kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজ্যসভায় নাগরিকত্ব বিল পাস

আসাম-ত্রিপুরায় সংঘর্ষ, গুয়াহাটিতে কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজ্যসভায় নাগরিকত্ব বিল পাস

ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় গতকাল বুধবার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) পাস হয়েছে। দিনভর তীব্র বিতর্কের পর রাতে ১২৫-১০৫ ভোটে বিলটি পাস হয়। মাত্র এক দিন আগেই নিম্নকক্ষ লোকসভাতেও খুব সহজেই উতরে যায় বিতর্কিত এই বিলটি। এরপর এই বিলের আইনে পরিণত হতে শুধু একটি পদক্ষেপই বাকি—প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর। যা একটি অনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এর আগে দিনের শুরুতে বিল উত্থাপনের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মুসলমানদের আশ্বস্ত করে বলেন, তাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

তবে তাঁর আশ্বাসে মুসলমান তো দূরের কথা, যাদের উদ্বেগ দূর করতে এই বিল আনা—তারাও নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমারের মধ্যে পড়ে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে থাকা আসাম-ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো এই বিলের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। পার্লামেন্টে বিজেপি যখন এই বিল পাস করাতে তৎপর, তখন বিজেপিশাসিত দুই রাজ্যেই একাধিক বাস ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ত্রিপুরায় গুলি চালিয়েছে পুলিশ। গুয়াহাটিতে কার্ফু জারি করা হয়েছে। বহু জায়গায় ইন্টারনেট ও মোবাইলসেবা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। দুই রাজ্যেই  সেনা নামানো হয়েছে।

মূলত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে শরণার্থী হিসেবে যাওয়া ছয়টি ধর্ম বিশ্বাসী মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বিল তোলা হয়। এই তালিকা থেকে মুসলমানদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো হচ্ছে—হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ও পার্সি মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষ। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ভারতের নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে ১১ বছর দেশটিতে থাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছিল। এই সুযোগ মুসলমানদের জন্যও অবারিত ছিল। নতুন প্রস্তাবে সেই সময় কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিবেশী দেশ থেকে ২০১৪ সালের আগে যাওয়া এসব মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকজনকে নাগরিকত্ব দিতে চায় ভারত। সেই লক্ষ্যে বিলটি গত সোমবার লোকসভায় তোলা হয়। প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পাস হয়।

রাজ্যসভায় গতকাল যখন নাগরিক সংশোধনী বিল নিয়ে শাসক ও বিরোধী দলের বাগ্যুদ্ধ চলছিল তখন এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল উত্তর-পূর্বের দুই রাজ্য আসাম ও ত্রিপুরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই রাজ্যেই সেনা নামানো হয়।

উত্তর ত্রিপুরায় ৭০টি পরিবারকে আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর হুমকি দিলে তারা স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বিলের প্রতিবাদে গুয়াহাটিতে পথে নেমে পড়েছে কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা রাস্তা বন্ধ করে দিলে অবরোধ ওঠাতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। কয়েকজনের আহত হওয়ার খবরও শোনা গেছে। বিক্ষোভের জেরে ডিব্রুগড় ও গুয়াহাটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। রাতের দিকে একাধিক গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা।

গুজব ছড়ানো আটকাতে ত্রিপুরায় মোবাইল, ইন্টারনেট এবং এসএমএস পরিষেবা আগামী ৪৮ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। দক্ষিণ ত্রিপুরার সিপাহিজলায় ধর্মঘট সমর্থকরা রাস্তা অবরোধ করে রাখায় দুই বছর বয়সী এক অসুস্থ শিশুর মৃত্যু হয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে।

বিক্ষোভকারীরা মনে করে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে দলে দলে অমুসলিমরা এসে ভিড় জমালে তাদের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়ব। সংকটে পড়বে তাদের সংস্কৃতি। নর্থ-ইস্ট স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের (নেসো) চেয়ারম্যান স্যামুয়েল জিরওয়া সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হয়ে গেলে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীরা দলে দলে এসে ভিড় করবে। এতে সাধারণ মানুষ এত দিন ধরে যে দাবি-দাওয়া জানিয়ে আসছে, তাকে অসম্মান করা হবে।’

আসাম-ত্রিপুরার সংঘাত-সহিংসতার মধ্যেই গতকাল রাজ্যসভায় ওঠে বিলটি। বিল তোলার সময় বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, ‘লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে ধর্মীয় প্রতারণা হয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে সেই শরণার্থীদের অধিকার দেওয়া হবে।’ এ দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের আশঙ্কার কোনো কারণ নেই বলে আশ্বাস দেন তিনি। এ নিয়ে লোকসভার মতো রাজ্যসভাতেও বিরোধীরা সরব হয়। বিরোধী কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য আনন্দ শর্মা বলেন, ‘এই বিল ভারতের আত্মার ওপর আঘাত।’ বিল নিয়ে বিজেপি কেন তাড়াহুড়া করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। কপিল সিব্বল বলেন, ‘অমিত শাহ লোকসভায় বলেছিলেন, কংগ্রেস ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের জন্য দায়ী। আমি জানি না কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোন ইতিহাস বইয়ে এটি পড়েছেন। আমি অমিত শাহকে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করতে বলব। অমিত শাহ বলেছিলেন, এটি ঐতিহাসিক বিল। এর কারণ, ওঁরা ইতিহাস নতুন করে লিখছেন। আপনারা ভারতকে জুরাসিক যুগে নিয়ে যাবেন না।’

এর জবাব দিতে উঠে অমিত শাহ বলেন, ‘শরণার্থীরা তাদের অধিকার পাবে। লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে ধর্মীয় প্রতারণা হয়েছে। ভোটের পর রাজনীতি করছি না। চিন্তা নেই উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের। পড়শি দেশ থেকে আসা সংখ্যালঘুরা এ দেশে আশ্রয় পাবে।’ লোকসভায় খুব সহজেই এই বিল পাস করিয়ে নিয়েছে বিজেপি। রাজ্যসভা নিয়েও আত্মবিশ্বাসী তারা। তাদের হিসাবে ওই বিল পাস করাতে শাসক দলের প্রয়োজন ১২১ ভোট। তবে গতকাল উচ্চকক্ষে চার সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে ম্যাজিক ফিগার কিছুটা নেমে ১১৯ হয়েছে। রাজ্যসভার মোট আসন ২৪৫। বর্তমানে সদস্য রয়েছেন ২৪০ জন। রাজ্যসভায় এই মুহূর্তে বিজেপির সদস্যসংখ্যা ৮১। আর সব মিলিয়ে এই বিলের পক্ষে সংসদ সদস্য আছেন ১২৮ জন। ফলে বিল পাস নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তার মধ্যে নেই বিজেপি।

বিল পাসের আগে এ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা জানাতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘ভারত ঐতিহাসিকভাবে একটি সহনশীল দেশ, যারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে। সেখান থেকে পদস্খলন হলে ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থান দুর্বল হবে।’ বাংলাদেশে ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, ‘এ ব্যাপারে যে কথাগুলো উঠেছে তার অনেক কিছুই সত্য নয়। আমাদের দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি অনেক বেশি। আমাদের দেশে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা