kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

আইসিজেতে মিয়ানমারের দাবি

অপরাধ ‘কিছু’ হয়েছে তবে জেনোসাইড না!

আজ দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে শুনানি

মেহেদী হাসান   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অপরাধ ‘কিছু’ হয়েছে তবে জেনোসাইড না!

আইসিজের পিস প্যালেসের সামনে মিয়ানমানের জেনারেলদের বিচারের দাবিতে রোহিঙ্গাদের প্রচারণা। ছবি : সংগ্রহ

হিটলারের কায়দায় মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করতে পরিকল্পিত জেনোসাইড চালাচ্ছে—গাম্বিয়ার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। তাদের দাবি, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে রাখাইনের বাসিন্দাদের ওপর ‘এথনিক ক্লিনজিং’ (জাতিগত নির্মূল), হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ করার অভিযোগ করা হয়েছে। ‘জেনোসাইডের’ সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে এমন অভিযোগ করা হয়নি।

গতকাল বুধবার নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের

স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ তাঁর আইনজীবী দল এই যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, মিয়ানমারের রাখাইনে ‘কিছু’ অপরাধ হয়ে থাকলেও তা ‘জেনোসাইডের’ সংজ্ঞায় পড়ে না। তাই আইসিজের উচিত অন্তর্বর্তী আদেশের আবেদন খারিজ করে দেওয়া। কারণ অন্তর্বর্তী আদেশ দিলে তা বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে মিয়ানমার নিয়ে অন্যরকম বার্তা যেতে পারে।

জেনোসাইড প্রতিরোধবিষয়ক সনদ লঙ্ঘন ও রোহিঙ্গা জেনোসাইডের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় অন্তর্বর্তী আদেশের জন্য আবেদন নিয়ে শুনানির দ্বিতীয় দিন ছিল গতকাল। আগের দিন গাম্বিয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও অন্তর্বর্তী আদেশের পক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরার পর গতকাল মিয়ানমার তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর সু চি আদালতের সামনে তাঁর বক্তব্যে ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে’ মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের কথা স্বীকার করলেও জেনোসাইডের অভিযোগ নাকচ করেছেন। লাখ লাখ রোহিঙ্গার ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের তথ্য আড়াল করে তিনি তাদের বাস্তুচ্যুতির জন্য দায়ী করেছেন কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি, সংক্ষেপে আরসাকে।

আদালতের কাছে রোহিঙ্গা সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাখাইন রাজ্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একপর্যায়ে সু চি বলেন, ‘ব্রিটিশরা যখন ১৯৩৭ সালে উপনিবেশ বার্মাকে (মিয়ানমার) ব্রিটিশ ভারত থেকে আলাদা করেছিল তখন বার্মা ও ভারতের সীমান্ত টানা হয়েছিল নাফ নদ বরাবর। আজ একে আমরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমানা হিসেবে দেখতে পাই।’

তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক আরাকান কিংডম নাফ নদের আরো অনেক উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়েছিল। আজকের বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার বেশির ভাগই এর অংশ ছিল। এ কারণে রাখাইন সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য মনে করেন, ব্রিটিশরা যে সীমান্ত রেখা টেনেছে তা খুব বেশি দক্ষিণে চলে এসেছে এবং এটি আরো অনেক উত্তরে ছিল। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে মিয়ানমার কখনো এই সীমান্তকে চ্যালেঞ্জ করেনি।’

সু চি বলেন, রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও অসম্পূর্ণ তথ্য ও চিত্র তুলে ধরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল শুনানির দ্বিতীয় দিনে আদালতে উপস্থিত ১৭ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের সামনে তিনি বলেন, আরসা জঙ্গিরা প্রথম হামলা চালিয়েছিল ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী তার জবাব দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘রাখাইন পরিস্থিতি জটিল এবং এটি সহজে অনুধাবন করা যায় না। রাখাইন রাজ্যের সমস্যা কয়েক দশকের পুরনো এবং এটি গুরুতর হয়েছে। আরাকান কিংডমের অনুপ্রেরণায় আরসা রাখাইন রাজ্যকে স্বাধীন করতে চায়।’ সু চি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘নির্মূল অভিযান’ চালানোর কথা নাকচ করে বলেন, সেগুলো ছিল জঙ্গিবিরোধী অভিযান।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাকে তিনি ক্রোয়েশিয়ার সশস্ত্র সংঘাতের সঙ্গে তুলনা করেন। ২৫ মিনিটের বক্তব্যে সু চি মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্যের বিচারের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, রাখাইন বা মিয়ানমারের কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘন সহ্য করা হবে না। অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সব চেষ্টা চালানো হবে।

এ সময় আদালতের কাছে সু চি স্বীকার করেন তাঁর দেশ কিছু ভুল করেছে। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার ওপর মিয়ানমারের আরো কাজ করা উচিত ছিল। তিনি স্বীকার করেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ একটি অভিযানে হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলি বেসামরিক জনগণের গায়ে লাগতে পারে।

‘রোহিঙ্গা’দের বেসামরিক জনগণ হিসেবে উল্লেখ করে সু চি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আরসার যোদ্ধা ও বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট না করে অনুপাতহীন শক্তি প্রয়োগ করেছে। এটি মেনে নেওয়া যায় না।

সরকারের আরো কিছু ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি বলেন, যুদ্ধের পর বা পরিত্যক্ত গ্রামগুলোতে লুটপাট বা ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেসামরিক জনগণকে রক্ষার ক্ষেত্রে কিছু ব্যর্থতা থাকতে পারে। তবে এগুলোর দায় যথাযথ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় নির্ধারিত হতে হবে। সু চি বলেন, তড়িঘড়ি করে অভ্যন্তরীণ অপরাধের আন্তর্জাতিক বিচারের উদ্যোগ নিলে অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থাকে অবমূল্যায়ন করা হবে।

মিয়ানমারের আইনজীবী দলের সদস্যরা আইসিজেতে বিচারকদের সামনে ‘জেনোসাইড’ হয়নি প্রমাণ করতে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। গুরুতর অপরাধ সত্ত্বেও জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি—বিভিন্ন দেশের এমন উদাহরণ তুলে ধরেন তাঁরা। আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার এবং জাতিসংঘের তদন্ত অস্বীকার করলেও গতকাল মিয়ানমারের আইজীবীরা আইসিসির প্রাক-বিচারিক আদালতের নথি ও জাতিসংঘ তদন্তদলের প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরে বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধ যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, জাতিগত নির্মূল হতে পারে। কিন্তু সেগুলো কোনোভাবেই জেনোসাইড হতে পারে না।

আইনজীবী অধ্যাপক সাবাস বলেছেন, আইসিসি (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট) বলেছেন, ‘জোরপূর্বক বিতাড়নকে’ মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সুতরাং রোহিঙ্গাদের বলপূর্বক বিতাড়নের বিষয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধ হলেও গণহত্যা নয়। তিনি বলেন, জাতিসংঘের জেনোসাইড প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ দূত আদামা দিয়েং মিয়ানমার পরিস্থিতিকে সম্ভাব্য জেনোসাইড বলে আশঙ্কা প্রকাশ করলেও জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেননি।

অধ্যাপক সাবাস বলেছেন, ক্রোয়েশিয়ার মামলায় বলপূর্বক বিতাড়নকে কোনো জনগোষ্ঠীকে নির্মূলের উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়নি। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও তাই করা উচিত।

মিয়ানমারের পক্ষের আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টকার বলেন, গাম্বিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের বিরোধ নেই। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে গাম্বিয়া মামলা করেছে। ওআইসি জাতিগত নির্মূলের কথা বলতে বলতে গাম্বিয়াকে দিয়ে জেনোসাইডের অভিযোগে মামলা করিয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষের আরেক আইনজীবী ফোবো ওকোয়া বলেন, বাংলাদেশ জেনোসাইডের ঝুঁকির কথা বলছে না। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে চলতে দেওয়া উচিত।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে শুনানির শেষ দিনে প্রথমে গাম্বিয়া ও পরে মিয়ানমার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। এরপর আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আদালত রায় ঘোষণা করতে পারেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা