাল বহু ফ্লাইটও বাতিল করা হয়। গতকাল গুয়াহাটিতে রণজি ট্রফির একটি ফুটবল ম্যাচও বাতিল করা হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টুইটারে আসামবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অসমিয়া ভাষায় তিনি লেখেন, ‘সিএবি নিয়ে আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। কেউ আপনাদের অধিকার কাড়তে পারবে না। আপনাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির ওপর কোনো আঘাত আসবে না।’ গত সোমাবার থেকেই আসামে ইন্টারনেট বন্ধ। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এ টুইটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও শান্তি বজায় রাখার আর্জি জানান সাধারণ মানুষের কাছে। বিজেপির জেলা স্তরের নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে যা তথ্য রয়েছে, তাতে এ রাজ্যে পাঁচ লাখের বেশি অনুপ্রবেশকারীকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না। তাই আমাদের সংস্কৃতির এবং ঐতিহ্যের কোনো সংকট দেখা দেবে না।’

তবে প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর এসব বক্তব্যের প্রভাব আসামের সাধারণ মানুষের মধ্যে পড়েনি বললেই চলে। আসুর উপদেষ্টা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য গতকাল এক সভায় বলেন, ‘এই বিল পাস করে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী আসামের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আসাম ভাগাড় নয় যে সব আবর্জনা এখানেই ফেলতে হবে।’ তারা ১২ ডিসেম্বরকে ‘কালো দিবস’ ঘোষণা করে। এই বিল প্রত্যাহারের দাবি করে তারা।

প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করলেই বিলটি আইনে পরিণত হবে, যা একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তবে এ আইন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখুনি নিশ্চিত করে বলা যায় না। এরই মধ্যে এ বিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ। তাদের সঙ্গে এ বিলের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোও রয়েছে। তাদের প্রতিনিধি পি কে কুহালিকুত্তি বলেন, ‘সংবিধানে বর্ণ, ধর্ম বা অন্য কিছুর ওপর ভিত্তি করে বৈষম্য করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইনে সিএবি টিকবে না।’ লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই বিল ‘গোঁড়ামিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করে বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে। সূত্র : এএফপি, বিবিসি, পিটিআই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা