kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

আইসিজেতে শুনানি শেষ, রায়ের অপেক্ষা

সুস্পষ্ট জেনোসাইড : গাম্বিয়া, মামলাই চলে না : মিয়ানমার

‘জেনোসাইডের ইঙ্গিত সু চির বক্তব্যেই’
‘যৌন সহিংসতা খারাপ। এটি সারা বিশ্বেই হয়’

মেহেদী হাসান   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সুস্পষ্ট জেনোসাইড : গাম্বিয়া, মামলাই চলে না : মিয়ানমার

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ হিসেবে গাম্বিয়ার উপস্থাপন করা স্থিরচিত্র (ইনসেটে) দেখে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও তাঁর আইনজীবী দল। ছবি : সংগ্রহ

“মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতারা ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি বলেন না। মিয়ানমারের এজেন্টও (মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি) বলেননি। শুধু আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি, সংক্ষেপে আরসার নাম বলতে গিয়ে তিনি রোহিঙ্গা বলেছেন। এতেও প্রমাণিত হয় যে রোহিঙ্গাদের স্বীকার করতেই তাঁদের আগ্রহ নেই।” গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবী পল রেইখলার গতকাল বৃহস্পতিবার হেগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস, সংক্ষেপে আইসিজে) যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব কথা বলেন।

জেনোসাইডের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় অন্তর্বর্তী আদেশের আবেদনের ওপর নির্ধারিত শুনানি পর্বে গতকাল ছিল তৃতীয় ও শেষ দিন। বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত গাম্বিয়া তার যুক্তি উপস্থাপন করে। এরপর রাত সাড়ে ৯টা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা যুক্তি উপস্থাপন করে মিয়ানমার। সু চিসহ মিয়ানমার পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করারই কোনো অধিকার গাম্বিয়ার নেই। গাম্বিয়ার আবেদন অনুযায়ী অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তাঁরা বলেন, যৌন সহিংসতা খারাপ। তবে এটি সারা বিশ্বেই হয়।

সু চি বলেন, তিনি মিয়ানমারে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন। আইসিজের কাছে মিয়ানমার এমন রায় প্রত্যাশা করে, যা মিয়ানমারে ঐক্য গড়তে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, ‘২০১৬-১৭ সালের মতো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত আবার শুরু হোক, আমরা তা চাই না।’ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো মিয়ানমারেও সামরিক আদালতে সামরিক সদস্যদের বিচারব্যবস্থা চালু আছে উল্লেখ করে সু চি বলেন, সামরিক বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর সুযোগ না দিয়ে তা আন্তর্জাতিকীকরণ করা উচিত নয়।

শুনানি শেষে আইসিজের প্রেসিডেন্ট ইউসুফ যত দ্রুত সম্ভব উন্মুক্ত আদালতে রায় দেওয়া হবে বলে জানান। তিনি আরো জানান, রায়ের তারিখ যথাযথ প্রক্রিয়ায় জানানো হবে।

জেনোসাইডবিরোধী সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে গত মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারকে আইসিজের কাঠগড়ায় তোলে গাম্বিয়া। পরদিন মিয়ানমার তার যুক্তি উপস্থাপনের সময় দাবি করে, জঙ্গি দমন অভিযান চালাতে গিয়ে কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিছু বাড়াবাড়িও হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলো কোনোভাবেই জেনোসাইড নয়। অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং মিয়ানমারের জেনোসাইডের আলামত চিহ্নিত করতে গাম্বিয়া ব্যর্থ হয়েছে বলেও দাবি করে মিয়ানমার।

এর জবাবে গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবী পল রেইখলার গতকাল আইসিজেতে বক্তব্য উপস্থাপনকালে বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইডের আলামত ও ঝুঁকি হিসেবে গাম্বিয়া যেসব নির্দেশকের কথা আদালতে উল্লেখ করে, মিয়ানমার সেগুলো অস্বীকার করতে পারেনি। তিনি বলেন, সাতটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশক যাচাই করে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিদেনে যে ‘জেনোসাইডাল ইন্টেন্ট’ (জেনোসাইডের উদ্দেশ্য) চিহ্নিত করা হয়েছে, মিয়ানমার তা প্রত্যাখ্যান বা চ্যালেঞ্জ করেনি। জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দল রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর (তাতমাদাও) ব্যাপক মাত্রায় বর্বরতার তথ্য তুলে ধরেছে। মিয়ানমার আইসিজেতে তাতমাদাওয়ের বর্বরতা অস্বীকার করেনি। তিনি আরো বলেন, ‘সশস্ত্র সংঘাত কখনো জেনোসাইডের অজুহাত হতে পারে না।’

পল রেইখলার বলেন, এই মামলায় মিয়ানমারের এজেন্ট সু চি নিজেই বলেছেন যে অনুপাতহীন বল প্রয়োগের কথা নাকচ করা যায় না। রোহিঙ্গাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ধারাবাহিক উদ্যোগের বিষয়টিও মিয়ানমার নাকচ করেনি। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর যৌন সহিংসতার বিষয়ে আমরা মিয়ানমারের কাছ থেকে একটি শব্দও শুনিনি। কারণ এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগই নেই।’

রোহিঙ্গা জেনোসাইডের লক্ষ্যে মিয়ানমার বাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ প্রসঙ্গে গাম্বিয়ার পক্ষের ওই আইনজীবী বলেন, তাতমাদাওপ্রধানের ফেসবুক থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজটি (শত্রুকে মেরে ফেলা) করতে বলা হয়েছে। বৈষম্যমূলক পরিকল্পনা ও নীতি, নাগরিকত্ব আইন ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায় রাখাইন রাজ্যের জনতাত্ত্বিক চিত্র বদলে দেওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার ব্যাপারে সরকার কেন সহিষ্ণুতা দেখিয়েছে তার ব্যাখ্যা মিয়ানমার দিতে পারেনি।

পল রেইখলার বলেন, ‘সু চি নিজেই বলেছেন যে ২০০৮ সাল থেকে মিয়ানমারে সামরিক বিচার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এসব অপরাধের বিচার ফৌজদারি ব্যবস্থায় হওয়ার কথা। ছয়জন শীর্ষস্থানীয় জেনারেল যখন জেনোসাইডের দায়ে অভিযুক্ত তখন তাঁরা কিভাবে নিরপেক্ষ বিচার করবেন? গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের চারজন জেনারেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সময় যেসব অভিযোগের কথা বলেছে, সেগুলোও জেনোসাইডের আলামত ছাড়া আর কিছু নয়।’

ওই আইনজীবী মিয়ানমার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের দুটি ছবি আদালতের সামনে তুলে ধরে বলেন, এই ছবিগুলো প্রকাশ করায় মিয়ানমারের দুই সাংবাদিককে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়। বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে মিয়ানমার সংশ্লিষ্ট সেনাদের গ্রেপ্তার করে গোপনে মুক্তি দেয়। তিনি বলেন, মিয়ানমার বলেনি যে রাখাইনে অপরাধ হয়নি। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার বলেছেন, মিয়ানমার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি প্রসঙ্গে পল রেইখলার বলেন, মিয়ানমার সরকারই এমন উদ্যোগ নিচ্ছে, যাতে রোহিঙ্গারা ফিরতে আগ্রহী না হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও রোহিঙ্গাদের ফেরাতে পরিবেশ সৃষ্টি করতে মিয়ানমার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আনান কমিশনও জেনোসাইডের অভিযোগ তোলেনি—গত বুধবার মিয়ানমারের এমন বক্তব্যের জবাবে গতকাল গাম্বিয়া বলেছে, অপরাধ তদন্তের এখতিয়ার আনান কমিশনের ছিল না।

গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবী প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মিয়ানমারের অপারেশন যে জঙ্গিবিরোধী ছিল তার প্রমাণ কী? শিশুদের হত্যা, জবাই করা, মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে আছড়ে মারা—এগুলো কি জঙ্গিবিরোধী উদ্যোগ?’

পল রেইখলার ওই সময় আদালতের সামনে মিয়ানমার বাহিনীর রাখাইনযাত্রার ছবি তুলে ধরে বলেন, ‘আরসার কথিত হামলার দুই সপ্তাহ আগেই মিয়ানমারের দুটি লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনকে কেন সেখানে পাঠানো হয়েছিল? সে সময় কি তাতমাদাওপ্রধান তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখেননি, বাঙালি সমস্যা সমাধানের সময় এসেছে?’

গাম্বিয়ার পক্ষের আরেক আইনজীবী পিয়েঁর দ্য আর্জেন বলেন, মিয়ানমার তার বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তিনি আদালতকে জানান, গাম্বিয়া নিজেই মামলা করেছে। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার অপর ৫৬টি দেশ, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস গাম্বিয়াকে সমর্থন করেছে। অন্যদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে গাম্বিয়ার কোনো সমস্যা নেই।

গাম্বিয়ার পক্ষে অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস বলেন, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে কি না সে প্রশ্ন তোলার অধিকার গাম্বিয়ার অবশ্যই আছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ব্যাপক সমর্থনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারবিষয়ক সত্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন গৃহীত হয়েছে। সেখানেও জেনোসাইডের ঝুঁকির কথা বলা আছে। এটিও আইসিজের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে যুক্তি হতে পারে। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হলোকস্ট মিউজিয়ামসহ অনেকেই বলেছে যে মিয়ানমার বাহিনী জেনোসাইড করছে। আলজাজিরা টিভি চ্যানেল ২০১৩ সালে ‘মিয়ানমার হিডেন জেনোসাইড’ শীর্ষক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ফিলিপ স্যান্ডস বলেন, সু চি বা মিয়ানমারের কোনো প্রতিনিধি রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের কথা একবারের জন্যও বলেননি। এ থেকেই প্রমাণ মেলে যে জবাবদিহির কোনো অঙ্গীকার মিয়ানমারের নেই। অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থায় এর প্রতিকার সম্ভব নয়। সু চি রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের কথা আইসিজের শুনানিতেও স্বীকার করেননি।

অধ্যাপক স্যান্ডস বলেন, ‘বসনিয়ায় আদেশ দেওয়ার পরও স্রেব্রেনিচায় যে জেনোসাইড হয়েছিল, সেই উদাহরণ দিয়েই আমরা বলছি, মিয়ানমারের ব্যাপারে আদালতের সুনির্দিষ্ট অন্তর্বর্তী আদেশ ও ব্যবস্থা কেন প্রয়োজন এবং তার বাস্তবায়নের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া কেন জরুরি। অধ্যাপক সাবাস (মিয়ানমার পক্ষের আইনজীবী) আলজাজিরাকে তাঁর ২০১৩ সালের সাক্ষাৎকারে জেনোসাইড প্রতিরোধে যেসব পদক্ষেপের (নাগরিকত্ব) প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন, সেগুলো যদি আদালত তাঁর নির্দেশে অন্তর্ভুক্ত করেন, তাতে আমরা আপত্তি করব না।’ ‘ডিপোর্টেশন’ জেনোসাইড নয়—মিয়ানমারের এমন যুক্তি নাকচ করে গাম্বিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন, স্রেব্রেনিচার মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধকেও জেনোসাইডের উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ক্রোয়েশিয়া বনাম সার্বিয়া মামলায় বলা হয়েছে, ‘এথনিক ক্লিনজিং’ও জেনোসাইড।

গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবীরা রোহিঙ্গা জেনোসাইডের আলামত সংগ্রহের জন্যও আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশনা চান। তাঁরা বলেন, সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখন এই আদালতের দিকে।

গাম্বিয়ার পক্ষের এজেন্ট ও আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদু বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। আসন্ন ঝুঁকির বিষয়ে আদালতে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের জীবন বিপন্ন। গাম্বিয়া মিয়ানমারের প্রতিবেশী নয়, কিন্তু গাম্বিয়া একটি জনগোষ্ঠীকে জেনোসাইড থেকে রক্ষা করতে চায়।

শেষ পর্বে যা বলল মিয়ানমার : মিয়ানমারের আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টেকার গাম্বিয়ার মামলাকে ‘প্রক্সি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কারা গাম্বিয়াকে মামলার খরচ দিচ্ছে তা অজানা। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওআইসি বা তার পক্ষে গাম্বিয়ার মামলা করার অধিকার নেই।

অধ্যাপক সাবাস বলেন, গাম্বিয়া মিয়ানমার সম্পর্কে পুরনো তথ্য নিয়ে কথা বলছে। সেখানে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়ন হলে প্রত্যাবাসন সহজ হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা