kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

ফাতরার চরের অভিযানে ৩৫ পাকি আত্মসমর্পণ করে

মাসুদ রানা   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফাতরার চরের অভিযানে ৩৫ পাকি আত্মসমর্পণ করে

মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারা বেগম

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মাতৃভূমিকে শক্রমুক্ত করতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণাঙ্গনে বীরের মতো যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে যেসব নারী অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তাঁদের অন্যতম অধ্যাপক ড. এস এম আনোয়ারা বেগম। তাঁর বোন মনোয়ারা বেগম এবং ভাই সরদার রশিদও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এককথায় তাঁদের পুরো পরিবারই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে জড়িত ছিল।

যুদ্ধদিনের স্মৃতি তর্পণ করে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের ভাবনায় ছিল, যেকোনোভাবে দেশকে স্বাধীন করতে হবে। আমরা বুঝতাম, দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারবেন। না হয় দখলদাররা তাঁকে হত্যা করবে। পাকিরা আমার মাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, সে সময় তা মাথায় ছিল না। দেশকে স্বাধীন করতে হবে, এটাই ছিল লক্ষ্য।’

১৯৫৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর কালিকাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ারা বেগম। তাঁর এক বছরের বড় মনোয়ারা বেগম। মা-বাবা, পাঁচ বোন ও এক ভাইকে নিয়ে তাঁদের পরিবার। পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তাঁরা। বড় ভাই সরদার আবদুর রশিদ তখন পটুয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। বড় ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন দুই বোন। ১৯৭১ সালে পটুয়াখালী সরকারি কলেজের ছাত্রী আনোয়ারা ও মনোয়ারা। ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এলাকার তরুণদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। এলাকায় অনেকগুলো বাংকার তৈরি করেন। তিন ভাই-বোন পটুয়াখালী জুবিলি কলেজের মাঠে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ২৬ মার্চ থেকে প্রায় এক মাস অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন। এ খবর পাক হানাদার ও শান্তি বাহিনীর লোকদের কাছে পৌঁছলে তারা হন্যে হয়ে এ তিনজনকে খুঁজতে থাকে।

১১ এপ্রিল আক্রান্ত হয় পটুয়াখালী। পাকি মেজর নাদের পারভেজ নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেন। মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি এবং ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান। ওই সময় খাল, বিল, নদী পার হয়ে চার-পাঁচ দিন পর এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন আনোয়ারা। মাকে ওই বাড়িতে রেখে রাতেই ভাই-বোনকে নিয়ে আনোয়ারা অন্যত্র চলে যান। ওই রাতেই হানাদার বাহিনী আনোয়ারার মাকে ধরে নিয়ে প্রথমে গলাচিপা থানা, পরে পটুয়াখালী সদর থানায় চালান করে।

এলাকায় ঘোষণা করা হয়, তাঁদের দুই বোনকে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে ৫০ হাজার টাকা ও ৩০ ভরি সোনা পুরস্কার দেওয়া হবে। তখন তাঁদের আশ্রয় দিতে অনেকে আপত্তি জানায়। তবে নিশানবাড়িয়ার সফিউদ্দিন বিশ্বাস নামের এক পীর তাঁর মুরিদদের নির্দেশ দেন তাঁদের আশ্রয় দিতে। কিন্তু মুরিদরা তাঁদের তিন ভাই-বোনকে আগুনমুখা নদীর ধারে একটি জঙ্গলে রেখে আসেন। সেখানে তিন দিন ছিলেন তাঁরা। ওই জঙ্গলেও হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা হাজির হয়। একদিন প্রায় ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছিলেন।

এরই মধ্যে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন সাব-সেক্টরের প্রধান মেজর জিয়াউদ্দিনের কাছে তাঁদের খবর পৌঁছলে রাত ২টার দিকে একদল সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা তিনটি বোটে করে তাঁদের উদ্ধার করেন। বয়স কম হওয়ায় দুই বোনকে যুদ্ধে না যাওয়ার পরামর্শ দেন মেজর জিয়াউদ্দিন। কিন্তু তাঁদের দৃঢ় মনোবলের কারণে দলে নিতে বাধ্য হন। ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন দুই বোন। প্রথমে সৈনিক ইসমাইল মিয়া ও পরে মেজর জিয়াউদ্দিনের কাছে প্রশিক্ষণ নেন। অস্ত্র প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল গ্রেনেড নিক্ষেপ, স্টেনগান, মেশিনগান, কারবাইন, এসএলআর, থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি ইত্যাদি চালনা। বড় ভাই আরো প্রশিক্ষণের জন্য ভারত চলে যান। দুই বোন সুন্দরবনে সেন্ট্রি ও অপারেশনের রেকির কাজ করেন। সুন্দরবন, শরণখোলা, রায়েন্দা, নামাজপুর, তুষখালী, কাকচিড়া, ডোবাতলা, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে মেজর জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে সরাসরি যুদ্ধ করেন তাঁরা।

যুদ্ধদিনের একটি করুণ স্মৃতির কথা জানান আনোয়ারা, ‘দীর্ঘ সাত মাস সুন্দরবন এলাকায় যুদ্ধ করেছি। সেখানে প্রায় এগারো শ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। খাবার না থাকায় রোজার ঈদের দিনও না খেয়ে থাকতে হয়েছে। পরের দিন তুষখালীতে অভিযান চালিয়ে গুদাম থেকে চাল এনে রান্না করে খেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই খবর পাই, ফাতরার চরে নারীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে পাকিরা। পরে সেখানে আক্রমণ চালাই আমরা। ৩৫ জন পাকি আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। রাজাকারদের তিনটি ক্যাম্প দখল করে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ নির্যাতিত মেয়েদের উদ্ধার করি।’

ষাটের দশকের শেষ ভাগে রাজপথের লড়াকু সৈনিক এস এম আনোয়ারা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স ও জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। তিনি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য, শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি, নীল দলের আহ্বায়ক ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও একমাত্র ছাত্রী হল শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রভোস্টের দায়িত্বে রয়েছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য প্রফেসর আনোয়ারা ২০১৫ সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ‘ডা. এমএ ওয়াজেদ মিঞা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন’ স্বর্ণপদক পান। নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি একাধিক সম্মাননা পদক পেয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা