kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় আগুন

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ আশঙ্কাজনক ১৮ জন

► কারখানা বাঁচাতে জীবন দিলেন শ্রমিকরা
► মৃতরা ১ লাখ, চিকিৎসাধীনরা ৫০ হাজার টাকা পাবেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ আশঙ্কাজনক ১৮ জন

সহকর্মী অনেকেই না-ফেরার দেশে। নিজেও ‘জীবন-মরণ যুদ্ধে’। কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় আগুনে দগ্ধদের একজন। গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৩ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে একজন ঘটনাস্থলে, অন্য ১২ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছেন। একজন হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন ১০ জন। আর বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন আটজন। মৃতরা হলেন জাহাঙ্গীর, ইমরান, বাবলু, রায়হান, খালেক, সালাউদ্দিন, সুজন, জিনারুল ইসলাম, আলম, জাকির হোসেন, ফয়সাল, মেহেদী ও ওমর ফারুক।

এ ঘটনা তদন্তে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে একটি এবং ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা বলছেন, দগ্ধদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। অগ্নিদগ্ধ ও তাঁদের স্বজনরা জানিয়েছে, নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে শ্রমিকরা কারখানার আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেমিক্যালের এই আগুন নেভানো তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। উল্টো তাঁরাই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর পথে এগিয়ে গেছেন।

গত বুধবার বিকেলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকার প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। এতে ঘটনাস্থলে মারা যান একজন। ৩১ জনকে ঢাকা মেডিক্যালের শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। গভীর রাত থেকে ভর্তি থাকা দগ্ধরা মারা যেতে শুরু করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ১২ জন মারা যান। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সন্ধ্যায় স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বিকেলে মর্গের সামনে দেখা যায়, লাশ পেতে দেরি হওয়ায় স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তারা বলছে, হাসপাতাল থেকে তারা সহযোগিতা পাচ্ছে না।

গতকাল জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন সাংবাদিকদের জানান, চাকরি জীবনে তিনি এমন ভয়াবহ পোড়া রোগী দেখেননি। সবার শ্বাসনালি পোড়া। হাসপাতালে যাঁরা ভর্তি রয়েছেন তাঁদের কেউই আশঙ্কামুক্ত নন।

জানা গেছে, কারখানাটিতে বিরিয়ানির প্লেট, প্যাকেট ও একবার ব্যবহার উপযোগী (ওয়ান টাইম ইউজ) গ্লাস তৈরি করা হতো। পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম কারখানাটির মালিক। কারখানায় কর্মীর সংখ্যা ৩০০। যে ইউনিটে আগুন লাগে, সেখানে ৮০ জন কর্মরত ছিলেন।

দগ্ধদের ১০ জনের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, দগ্ধদের মধ্যে আলম, জিনারুল ইসলাম, ফারুক, মেহেদী ও রাজ্জাকের শরীরের শতভাগ পুড়ে গেছে। ৯০ শতাংশ পুড়েছে দুর্জয় ও সুজনের। ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পুড়েছে ১০ জনের।

কারখানা বাঁচাতে চেয়েছিলেন তাঁরা : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগুন লাগার পর শ্রমিকরা বাঁচার জন্য দ্রুত বেরিয়ে না গিয়ে বরং কারখানা বাঁচাতে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্লাস্টিক কারখানায় কেমিক্যাল থাকার কারণে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। যখন তাঁরা বাঁচার চেষ্টা করেন তখন চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। আর সেই আগুন থেকে বের হতে গিয়ে শ্বাসনালিসহ দেহের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যায়।

অগ্নিদগ্ধ জাকির হোসেন (২২) বুধবার রাতে সাংবাদিকদের জানান, চার বছর ধরে তিনি এই কারখানায় কাজ করছেন। মাসিক বেতন ১২ হাজার টাকা। তিনি চুনকুটিয়া এলাকার আবুল হোসেন মাতব্বরের ছেলে। অগ্নিকাণ্ডে জাকিরের মুখমণ্ডল, দুই হাত ও দুই পা পুড়ে গেছে। তিনি জানান, কারখানায় দুই শিফটে ৩০০ শ্রমিক কাজ করেন। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১৫০ জন, বাকিরা রাতে। ঘটনার সময় তিনি প্যাকেজিং সেকশনে কাজ করছিলেন। গ্যাস রুমে সিলিন্ডার মেরামত করা হচ্ছিল। তখনই আগুন লাগে।

অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১০ হাজার স্কয়ার ফিট কারখানাটির ভেতরের সব মালপত্র ও যন্ত্রাংশ পুড়ে গেছে। এর আগেও কারখানাটিতে দুবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

দুটি তদন্ত কমিটি : এ ঘটনা তদন্তে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোল্লা জালাল উদ্দিনকে প্রধান করে গঠিত কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। গতকাল সকালে শ্রমসচিব কে এম আলী আজম ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে যান এবং সেখানে চিকিৎসাধীন শ্রমিকদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। পরে তিনি কেরানীগঞ্জে অগ্নি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

মৃতদের পরিবার ১ লাখ ও দগ্ধদের পরিবার ৫০ হাজার টাকা পাবে : কেরানীগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, এ ঘটনায় মৃতদের পরিবার এক লাখ টাকা এবং আহত প্রত্যেকের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিল থেকে এ সহায়তা দেওয়া হবে।

কারখানা মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—স্বাস্থ্যমন্ত্রী : কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন সব রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ভার সরকার বহন করবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অগ্নিদগ্ধ আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বেশির ভাগ ভবন মালিক সরকারি নির্দেশনা মেনে কলকারখানা নির্মাণ করেননি, আবার কারখানা মালিকরাও অগ্নিপ্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। এ বিষয়টি আর মেনে নেওয়া হবে না। এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ আদায়ে ভবন মালিক ও কারখানা মালিকের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে।

এ সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন, শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন ও বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. আহমেদুল কবীর উপস্থিত ছিলেন।

তিনটি কারখানা ও একটি ৬ তলা হেলে পড়া ভবন সিলগালা : কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরা ইউনিয়নের বন্দর ডাকপাড়া এলাকায় হেলে পড়া একটি ছয়তলা ভবনসহ তিনটি কারখানা সিলগালা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কারখানা তিনটি হলো জিনজিরা ইউনিয়নের ডাকপাড়া এলাকার ওয়াকিয়া প্লাস্টিক কারখানা, জান্নাত স্টিল মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লি. ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার চুনকুটিয়া হিজলতলায় অগ্নিকাণ্ড ঘটা কারখানার মালিক নজরুল ইসলামের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের দারুসসালাম এলাকার আরেকটি কারখানা।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ ও কেরানীগঞ্জ সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুল হাসান সোহেল। হেলে পড়া ভবনের মালিকের নাম আজাদ হোসেন। গতকাল দুপুরে এ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা